রাশিয়ার ইউক্রেন, তুরস্কের সিরিয়া

মার্ক চ্যাম্পিয়ন।।Erdogan & Putin_The Dhaka Report

রাশিয়ার একটি বিমানকে পরিকল্পিতভাবে গুলি করে ভূপাতিত করার তুর্কি সিদ্ধান্তে রুশ কর্মকর্তারা স্পষ্টতই দুঃখিত হয়েছেন। তারা বলছেন, ইসলামিক স্টেটের প্রতি তুরস্কের সমর্থন এবং পাচার হয়ে আসা সন্ত্রাসী তেলের প্রতি লোভ থেকেই এমনটি করা হয়েছে। আরো সহজ ব্যাখ্যা হলো, রাশিয়া একই কাজ করতে পারে।

এখানেই অনুমানের বিষয়টি আসে : রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কী করতেন যদি প্রতিবেশী এমন কোনো দেশে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তো, যে দেশটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়ার আগে কয়েক শ’ বছর ধরে রুশ সাম্র্রাজ্যের অংশ ছিল এবং সীমান্তগুলো এমন যে তা গ্রহণ করা এখনো রাশিয়ার পক্ষে কঠিন? তিনি কী করতেন যদি ওই যুদ্ধে কিছু বিদ্রোহী হতেন জাতিগতভাবে রুশ, তারা প্রতিবেশী দেশটির নৃশংস অভিযানে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকত?

আসলে সেটা ততটা কল্পনাবিলাস নয়; এর প্রায় পুরোটাকেই পূর্ব ইউক্রেনের ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেয়া যায়। আর আমরা জানি, সেখানে রাশিয়া কী করেছে, দেশটিতে সে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েছে, খুব বেশি লুকোনো ছাপানো করেনি।

সিরিয়া ১৫১৬ সাল থেকে ছিল সিরিয়ার অধীনে, উসমানিয়া সাম্র্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সেভাবেই ছিল। আর রুশ সাম্র্রাজ্য ডনব্যাস অঞ্চলটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ১৭০০-এর মধ্যভাগে।

‘তুর্কম্যান’ বিদ্রোহীদের ওপর বোমাবর্ষণ করার সময় যে রুশ সু-২৪ বিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে তারা জাতিগতভাবে তুর্কি। ১৯২১ সালের চুক্তির (এর সামান্য আগে ডনব্যাস অঞ্চলটি সোভিয়েত ইউক্রেনের সাথে একীভূত করা হয়) আলোকে সীমান্ত আরোপ করার সময় এই তুর্কিরা তুরস্ক সীমান্তের বাইরে পড়ে যায়।

দীর্ঘ দিন আগে কেটে বাদ দেয়া হলেও সাবেক সাম্রাজ্যগুলো তাদের অদ্ভুত মানসিক কারণে এখনো মনে করে, ওই সব এলাকায় হস্তক্ষেপ করার তাদের বিশেষ অধিকার (এমনকি দায়দায়িত্বও) রয়েছে। সিরিয়ায় ২০১১ সালে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এরদোগান বলেছিলেন, তুরস্ক মনে করে সিরিয়ার গোলযোগ তাদের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ তার কথা অনুযায়ী কাজ করতে অস্বীকার করলে এরদোগান অপমানিত বোধ করেছিলেন।

রুশ বিমান ভূপাতিত করার পর থেকে তুর্কি প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছেন, সুখোইটি তুর্কি বিদ্রোহীদের হামলা করার কারণেই তার দেশ পরিকল্পিতভাবে বিমানটিকে টার্গেট করেছিল। এরদোগান বলেন, ‘এই ঘটনা বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। আমরা কেবল আমাদের নিরাপত্তা এবং আমাদের ভাইদের অধিকার রক্ষা করেছি।’ রুশ বিমানটি তুর্কি আকাশসীমায় ছিল ১৭ সেকেন্ড। এটা যদি আগ্রাসন হয়ে থাকে, তবে সেটা ভূপাতিত করার তুর্কি সিদ্ধান্তও একই পরিভাষায় অভিহিত করা যায়। পুতিন যে ভাষায় যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে রুশ জাতিগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে সামরিক হস্তক্ষেপ করার অধিকার থাকার কথা ঘোষণা করেছিলেন, এরদোগান ততটা যাননি।

আচ্ছা পুতিন কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অরগানাইজেশন) পূর্ব ইউক্রেনে সামরিকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, রুশ সীমান্ত থেকে ৫০ মাইলের মধ্যে বিমানঘাঁটি স্থাপন করে, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে। কল্পনা করুন, ন্যাটো বিমান রুশ-সমর্থিত বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে স্থল হামলা চালাতে ইউক্রেনকে সর্বাত্মক বিমান সহায়তা দিচ্ছে, সৈন্য সহায়তা দিচ্ছে পোল্যান্ড ও চেচনিয়া থেকে (সিরিয়ার ঘটনায়, এটা হলো ইরান ও হিজবুল্লাহ)। কল্পনা করুন, তুর্কি ও মার্কিন জেট বিমানগুলো তাদের বোমা হামলার কার্যক্রম সর্বোচ্চ করতে তারা রুশ আকাশসীমায় উড়ে যাচ্ছে।

এটা স্র্রেফ একটা প্রাথমিক ধারণা। তবে ন্যাটো বিমান গুলি করে ভূপাতিত করার জন্য পুতিনকে তিন মাস অপেক্ষা করে থাকতেন না। কিংবা তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য গ্রহণ করতেন না যে, এটা নিশ্চিতভাবে ন্যাটো পাইলট এবং বোমারু বিমানগুলো রুশ ফেডারেশনের ওপর ‘কোনোভাবেই হুমকি’ সৃষ্টি করছিল না। অথচ এ ব্যাপারে পুতিনের মুখ দিয়ে যে কথা বের হয়েছে তা হলো, ‘সন্ত্রাসবাদের সহযোগীরা আমাদেরকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করেছে।’

এমনকি ন্যাটো যদি দাবি করত, ডনব্যাসে যেখানে রুশ-সমর্থিত বিদ্রোহীদের ওপর তারা বোমা ফেলছে, তারা সন্ত্রাসী, সেটা পুতিন মেনে নিতেন না। পুতিন বলছেন, তিনি তুর্কমেন পর্বতমালায় ইসলামিক স্টেটের ওপর বোমা ফেলছেন, যদিও সেখানে বা তার কাছাকাছি কোনো এলাকাতেও ইসলামিক স্টেট বাহিনীর উপস্থিতির কোনো রেকর্ড নেই। তারা হলো আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়া বিদ্রোহী।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, উত্তর সিরিয়া এবং ইউক্রেন ঘটনার মধ্যে যেমন অনেক মিল আছে, তেমনি অমিলও আছে অনেক। অতীত ও বর্তমান মিলিয়ে রাশিয়া ও তুরস্কের দৃষ্টিভঙ্গি একই ধরনের, কোনো সঙ্ঘাত নয়। আবার রুশ ও তুর্কি উভয় দেশের নেতৃত্বই মহৎ কোনো লক্ষ্য নয়, বরং আরো বেশি কৌশলগত লক্ষ্য হাসিলের জন্য জনসাধারণের সস্তা জনপ্রিয়তা লাভকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।

এরদোগানের লক্ষ্যগুলোর একটি ক্রেমলিনের কাছেও খুব পরিচিত : কেবল রাশিয়াকেই নয়, সেই সাথে রাশিয়ার সাথে অভিন্ন কৌশল গ্রহণে সমঝোতায় আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশকে বেশ জোরালোভাবে দেখানো যে তুরস্কের স্বার্থ পুরোপুরি বিবেচনায় না নেয়া হলে সিরিয়ায় কোনো সমাধানই ফলপ্রসূ হবে না। তুর্কি স্বার্থগুলোর মধ্যে রয়েছে, আসাদের সাথে সমাঝোতা হলে যাতে তুর্কম্যানই হোক আর আরবই হোক, কোনো সুন্নিকে ধ্বংস করা যাবে না। রাশিয়ার জন্য স্মার্ট কাজ হবে এটা স্বীকার করে নেয়া যে, সে তুর্কি স্পর্শকাতরতাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি এবং সে অনুযায়ী কাজও করেনি। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, পুতিনের অনেক বৈরী প্রতিবেশী রয়েছে, আছে সাবেক মিত্রও। কিন্তু আরো অগ্রসর হওয়ার প্রলোভন সৃষ্টি হয়েছে। কারণ এরদোগানও ভুল হিসাব কষেছেন। পুতিন ইউক্রেনে যতটা দুর্বল, এরদোগান সিরিয়ায় তার চেয়েও বেশি দুর্বল।

আরেকটি বিশেষ বিবেচ্য হচ্ছে, তুরস্ক পরমাণু শক্তিধর দেশ নয়। উপরন্তু, সঙ্ঘাত শুরুর এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সিরিয়ায় আসা ইসলামি চরমপন্থীদের সমর্থন করে তুরস্ক বিরাট ভুল করা সত্ত্বেও তারা কিন্তু সিরিয়ার গৃহযুদ্ধটি তৈরি করেনি, যেভাবে এক সময় ইউক্রেনে করেছিল রাশিয়া। তুর্কিরা তাদের বিপুলসংখ্যক ‘স্বেচ্ছাসেবক’ সৈনিক এবং ভারী সরঞ্জাম সিরিয়ান যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনও করেনি। এ কারণে সিরিয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা বা প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সীমিত। অন্য দিকে ডনব্যাস অঞ্চলে পুতিন তার খেয়াল খুশিমতো যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি কম-বেশি পাল্টে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন।

বর্তমানে যা ঘটতে যাচ্ছে, তা হলো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়া অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে যাচ্ছে, উত্তর সিরিয়ায় বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করতে যাচ্ছে, তুর্কমেন পর্বতমালায় বোমাবর্ষণ দ্বিগুণ করতে যাচ্ছে। তিনি যদি আরো বেপরোয়া ঝুঁকি গ্রহণ করে যুদ্ধে না নামেন (যে যুদ্ধে তিনি জয়ী হতে পারবেন না), তবে দেখা যাবে, তিনি জবাব দানে কার্যকরভাবে থাকবেন ক্ষমতাহীন।

ব্লুমবার্গ থেকে অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

সূত্র: নয়া দিগন্ত।

Share.

Leave A Reply