রেশনাল বিহেভিয়র-এর অর্থনীতি

Rifat Muhammad Oarisul Hasan_The Dhaka Reportরিফাত মুহাম্মদ ওয়ারিসুল হাসান।।

ম্যানেজেরিয়াল ইকোনোমিক্স ক্লাসে এনামুল স্যার আমাদের পড়াতেন, Every behavior is rational behavior. প্রথম প্রথম আমাদের এটা মানতে খুব কষ্ট হতো। একজন ব্যবসায়ী পণ্যে ভেজাল দিচ্ছে, এটা কেন রেশনাল বিহেভিয়র হবে। স্যার এখন ক্লাস নিলে হয়তো আলোচনা করতেন, সরকার যে শিক্ষার উপর ট্যাক্স আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে- এটা যেমন রেশনাল বিহেভিয়র; আবার শিক্ষার্থীরা যে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে- এটাও রেশনাল বিহেভিয়র।

তিনি যুক্তি দিতেন, ব্যক্তি মাত্রই তার উপযোগ সর্বোচ্চ চায় এবং এটাই রেশনাল বিহেভিয়র। নৈতিক কি অনৈতিক- এটা গৌণ ব্যাপার। কাল রাতে সিএনজিতে করে মোহাম্মদপুর থেকে ফার্মগেট আসলাম। মিটারের ভাড়ার চেয়ে প্রায় তিনগুণ ভাড়া। ব্যাপারটা নিয়ে আমি মহা বিরক্ত- এবং এটাই আমার রেশনাল বিহেভিয়র।

আমার খরচের তুলনায় প্রাপ্ত উপযোগ এক-তৃতীয়াংশ। আবার সিএনজিওয়ালা যে তিনগুণ ভাড়া নিচ্ছে- এটাও তার রেশনাল বিহেভিয়র। সে এক শিফটে সিএনজি চালায়। সরকার মালিকের ভাড়া ঠিক করে দিয়েছে ৬০০ টাকা। কিন্তু মালিক ক্ষেত্রবিশেষে ৮০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে। এর বাইরে তার জ্বালানি খরচ আছে। মাঝে মাঝে তাকে রাস্তায় কিছু ঘুষ আর চাঁদাও দিতে হয়। সবকিছু মিলিয়ে তার আয় ব্রেক-ইভেনে আসার পর নিজের পকেটের দিকেও তাকে নজর দিতে হয়। মালিকের অত কিছু বোঝার দায় নেই। তাই সিএনজিওয়ালা চায় যত বেশি হারে ভাড়া নিয়ে পিঠ ও পেট বাঁচানো যায়। মালিক যে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত দাবি করে, সেটাও রেশনাল বিহেভিয়র।

নাজমুল হুদা সাহেব যখন পরিবেশের দূষণ যুক্তিতে বেবিট্যাক্সি নিষিদ্ধ করে সিএনজি’র অনুমতি দিলেন তখন আমরা সবাই হাততালি দিয়েছিলাম। বুঝে হোক আর না বুঝে হোক। জনমানসে এই ধারণা ছড়িয়ে গিয়েছিল যে, তেলের চেয়ে গ্যাস পরিবেশের জন্য ভালো। মূল বিষয় ছিল ইঞ্জিনের স্ট্রোক এ। বেবি-ট্যাক্সিগুলো ছিল টু-স্ট্রোক। ফোর-স্ট্রোক এর তুলনায় টু-স্ট্রোক এ জ্বালানির অন্তর্দহন কম হয়। ফলে নির্গমন পথ দিয়ে বেশি হারে বেরিয়ে আসে আনবার্নড বা অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন।

কেবলমাত্র ফোর-স্ট্রোক সিএনজির জন্য ওকালতি না করে ফোর-স্ট্রোক যে কোনও থ্রি হুইলারের জন্য ওকালতি করাই ছিল যুক্তিযুক্ত। অন্তত আজ বাসা বাড়িতে রান্নাঘরে গ্যাসের চাপ আর গ্যাসের অভাবে ধুঁকতে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্র-সার কারখানা- শিল্প কারখানা তা’ই বলে। লোকে বলে, হুদা এই বেহুদা সিদ্ধান্তে ম্যালা কামিয়েছেন। অবশ্য লোকের কথায় কিছু প্রমাণ হয় না। তিনি যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালে তার স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের নামে দেড় টাকায় রেলের কোটি টাকার জমির বন্দোবস্ত করে ফেলেছিলেন প্রায়। যাই হোক ওই সময় সিএনজি মালিকেরা উচ্চমূল্যে সিএনজি খরিদ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে তাদের পে ব্যাক পিরিয়ড চার-পাঁচ বছরে গিয়ে ঠেকে। এরা ক্ষুদ্র পরিবহন ব্যবসায়ী। তাই তারা পিবিপি সময়কাল কমিয়ে আনতে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি হারে চালকদের কাছে দিনের ভাড়া আদায় করতে লাগলেন। বিভিন্ন ধরণের চাঁদার ব্যয় তো আছেই। তো কী বুঝা গেল? সিএনজি মালিকের ব্যবহারও ভালো।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মাঝে রাস্তায় কড়াকড়ি আরোপ করেন। সিএনজিওয়ালারা তাই যাত্রীকে অনুরোধ করেন, পুলিশ ধরলে বলবেন মিটারে আসছি। কিন্তু এই কড়াকড়িতে খুব বেশি কাজ হয় না। কারণ, সবাই তার অবস্থান থেকে রেশনাল বিহেভিয়র-ই করছে। পুলিশও শেষ পর্যন্ত নিরুপায়। গণপরিবহনে ট্যাক্সি লাগবেই। এমনকি প্রয়োজনীয় সংখ্যক পাবলিক বাস রাস্তায় চলাচল করলেও রাস্তায় ট্যাক্সির প্রয়োজন ফুরোবে না। শুরু করতে হবে গোড়া থেকেই। প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে রাস্তায় ট্যাক্সি নামানোর অনুমতি দিতে হবে। অমুক পরিবহন সমিতির নেতা, তমুক সংগঠনের নেতা- এই ভিত্তিতে ট্যাক্সি নামানোর অনুমতি দিলে বাজারে প্রতিযোগিতা নষ্ট হয়। ভালো বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হোন। আবার অন্যদিকে ব্যবসায়িত ব্যয়ও বেড়ে যায়। চক্রাকারে রেশনাল বিহেভিয়র- এর চূড়ান্ত বুধোর পিন্ডি পড়ে যাত্রীর ঘাড়ে। এককভাবে কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সবার বিহেভিয়রই রেশনাল বিহেভিয়র। তাই সমস্যার সমাধান খুঁজতে চাইলে সমস্যার গোড়ায় যেতে হবে।

লেখক: সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন।

বিভাগ:কলাম
Share.

Leave A Reply