কর্মবিরতিতে সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম।।

বেতন কাঠামোয় ‘অসঙ্গতি’ নিরসনের দাবিতে শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে বাংলাদেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক’টি অচল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের ডাকে সোমবার সকাল থেকে পূর্বঘোষিত এই লাগাতার কর্মসূচি শুরু হয়েছে।

ফেডারেশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষকরা প্রশাসনিক কোনো দায়িত্বও পালন করছেন না।

চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খবর নিয়ে জানা যায়, কোথাও কোনো ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না।

গত বছরের মাঝামাঝিতে অষ্টম বেতন কাঠামো প্রস্তাবের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা নানা কর্মসূচিতে নিজেদের ‘মর্যাদাহানি ও সুবিধা কমে যাওয়ায়’ আপত্তি জানিয়ে আসছিল।

গত মাসে বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশের পর শিক্ষকদের বিরোধিতার মুখে সরকার একটি কমিটি গঠন করে। কিন্তু এখনও দাবি-দাওয়ার বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি।

অধ্যাপক ফরিদ বলেন, “আমাদেরকে নয় মাস ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়ে এ অবস্থায় নিয়ে এসেছে। আমলারা ইচ্ছা করেই এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। ওরা ভাবছে ওরা কুলীন লোক, ওদের পর্যায়ে কাউকে দেওয়া যাবে না।”

গত ২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সমিতিগুলোর ফেডারেশনের বৈঠকে ১১ জানুয়ারি থেকে লাগাতার কর্মবিরতি ডাকে।

ওই বৈঠকের পর থেকে শিক্ষকরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের দিকে যেতে চেয়েছিলেন জানিয়ে ফেডারেশনের সভাপতি বলেন, “সামনেকেবিনেট মিটিং থাকায় আমরা তখন সময় নিয়েছিলাম।

“কিন্তু এখন দেখছি, কেবিনেট মিটিংয়ের পর প্রধানমন্ত্রী সেই আমলাদের সঙ্গেই বৈঠক করলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে ভুলভাবে বোঝানো হয়েছে।”

“তারা (আমলা) এখন আমাদের ৯টা-৫টা ডিউটি করার কথা বলছে। আমরা তো কেরানী না যে নয়টা-পাঁচটা ডিউটি করব। আমাদের অফিস তো ২৪ ঘণ্টা,” বলেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সমর্থক শিক্ষকদের নেতা ফরিদ আহমেদ বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যদি আমরা মাত্র ৫ মিনিটও বসি, তাহলেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।”

কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে সরকারের পক্ষ থেকে কেউ এখনও যোগাযোগ করেনি বলে জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে জানান ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এস এম মাকসুদ কামাল।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার জানান, সেখানে ফেডারেশনের আহ্বানে পুরোদমে কর্মবিরতি চলছে।

“আমরা নিয়মিত ও সান্ধ্যকালীনসহ সবধরনের ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া থেকে বিরত থাকছি।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি আগে থেকেই কর্মবিরতি পালন করছিল। এখন ফেডারেশনের কর্মসূচি পালিত হচ্ছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খসরুল আলম কুদ্দুসী।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতকালীন ছুটি চলছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতির সভাপতি আনন্দ কুমার সাহা বলেন, “সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে যেসব সান্ধ্যকালীন ক্লাস ও পরীক্ষা হয়, সেগুলো আমরা নেব না। প্রশাসনিক দায়িত্বও আমরা পালন করছি না।”

ছুটি শেষে ১৬ জানুয়ারি ক্লাশ শুরুর কথা থাকলেও কর্মবিরতি চললে তারাও ক্লাসে যাবেন না বলে জানান অধ্যাপক আনন্দ সাহা।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও কর্মবিরতির কারণে কোন ক্লাস বা পরীক্ষা হচ্ছে না বলে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল গণি জানান।

ক্যাম্পাসের বাসগুলো চলাচল করলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নেই বললেই চলে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “কর্মকর্তারা করলেও প্রশাসনিক কোনো দায়িত্ব শিক্ষকরা পালন করছেন না।”

প্রায় নয় মাস আগে অষ্টম বেতন কাঠামোর প্রস্তাব আসার পর গ্রেডে মর্যাদার অবনমন এবং টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

এরপর সরকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দাবি পর্যালোচনায় কমিটি করে। কমিটির সভাপতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত শিক্ষকদের নিয়ে বৈঠকও করেন।

গত ৬ ডিসেম্বর বৈঠকে অর্থমন্ত্রী শিক্ষকদের তিনটি দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ১০ দিন পর বেতন কাঠামোর গেজেটে তার প্রতিফলন ঘটেনি বলে শিক্ষকদের অভিযোগ।

এরপর ২ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে লাগাতার কর্মবিরতির ঘোষণা দেন শিক্ষকরা।

এরপর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে শিক্ষকরা নিজেদের ‘ছোট করছেন’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “পেটে যখন ক্ষুধা থাকে তখন মানুষ অল্পতেই সন্তুষ্ট হয়। যখন ক্ষুধার জ্বালা দূর হয়ে যায়, আর বেশি প্রাচুর্য পেয়ে যায়, তখন প্রেস্টিজ, ন্যায়, সম্মান, পদায়ন নানা কথা স্মরণে আসে। মনে হয়, একটু বেশি বাড়িয়ে ফেলেছি বেতনটা। সেজন্য এখন প্রেস্টিজ নিয়ে টানাটানি।”

তার ওই বক্তব্যের পর রোববার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সোমবার থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগাতার কর্মবিরতি পালিত হবে এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।”

Share.

Leave A Reply