লিডারশিপ অ্যাপ্রোচঃ অথেনটিসিটি

এস এম মাহমুদ আরাফাত।।

কর্মক্ষেত্রে আমরা সবসময়ই নেতৃত্বের গুরুত্ব অনুধাবন করে থাকি। একইসঙ্গে যে কোনও সফলতার পেছনে নেতৃত্বের ভুমিকা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে থাকি। নেতৃত্বের বিষয়টাই মূলত কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। পণ্ডিত ব্যক্তিরা অনেক গবেষণা করেও নেতৃত্বের ধরণকে নির্দিষ্ট প্রোফাইলে সংজ্ঞায়িত করতে পারেননি। নেতার গুণাবলী, ব্যক্তিত্ব, মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াবলী ইত্যাদি বিষয়গুলোকে সাধারণ কোনো মাপকাঠিতে স্থাপন করা সম্ভব নয়। আমরা কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব দানের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কর্মশালা করতে দেখি। সেখানে মূলত লিডারশিপ এর উপর তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং সফল নেতৃত্বের উদাহরণের ওপর আলকপাত করা হয়। কিন্তু, এই প্রচেষ্টাগুলো তেমনভাবে গুণগত কোনও অর্জনের সহায়ক হয় বলে দেখা যায় না। তাহলে, নেতৃত্বের গুণগত উৎকর্ষতা কোথায়?

একজন নেতা তার সহকর্মীদের নিয়ে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে চেষ্টা করেন। এই পুরো বিষয়টাতে তাকে অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। প্রয়োজন হয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার। এই জায়গাটাতে সহকর্মীদের আস্থা একজন নেতার জন্য অপরিহার্য। আর তাই একজন নেতার ওপর তার সহকর্মীরা আস্থা রাখেন তখনই যখন সেই মানুষটা হয় প্রকৃত বা অথেনটিক। কোন সফল নেতার অনুকরণের মাধ্যমে তার কিছু বিষয় রপ্ত করা যায় ঠিকই, কিন্তু পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তা কখনোই সফলতার নিশ্চয়তা দেয় না। তাই একজন নেতৃত্ব দানকারী ব্যক্তির সফলতার পেছনে যে বিষয়টা অবিসংবাদিতভাবে কাজ করে তা হচ্ছে তার সামগ্রিক সচেতনতা বা সেলফ অ্যাওয়ারনেস।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গ্র্যাজুয়েট যারা কর্মক্ষেত্রে সফল নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত রেখেছেন এমন ৭৫ জনের ওপর একটা জরিপ করা হয়েছিল। সফল নেতৃত্বের বিষয়ে তারা বিভিন্ন মতামত দিলেও একটা বিষয়ে সবাই একই কথা বলেছিলেন। সেটা হলো সচেতনতা বা সেলফ অ্যাওয়ারনেস। অভিজ্ঞতা থেকে তারা যেটা বলার চেষ্টা করেছেন সেটা হচ্ছে, কিছু সফলতা যেমন সুনাম বা কর্মক্ষেত্রে উন্নতি আসলেও তা স্থায়ী হয় না যদি কোন ব্যাক্তির সচেতনতা বা সেলফ অ্যাওয়ারনেস না থাকে।

স্বকীয় মোটিভেশন বিষয়টা গুণগত। এটা একটা মানুষের জীবনদর্শন, আত্মিক তৃপ্তির জায়গা থেকে এসে থাকে।

এখন দেখা যাক, সচেতনতা বা সেলফ অ্যাওয়ারনেস বলতে মূলত কি বুঝায়? একজন ব্যাক্তির সচেতনতা বলতে তার নিজ সীমাবদ্ধতা এবং সামর্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা, সীমাবদ্ধতার জায়গা থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা, সমালোচনা থেকে গঠনমূলক শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতা এবং নিজের সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রগুলোতে উপযুক্ত সহকর্মীর দক্ষতাকে ব্যবহার করে সমস্যা সমাধানের সামর্থ্য ও মানসিকতাকে ইঙ্গিত করে।

যারা নেতৃত্বে সফল হয়ে থাকেন, তাদের সবসময় দেখা যায় মূল লক্ষ্যের সঙ্গে মেধা ও মনন দিয়ে লেগে থাকতে। আর খোলামেলা মানসিকতা নিয়ে শিষ্য বা সহকর্মীদের সঙ্গে শেয়ার করতে। কোনো ধরনের হীনমন্যতা বা জড়তা নিয়ে তারা কাজ করেন না। অথেনটিক নেতাদের কিছু বিষয় বেশ লক্ষ্যণীয় হয়ে থাকে। যেমন, এরা উচ্চ মাত্রার মোটিভেশন ধারণ করেন। এই মোটিভেশনকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন: বাহ্যিক এবং স্বকীয় মোটিভেশন। বাহ্যিক কিছু বিষয় আছে যা মোটামুটি সবাইকে মোটিভেট করে থাকে। যেমন: পদোন্নতি, অর্থনৈতিক সুবিধা ইত্যাদি। কিন্তু, স্বকীয় মোটিভেশন বিষয়টা গুণগত। এটা একটা মানুষের জীবনদর্শন, আত্মিক তৃপ্তির জায়গা থেকে এসে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কোনও কাজের প্রতি আগ্রহ অনুভব করা, কাজকে প্রকৃত অর্থে উপভোগ করা, নিজস্ব উন্নয়নের তাগিদ ও সুযোগ থাকা ইত্যাদি। একজন নেতা যখন বাহ্যিক এবং স্বকীয় মোটিভেশন অর্জন করতে পারেন তখনই তার পক্ষে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য লেগে থেকে কাজ করা সম্ভব হয়। সহকর্মীদের দিকে খেয়াল রাখা এবং তাদের সঙ্গে মিলে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়।

ব্যাক্তি পর্যায়ে সব মানুষেরই কিছু সাফল্য থাকে। কিন্তু কোনও দলের নেতৃত্বে থেকে কোনও চালেঙ্গিং লক্ষ্যে পৌঁছানোর তৃপ্তি সম্পূর্ণ আলাদা। একজন অথেনটিক নেতা যখন তার লক্ষ্যে পৌঁছান, তখন খুব শিগগিরই সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে পরিণত হয় এক ধরনের সন্তুষ্টিতে। আর এটাই হচ্ছে অথেনটিক নেতার চ্যালেঞ্জ ও প্রাপ্তি। জীবনে যে যত বেশি সেলফ অ্যাওয়ারনেস-এর বিকাশ ঘটাতে পারবেন, কর্মক্ষেত্রে তা তাকে আনুপাতিক হারে সফলতা এনে দেবে।

লেখকঃ স্কোয়াড্রন লিডার, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী

বিভাগ:কলাম
Share.

Leave A Reply