আমাদের গ্যাস, আমরা আমদানি করি

জাকারিয়া জালাল:

লেখার শুরুতে একটা মজার গল্প বলি। মহিমাচরণ নামে এক গরিব প্রতিবেশী একদিন গোপালের কাছে এসে বললেন, বুঝলে ভায়া, একটা মাত্র ছেলে, ছেলেটার ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমি শিউরে উঠি মাঝে মাঝে। গোপাল বললেন, ‘কেন কি হয়েছে তাঁর?’, গরিবের ঘোড়া রোগ হলে যা হয়, খায় দায় আর সারাদিন টোঁ টোঁ করে ঘুড়ে বেড়ায়। কোনো কাজকর্মে মন দিচ্ছে না। গোপাল বললেন, অত ভাবনা কিসের? বোঝাই যাচ্ছে আপনার ছেলে গো-বেচারা নয়, তাই রত্নটি ঘোড়া রোগে মারা যাবে না। ওই লায়েক ছেলেকে এক ডাগর মেয়ে দেখে বড় ঘরে বিয়ে দিয়ে বড়লোক করে দিন। ঘোড়া রোগও সেরে যাবে’

লেখার শুরুতে গল্প কেন করলাম তার ফিরিস্তি পরে দিচ্ছি। এখন মূল প্রসঙ্গে আসি।

আল্লাহর অশেষ রহমত বর্ষিত আছে আমাদের এই অতি ক্ষুদ্র ব-দ্বীপে। কর্কটক্রান্তি রেখা আমাদের উপর দিয়ে যাওয়ায় নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার এক অপূর্ব লীলাভূমি এই দেশ। শুধু প্রাকৃতিক ভাণ্ডার নয় নদীমাতৃক ক্ষুদ্র এই দেশটিকে আল্লাহ তাআলা খনিজ সম্পদ দিয়ে পূর্ণ করে রেখেছেন। গ্যাস, কয়লা, শিলা সবই দিয়েছেন উজাড় করে। আল্লাহ তাআলা সবই দিয়েছেন কিন্তু আমরা ঐ মহিমাচরণের ছেলের মত ঘোড়া রোগ সারাতে পারি নাই। নিজেদের দৈন্যতাকে পুঁজি করে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল হয়েছে ধনী আর দেশ রয়ে গেছে গরিব।

প্রসঙ্গে ফিরে আসি কিছু উপাত্ত দিয়ে। প্রাকৃতিক গ্যাস নির্ভর আমাদের দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩ বিসিএফ (বিলিয়ন কিউবিক ফিট), কয়েকদিন আগের পরিসংখ্যানে ২.৭ বিসিএফ-এর যে যোগান হয়েছে তার ৬০ ভাগ সরবরাহ করেছে বিদেশি (শেভরনঃ ৫৬%, তাল্লো ৪%) কোম্পানিগুলা। আর ৪০ শতাংশের যোগানদাতা পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রাণাধীন (বিজিএফসিএল ৩০%, এসজিএফএল ৫% আর বাপেক্স ৫%) কোম্পানিগুলা। ২১ টা গ্যাসকূপ, যার ১৮টি সরকারি মালিকানাধীন আর বাকী তিনটা বিদেশি আইওসি কোম্পানি পিএসসি (প্রোডাক্ট শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট)- এর আওতাধীন।

পিএসসি সম্পর্কে একটা ধারণা দেই। এটা একটা আন্তর্জাতিক মানের চুক্তি। এতে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাসকূপ খনন এবং গ্যাস বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হয়।

এই চুক্তির আওতায় বিদেশি কোম্পানিগুলার সঙ্গে একটা উইন-উইন চুক্তি করার চেষ্টা করা হয়, যাতে করে সরকার ও বিদেশি কোম্পানি; উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। ১৯৬৬ সালে প্রথম ইন্দোনেশিয়াতে এই ধরনের চুক্তি হয়। এখন পর্যন্ত ৭৪টি দেশে এ ধরনের প্রায় ২৫০+ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় গ্যাস এক্সপ্লোরেশনের রিস্ক এবং রিওয়ার্ড বিদেশি কোম্পানির। কিন্তু লাভের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের একটা ভালো অংশ থাকে। বিদেশি কোম্পানিগুলার একটা বড়সড় রিস্ক হচ্ছে ড্রিল করে গ্যাস না পাওয়া। অবশ্য এ ধরনের নজির খুব কম। কিন্তু সিজমিক স্টাডি বা আদার কিছু ক্ষেত্রে কিছু বিনিয়োগ এদের সবসময় করে যেতে হয়। পুরো চুক্তিতে দুই পক্ষের জন্য তিনটি ব্যাপার খুব গুরুত্বপূর্ণ। দর কষাকষির পজিশন, আলোচনার দক্ষতা, সংশ্লিষ্ট দেশের আর্থিক অবস্থা।

নিজস্ব দক্ষতা উন্নয়নও কিন্তু সক্ষমতার একটা অপরিহার্য অনুষঙ্গ। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আমরা বাপেক্সকে পুরোপুরি গতিশীল করতে পারিনি।

বিদেশি কোম্পানিগুলার ক্ষেত্রে গ্যাস এক্সপ্লোরেশনের যে অনিশ্চয়তা থাকে তা হচ্ছে নো ডিসকভারি অব গ্যাস, ডিসকভারি বাট নট কমার্শিয়াল, এস্টিমেটেড কস্ট বেড়ে যাওয়া, গ্যাসের দাম কমে যাওয়া ইত্যাদি। নিজস্ব কারিগরি ক্ষমতা না থাকলে এই পিএসসি কন্ট্রাক্টগুলোই ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এর বিকল্প রাতারাতি তৈরি করা কঠিনই বটে। পৃথিবীর জ্বালানীসমৃদ্ধ দেশ; হোক তা উন্নত বা উন্নয়নশীল, সব দেশেই এই আইওসি মানে পেট্রোলিয়াম জায়ান্টদের আধিপত্য চোখে পড়ার মতো।

নিজস্ব দক্ষতা উন্নয়নও কিন্তু সক্ষমতার একটা অপরিহার্য অনুষঙ্গ। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আমরা বাপেক্সকে (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন কোম্পানি) পুরোপুরি গতিশীল করতে পারিনি। উল্টো আমার কাছে মনে হয়েছে তার দিক নির্দেশনাতে একটা বড় ধরনের খুঁত বিদ্যমান। একটা স্বাধীন ও সক্ষম কোম্পানি দরকার যারা শুধু গ্যাস এক্সপ্লোর করে যাবে, কিন্তু এরাই যখন আবার গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্ট করে তখন স্বাতন্ত্র্যতা থাকে না। তখন মূল যে কার্যকারিতা তার অনেকটা ভাটা থেকে যেতে পারে। প্ল্যান্টগুলো পরিচালনার জন্য আলাদা কোম্পানি তো আছেই। বাপেক্সকে সমৃদ্ধ করতে হবে শুধু এক্সপ্লোরেশনের জন্য। এদের বিশেষায়িত হতে হবে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। সম্প্রতি বাপক্সের এক জব সারকুলার চোখে পড়লো। যেখানে প্রকৌশলী বা ভূতত্ত্ববিদের চেয়ে ডাবলেরও বেশি প্রশাসক নিয়োগের কথা বলা আছে। এগুলো কিন্তু সামনের দিনে আরো সর্ষের ভূতের সংখ্যাই বাড়াবে তা সন্দেহাতীতভাবে বলে দেওয়া যায়।

যত দ্রুত সম্ভব আমাদের এই খাতে বিনিয়োগ এবং সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নয়তো শুরতে লেখা গল্পটা অনেকটা প্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে আমাদের জন্য। কারণ অনেকটা গোপাল ভাঁড়ের পথটাকেই আমরা বেছে নিয়েছি কিনা।

লেখকঃ কেমি প্রকৌশলী (বুয়েট),এমবিএ (আইবিএ)।

বিভাগ:কলাম
Share.

Leave A Reply