প্রশাসনের ভূমিকায় ছাত্রলীগ

Chhatra League_The Dhaka Report

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের বড় আতঙ্কের নাম ‘সিট পলিটিক্স’। ভর্তি হওয়া নবীন শিক্ষার্থীদের দলে ভেড়াতে হল বরাদ্দ পাওয়ার আগেই রাজনৈতিক দলের ‘বড় ভাই’রা দায়িত্ব নিয়ে ছাত্রদের আবাসিক হলে তুলে নেন জুনিয়র শিক্ষার্থীদের। তারপর তাদের মাধ্যমে করানো হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি। কর্মসূচির নামে চালানো হয় কোনো কোনো সময় নির্যাতন। হল পাহারা দেওয়া, নাইট ডিউটি করা, গণরুমে গাদাগাদি করে থাকা, র্যাগিংয়ে অংশ নেওয়া, গেস্ট রুমে নিয়মিত যাওয়া-আসা করতে হয় এই জুনিয়রদের। ছাত্রসংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ ও বিরোধী ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধলেও এই জুনিয়রদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র, এমন নজিরও বিরল নয়। আর বিভিন্ন রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং তো রয়েছেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছাত্রসংগঠনগুলোর খপ্পরে পড়েন নবীন শিক্ষার্থীরা। এরপর আর লেজুড়বৃত্তির ছাত্রসংগঠনগুলোর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না শিক্ষার্থীরা। এভাবে দিনের পর দিন ক্লাস পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হচ্ছে তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হল প্রশাসন কার্যত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হাতে জিম্মি। বর্তমানে ঢাবির হলগুলোতে প্রশাসনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ। ভর্তির পর একজন শিক্ষার্থীকে হলে থাকার ব্যবস্থা, কক্ষ বরাদ্দ, এমনকি আনুষাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা দেওয়া সহ নানা কাজগুলো পরোক্ষভাবে পালন করছে এই ছাত্রসংগঠনটি। অনেক ভুক্তভোগি জানান, ঢাবির হলগুলোতে প্রশাসন নামে মাত্র কক্ষ বরাদ্দ দেয়। প্রশাসনের বরাদ্দকৃত সিটে উঠতেও পারে না শিক্ষার্থীরা। সিটে তোলা, খালি করার পাশাপাশি এমনকি সিট ভাড়াও দিচ্ছেন কতিপয় ছাত্রলীগ নেতা। ছাড়া আবাসন সমস্যাকে কেন্দ করে শিক্ষার্থীদের জোর করে দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য করছে সংগঠনটি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হল প্রশাসনের তদারকির অভাবে হলের সিট বণ্টনে নানা বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাদের। অনেক হলে প্রশাসনের তদারকি না থাকায় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতারা সিট নিয়ে করছে নানা বাণিজ্য। এছাড়া সিট বণ্টনকে ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান গতরাতে বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে দাবি করেন, ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন সিট বরাদ্দ দেয় না। প্রশাসনের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা হলে ওঠেন। তবে গণরুমের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রশাসনের সাথে কথা বলে কিছু শিক্ষার্থী তোলেন। জোর করে রাজনৈতিক কর্মসূচি, নাইট ডিউটি’র ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নাই। গেস্টরুম করার ব্যাপারে তিনি বলেন, এটা একটা মতবিনিময়ের মত। জোর করে শিক্ষার্থীদের আনা হয় না এখানে। তারা নিজ থেকেই আসেন।
জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হাফিজুর মোল্লা। ছাত্রলীগের ‘বড় ভাইদের’ মাধ্যমে উঠেছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলে। শীতকালেও তাকে থাকতে হতো বারান্দায়, যেতে হতো বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। তীব্র শীতে ধকল সইতে না পেরে হাফিজুর আক্রান্ত হয় নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডে। এরপর তিনি মারা যান। হাফিজুরের সহপাঠী ও পরিবারের অভিযোগ, শীতের মধ্যে বারান্দায় থাকা এবং রাতের বেলায় ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যাওয়ার কারণে হাফিজ ঠান্ডায় আক্রান্ত হন। অসুস্থ অবস্থায় তীব্র শীতের মধ্যেও হাফিজকে রাতে বাইরে ডিউটি করতে হয়েছে বলেও অভিযোগ তার সহপাঠিদের। তাঁকে প্রায়ই অন্য কর্মীদের সঙ্গে হলের ‘গেস্টরুম’ও করতে হতো।
বিশ্ববিদ্যালয়টির সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. গোলাম মোহাম্মদ ভূঞা গতরাতে বলেন, অবৈধভাবে যদি কেউ হলে থাকেন তবে তার দায় তো প্রশাসন নেবে না। যদি কোন সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা হলে ওঠে এ ব্যাপারে ঐ সংগঠনকেই জিজ্ঞাসা করুন। বৈধ কোন শিক্ষার্থী হলে উঠতে ও অবস্থান করতে কোন সমস্যা হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে হেনস্তা বা নিপীড়নের অভিযোগ আনলে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশের একমাত্র আবাসিক ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের। তবে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের উপর বর্তমান ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের ‘প্রভাব’ এখানেও উল্লেখযোগ্য। প্রতিবছর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা হলে প্রবেশ করলেই তাদেরকে নিয়ে চলে রাতভর নানা ‘কর্মসূচি’। প্রথমদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি আবাসিক হলেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসব শিক্ষার্থীদের নিয়ে গেষ্টরুমে ব্যস্ত থাকেন। এছাড়া ছাত্রলীগের মিছিল মিটিং সমাবেশে জোরপূর্বক এসব শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়ার ও অনেক অভিযোগ রয়েছে। এমনকি দুই আবাসিক হলের মধ্যে সংঘর্ষকালে জুনিয়রদের হাতে জোরপূর্বক দেশীও অস্ত্র তুলে দেওয়ারও নজির রয়েছে। এসব মারামারিতে অংশ নিতে অপারগতা প্রকাশ করলেই চর-থাপ্পরসহ হল থেকে বের করে দেওয়ার ও হুমকি দেন ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা ঐসব নেতাদের কথামত কাজ করেন বলে জানান ভুক্তোভোগী শিক্ষার্থীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রথম বর্ষের (৪৪ তম ব্যাচ) একাধিক শিক্ষর্থী বলেন, প্রথমদিকে অনেক রাত পর্যন্ত গেষ্টরুমে অমানুষিক নির্যাতন চালান বড় ভাইরা। তাদের কথা না শুনলেতো হলে থাকাই যাবে না। এসব ক্ষেত্রে আবাসিক হল প্রশাসনও নিরব থাকে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রথমবর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের হলে তুলে তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের চাপ দেওয়া হয়। রাজনৈতিক কর্মসূচির চাপে ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারছে না অনেক শিক্ষার্থী। দিনের পর দিন ক্লাস পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হচ্ছে তাদের। রাজনীতি করতে গিয়ে অনেকেই হারিয়েছেন ছাত্রত্ব। নবাব আব্দুল লতিফ হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর রহমান বলেন, হল ইউনিটের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় বিভিন্ন চাপ নিতে হচ্ছে ছাত্রলীগকে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে জুনিয়রদের হল থেকে নিয়ে যেতে হয়। এটা করতে গিয়ে পড়াশোনার সমস্যা যে হয় না তা বলা কঠিন। বিশেষ করে পরীড়্গা কয়েকদিন আগে কোনো অনুষ্ঠানে হল থেকে শিক্ষার্থী নিয়ে যাওয়ার সময় পড়ালেখার ক্ষতি হয়। তবে সংগঠনকে ভালোবেসে আমাদেরকে তা করতে হয় বলেও জানায় এই নেতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম (এসএম) হল শাখা ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, দেখা যায় কোনদিন ইনকোর্স পরীক্ষা আছে কিন্তু সেদিন রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকলে পরীক্ষা বাদ দিয়ে হলের কর্মসূচিতে যোগ দিতে হয়।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, এখানে ছাত্রদের জন্য চারটি হল রয়েছে। শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে হলে সিট বরাদ্দ পেলেও হলে উঠতে হয় ছাত্রসংগঠনের ‘হাত ধরে’। এছাড়া কেউ হলে সিট মিলে না। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় হল প্রাধ্যক্ষরাও ছাত্রদের বৈধ সিটে তুলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। এতে জিম্মি হয়ে পড়ে সাধারন শিক্ষার্থীরা। নিজের দলের ভেড়ানোর গ্রিণ সিগন্যাল না পেলে অনেকক্ষেত্রেই ছাত্রদের হলে ওঠার কোন সুযোগ দেয় না ছাত্রসংগঠনগুলো। ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের নীতিতে যোজন যোজন দুরত্ব থাকলে এক্ষেত্রে দুই ছাত্রসংগঠনেরই নীতি এক। কার্টিসি: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

 

বিষয়বস্তু:
Share.

Leave A Reply