৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪|২৫ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯|১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭|বৃহস্পতিবার, সকাল ১০:২৭

বড় অপরাধে পুলিশের ছোট সাজা

Bangladesh Police_The Dhaka Report

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

গত ২০ জানুয়ারি এক নারীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অবনী শংকর করসহ যাত্রাবাড়ী থানার পাঁচ পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ ঘটনার পর ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁকে যাত্রাবাড়ী থানা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) বদলি করা হয়েছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশের শাস্তি বদলি, প্রত্যাহার বা সাময়িক বরখাস্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পুলিশের এক হিসাবে জানা গেছে, ২০১৫ সালে ১০ হাজারের ৩৪ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৭৮ জনের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ফৌজদারি অপরাধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নজির একেবারেই কম। ২০১৫ সালে প্রায় ৩০ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে।

গত সোমবার রাতে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্স আবুল ফজলকে পিটিয়ে আহত করে। এ ঘটনায় হামলাকারী পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মুশফিকুর রহমান, কনস্টেবল আনোয়ার হোসেন ও ফজলুল হককে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

২৯ জানুয়ারি রাতে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের রাস্তায় এক যুবক ও তাঁর বান্ধবীকে আটকে ইয়াবা বড়ি সেবনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে পুলিশ। এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাঁদের দুজন এসআই ও দুজন কনস্টেবল। এর বাইরে এদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

যদিও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ৭ ফেব্রুয়ারি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের এক অনুষ্ঠানে বেপরোয়া আচরণকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, দু-চারজনের জন্য পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, এটা মানা যায় না। এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি রংপুরে মাহীগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির নতুন ভবনের উদ্বোধনকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি ভয় কাজ করছে মন্তব্য করে সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে না পারলে কর্মকর্তাদের মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি বলেছিলেন, দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ কারও গায়ে হাত তুলতে কিংবা মারধর করতে পারবে না। গত ২৯ জানুয়ারি পুলিশ সপ্তাহের সমাপনী দিনে আইজিপি মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, কোনোভাবেই মানুষকে হয়রানি করা যাবে না।

পুলিশ কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীরা বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ সদর দপ্তর অভিযুক্ত সদস্যদের গুরুদণ্ড না দিয়ে লঘুদণ্ড দেয়। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, ফৌজদারি মামলার অপরাধ করলেও বেশির ভাগ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দিয়েই ইতি টানা হয়। অনেক সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এলে সময় নিয়ে কৌশলী তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে রক্ষা করা হয়।

৯ ফেব্রুয়ারি সাম্প্রতিক পুলিশের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাকিরা যাতে আইন মেনে চলেন, তার জন্য তাঁদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ভালো কাজে পুরস্কার এবং খারাপ কাজ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে ফল পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

পুলিশের কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম এ কথা বললেও পুলিশ সদস্যদের অপরাধপ্রবণতা কমছে না। গত সোমবার রাতে পুরান ঢাকার আলু বাজারে রেজাউল কবির নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে পাঁচটি সোনার বার ছিনিয়ে নেন বনানী থানার এসআই আশরাফুল ও বিমানবাহিনীর চাকরিচ্যুত সদস্য আবদুর রাজ্জাক। একইরাতে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার তিয়রবিল পুলিশ ফাঁড়িতে শরিফুল ইসলাম নামের এক যুবককে পিটিয়ে আহত করে। এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কনস্টেবল এ ঘটনায় কনস্টেবল বেলাল আহমেদকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের চিড়িয়াখানা লেকের পাড়ে শাহ আলী থানার পুলিশের উপস্থিতিতে পুলিশের সোর্স দেলোয়ার হোসেন চা-দোকানি বাবুল মাতবরকে লাথি মেরে কেরোসিনের চুলায় ফেলে দিলে তিনি দগ্ধ হয়ে মারা যান। উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেননি। আবার থানায় গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে থানা মামলা নেয়নি। এ ঘটনায় শাহ আলী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে এখনো বিভাগীয় মামলা হয়নি।

৬ ফেব্রুয়ারি কল্যাণপুর পোড়া বস্তিতে পুলিশ নিরীহ রিকশাচালক সাজু মিয়াকে গুলি করে আহত করে। এ ঘটনায় কনস্টেবল রেজদি মিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

১৬ জানুয়ারি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার শিহিপাশা গ্রামে পুলিশের বেধড়ক পিটুনিতে গুরুতর আহত হন ব্যবসায়ী বাদল সেরনিয়াবাত। রাস্তার পাশে গাছ ফেলে রাখার অপরাধে আগৈলঝাড়া থানার ওসি মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ ওই ব্যবসায়ীকে পেটায়। এ ঘটনায় ওসির গাড়িচালক কনস্টেবল মোকলেসুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হলেও দায়িত্বে বহাল আছেন ওসি মনিরুল ইসলাম।

২৮ জানুয়ারি যশোরের ঝিকরগাছায় সুইডেনপ্রবাসী দম্পতির কাছ থেকে তিন হাজার ডলার ছিনিয়ে নেয় পুলিশ। ওই রাতেই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ছিনতাই করতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। ২৯ জানুয়ারি রাতে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের রাস্তায় এক যুবক ও তাঁর বান্ধবীকে আটকে ইয়াবা বড়ি সেবনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে পুলিশ। এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাঁদের দুজন এসআই ও দুজন কনস্টেবল। ৫ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র দাসকে পেটান। গত ৯ জানুয়ারি মধ্যরাতে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীর কাছ থেকে টাকা না পেয়ে এসআই মাসুদ শিকদার তাঁকে বেধড়ক পেটান।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি আদাবর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রতন কুমার হালদারের বিরুদ্ধে রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগের সত্যতা পায়। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক সালেহ উদ্দীন গত মঙ্গলবার বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে যোগাযোগ করা হলে আদাবর থানার ওসি শেখ তুহিনুজ্জামান বলেন, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আদেশ হাতে পাননি তিনি।

৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, অনেক দিন ধরে চলে আসছে। দোষী পুলিশ সদস্যদের শাস্তি না হওয়ায় অপরাধ তৎপরতা চলছে। পুলিশের এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন না ভেবে কৌশল নির্ধারণ করা উচিত। না হলে মানুষের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব বেড়ে যাবে। তাদের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না। কার্টিসি: প্রথম আলো।

Share.

Leave A Reply