ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অছাত্র, বিতর্কিতরা

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

ইয়াবা ব্যবসা, অপহরণ, হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আছে এমন নেতারাও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ কমিটির সহসভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে এখন কেউ আর নিয়মিত ছাত্র নন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ‘সুপার ফাইভ’ কমিটির মতো পূর্ণাঙ্গ কমিটিও কথিত ‘সিন্ডিকেটের’ বাইরে যেতে পারেনি।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের ঘনিষ্ঠ অনুসারী অনেকে নিষ্ক্রিয় থেকেও পদ পেয়েছেন। আবার বিরাগভাজন হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থেকেও বাদ পড়েছেন কেউ কেউ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের সাবেক একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটির ৩০১ সদস্যের অধিকাংশই সংগঠনের সাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের অনুসারী। তাঁরা দুজনই সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদারের অনুসারী। এতে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কথিত ‘সিন্ডিকেট’ বিরোধী কোনো নেতার অনুসারী স্থান পাননি। তাঁর কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামসুল কবিরের কথায়।

গতকাল সোমবার রাতে কমিটি ঘোষণার পর ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামসুল কবির তাঁর ফেসবুক পাতায় লেখেন, ‘অভিনন্দন ছাত্রলীগের নবগঠিত পূর্ণাঙ্গ কমিটির নেতাদের। ত্যাগ ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু আমার অনুসারী হওয়ার অপরাধে যারা কমিটিতে জায়গা পায়নি, তাদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’

কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ

২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল-ছাত্রলীগের সংঘর্ষের সময় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিনকে মাথায় লোহার রেঞ্চ দিয়ে আঘাত করেন ইমতিয়াজ বুলবুল ওরফে বাপ্পী। এমন অভিযোগের পরও তিনি ছাত্রলীগের গতকালের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহসভাপতি হয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের অবৈধ বাসিন্দাও।

আনোয়ার হোসেন অরফে আনু এবং নিশিতা ইকবাল নদীও সহসভাপতি হয়েছেন। তাঁদের দুজনের বিরুদ্ধেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ও আশপাশের এলাকায় মাদক ব্যবসার অভিযোগে গণমাধ্যমে সংবাদ বের হয়। এ ছাড়া আনুর বিরুদ্ধে অনুসারী ‘জুনিয়রদের’ দিয়ে ছিনতাই করানোর অভিযোগও রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহমেদ কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষক লাঞ্ছনার অভিযোগে ২০১৩ সালে ‘তিন মাসের স্থগিত বহিষ্কার’ শাস্তিও দেওয়া হয়।

সাকিব হাসান সুইমকে সহসভাপতি করা হয়েছে। তিনি ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। চাঁদা ও আধিপত্যের জেরে ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্র আসাদুজ্জামান ফারুক মারা যান। সুইম এ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। এ ঘটনার পরই তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। ঢাকা কলেজ ও আশপাশের এলকায় তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজির অভিযোগও। সুইম কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইনের ‘খুব কাছের’ অনুসারী বলে পরিচিত।

কাজী এনায়েতকে সহসভাপতি করা হয়েছে। তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজসেবা-বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। শাহবাগের ফুলের দোকানে চাঁদাবাজি ও শিক্ষা ভবনের টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হয়েছেন। নানা অপরাধে জড়িয়ে ছাত্রজীবন শেষ করতে পারেননি তিনি।

মুহসীন হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান এবার পেয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি পদ। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ইয়াবা ব্যবসার। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ইয়াবা চালানের সময় আটক হওয়া ব্যক্তিরা জবানবন্দিতে মেহেদির নাম বলেন।

আশিকুল পাঠানকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক কর্মসূচি ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদক। তাঁর বিরুদ্ধে গত বছর ক্যাম্পাসে প্রাইভেট কার চাপা দিয়ে এক রিকশাচালককে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চাঁদাবাজি ও ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সৃজন ঘোষকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় ২০১৪ সালে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় তাঁকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরও তিনি পদ পেয়েছেন।

কমিটি নিয়ে আক্ষেপ করে ছাত্রলীগের আরেক সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শারমিন সুলতানা তাঁর ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘অভিনন্দন ছাত্রলীগের নবগঠিত কমিটিকে। শুধু কষ্ট রয়ে গেল, পরিশ্রমী আর তেলবাজ, চাটুকারদের আর ফাইফরমাস খাটাদের একই কাতারে নিয়ে আসাতে। যোগ্যতার মাপকাঠি যেখানে অতিমাত্রায় তৈলমর্দন, সেখানে যোগ্যতা বলে কিছু নাই। সব ফটোশপ। আর এখন তো কথাই নাই। চলছে ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল তেলবাজি। একটু কৌশলী হলেই মাঠে-ময়দানে না থেকেও আপনি পেতে পারেন, আপনার কাঙ্ক্ষিত পোস্ট।’

ছয় সাংবাদিককে কমিটিতে স্থান

ঘোষিত কমিটিতে তিনটি জাতীয় দৈনিকের নিজস্ব প্রতিবেদক হাবিবুর রহমানকে গণযোগাযোগ-বিষয়ক উপসম্পাদক, রফিকুল ইসলাম রনি ও রুহুল আমিনকে সহসম্পাদক করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় একটি দৈনিকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রেজাউদ্দৌলা প্রধান ওরফে রেজা আকাশ ও আরেকটি দৈনিকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি পিয়াল হাসানকে সহসম্পাদক করা হয়েছে। সহসম্পাদক পদে এই চারজন ছাড়াও আরেকজন সাংবাদিক সহসম্পাদক হয়েছেন। তিনি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজ করেন। তবে তিনি নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। অথচ ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের শেষ পৃষ্ঠায় বিশেষ দ্রষ্টব্য দিয়ে লেখা রয়েছে, ‘উপরিউক্ত কমিটিতে কেউ ব্যবসা বা চাকরিতে যোগদান করিলে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হবে।’ হাবিবুর রহমান ও রুহুল আমিন ছাড়া কাউকেই কখনো ছাত্রলীগের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়নি।

গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি হওয়ার কথা ২৫১ সদস্যের। এবার কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে ৩০১ সদস্যের। এ কমিটিতে সহসভাপতি পদে রাখা হয়েছে ৬১ জনকে, আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক রাখা হয়েছে ১১ জন করে। এ ছাড়া ১১১ জন উপসম্পাদক, ৪৬ জন সহসম্পাদক রাখা হয়েছে। এখনো সদস্যদের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

কমিটি গঠনের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান বলেন, ‘বিবাহিত, বয়স ঠিক আছে কি না, তা দেখে আমরা কমিটিতে স্থান দিয়েছি। নিয়মিত ছাত্র কি না, সেটাও প্রাধান্য দিয়েছি।’

কমিটিতে বিতর্কিত নেতাদের স্থান দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাঁরা বিভিন্ন সময় কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিল। ওই সময় অনেক পত্রিকা অনেকভাবে নিউজ করছে। আমরা প্রতিটি থানায় খোঁজ-খবর নিয়ে তাঁদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। যেমন আনোয়ার হোসেন আনুর বিরুদ্ধে হলের সভাপতি থাকার নানা উল্টাপাল্টা নিউজ হইছে। সব নিউজ তো সত্য হয় না।’ যাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তাঁদের কমিটিতে রাখা হয়নি বলে দাবি তাঁর। কার্টিসি: প্রথম আলো।

গত বছরের ২৬-২৭ জুলাই ছাত্রলীগের ২৮তম জাতীয় সম্মেলন হয়। ওই সম্মেলনে পাঁচ সদস্যের ‘সুপার ফাইভ’ কমিটি গঠিত হয়। সম্মেলনের প্রায় সাত মাস পর গতকাল সোমবার রাতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হলো।

Share.

Leave A Reply