সাইকেল চালান, ওজন কমান

ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু:

আমাদের দেশে নতুন হলেও বিদেশে কিন্তু সাইক্লিং পুরাতন একটি ধারণা। সভ্যতার ক্রমবিকাশে হাঁটা, ঘোড়া থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক সুপারসনিক উড়োজাহাজে চলছে মানুষ। সাইকেল মাঝামাঝি একটি আবিষ্কার।

এখনকার দিনে মানুষ সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে। শরীর ঠিক রাখার জন্য সময় কোথায় তাদের? তাই তো দিন দিন বেড়ে চলেছে রোগবালাই। বাড়ছে হার্ট অ্যাটাক,স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও স্থুলতা।

ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে। শরীর ফিট রাখতে হলে শারীরিক পরিশ্রমের বিকল্প নেই। সাইক্লিং তেমনি একটি ব্যায়াম যেটি শরীরকে রাখতে পারে চাঙ্গা, ফিট। দূরে রাখে রোগবালাই।

ইদানীং শহুরে ছেলেদের দেখা যায় মাথায় হেলমেট পরে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে বেড়িয়ে পড়তে ছুটির দিনে। গবেষকরা সাইক্লিং নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। এমন বেশ কয়েকটি গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে আজকের এ আয়োজন।

স্থুলতা দিন দিন মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর কারণে বাড়ছে ক্যানসার,ডায়াবেটিস,হার্টের অসুখ। ওজন কমাতে স্থূলদের চেষ্টার শেষ নেই। গবেষকরা বলছেন, শরীর ফিট রাখতে প্রতিসপ্তাহে দুই হাজার ক্যালরি শক্তি ক্ষয় করতে। অথচ মাত্র ঘণ্টাখানেক সাইকেল চালালে শক্তি ব্যয় হয় ৩০০ ক্যালোরি। ব্রিটিশ গবেষকরা দেখেছেন প্রতিদিন মাত্র আধা ঘণ্টা সাইকেল চালালে বছরে পাঁচ কেজি চর্বি ঝরানো সম্ভব হয়।

আমাদের দেশে হার্ট অ্যাটাক একসময় মনে করা হতো বৃদ্ধদের রোগ। এখন কিন্তু আর তা শুধু বয়স্কদের রোগ নয়। ২৫-৩০ বছরের যুবকরাও আক্রান্ত হচ্ছে এতে। ডেনিশ একদল গবেষক প্রায় ১৪ বছর ধরে ৩০ হাজার লোকের ওপর গবেষণা করেন। এদের বয়স ছিল ২০-৯৩ বছরের মধ্যে। গবেষকরা খোঁজার চেষ্টা করেন সাইক্লিংয়ের সাথে হৃদরোগের সম্পর্ক। এতে দেখা যায় যারা নিয়মিত সাইক্লিং করেছেন তাঁদের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশ কম। ব্যায়াম না করলে বেশি হয় স্তন ক্যানসার ও বাওল বা পাকস্থলির ক্যান্সার। সাইক্লিংয়ে যেহেতু বেশ পরিশ্রম হয় তাই এ দুটো ক্যান্সারও সাইক্লিস্টদের কম হয়।

বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। দেশেও কিন্তু এ সংখ্যা কম নয়। ফিনল্যান্ডের গবেষকরা সাইক্লিং ও ডায়াবেটিসের সাথে যোগসূত্র দেখার জন্য বিস্তর গবেষণা করেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত সাইক্লিং করেন তাঁদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি শতকরা ৪০ ভাগ কম হয়।

সাইক্লিং করলে মাংসপেশী ও হাড় সুগঠিত হয়। ফলে বয়স বাড়লে হাড়ক্ষয় প্রতিরোধ করে। বৃদ্ধ বয়সে হাঁটুর ব্যথা বা আর্থ্রাইটিসের ভোগেননি এ সংখ্যা হবে হাতে গোনা কয়েকজন। মাংসপেশী ও অস্থিসন্ধি বা জয়েন্ট সুগঠন করার মাধ্যমে সাইক্লিস্টদের আর্থ্রাইটিস কম হয়। শুধু তাই নয় হাটুর আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে সাইক্লিং বেশ ভালো।

সাইক্লিং করলে ত্বকে রক্ত চলাচল বাড়ে। ফলে দেহ থেকে বের হয়ে যায় ক্ষতিকর পদার্থ। এ কারণে ত্বক সহজেই বুড়িয়ে যায় না। অধিকন্তু এটি ত্বকে কোলাজেন টিস্যুর পরিমাণ বাড়ায় ফলে সহজে ত্বকে ভাঁজ পড়ে না। তাই সৌন্দর্য ধরে রাখতে সাইক্লিংয়ের বিকল্প নেই।

ইলিনয়েড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখতে পান, যাঁরা নিয়মিত সাইক্লিং করেন মেন্টাল টেস্টে তাঁরা অন্যদের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি নম্বর পান। কারণ হিসিবে তাঁরা বলেন, মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস নামক স্থানটি স্মৃতিশক্তির জন্য কাজ করে। সাইক্লিং করলে হিপোক্যাম্পাসে স্নায়ুকোষ বাড়ে। তাই তাঁদের স্মৃতিশক্তিও বাড়ে। স্মৃতিলোপ অসুখ আলঝেইমারে তাই সাইক্লিং বেশ কাজে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ফ্যাকাল্টির গবেষণায় দেখা গেছে সাইক্লিং ঘুম ভালো করে। যারা নিয়মিত সাইক্লিং করেন তাঁরা অন্যদের চেয়ে বেশিদিন বাঁচেন। শুধু তাই নয় এটি সুখময় করে দাম্পত্য জীবন।

সাইক্লিং কিন্তু খরচ কমায়, সময় বাঁচায়। এ সময়ে জ্যামে আটকা পড়ে যে পরিমাণ দূষিত বাতাস আপনার ফুসফুসে ঢুকবে ও সময় নষ্ট হবে সাইকেল দিয়ে চলাচল করে দুটোই কমবে। এটি উপরন্তু পরিবেশবান্ধব। তাই দেরি নয় সাইকেল হোক আপনার নিত্যদিনের বাহন। কার্টিসি: এনটিভি।

Share.

Leave A Reply