আদি থেকে অনন্তে

বিশ্বজিৎ ঘোষ

বাংলা ভাষার বয়স কত? কবে জন্ম নিয়েছিল বাংলা ভাষা? কোন ভাষা থেকে সৃষ্টি হয়েছে আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা? এসব প্রশ্নের উত্তর চট করে দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলা ভাষার প্রকৃত উৎপত্তিকাল নির্ণয় করা বেশ কঠিন। এ নিয়ে পণ্ডিত-গবেষকদের মধ্যেও নানা বিতর্ক রয়েছে। এক সময় ভাবা হতো, সংস্কৃত ভাষা থেকে সৃষ্টি হয়েছে বাংলা ভাষা। বলা হতো, বাংলা হচ্ছে সংস্কৃতের দুহিতা। কিন্তু গবেষকদের গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য এ মত খণ্ডন করেছে।

এখন এ মত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে_ সংস্কৃত নয়; প্রাকৃত ভাষা থেকে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে বাংলা ভাষা। বিতর্ক এখানেই থেমে নেই। প্রাকৃত ভাষার কোন শাখা থেকে বাংলার জন্ম, তা আবার নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত ভাষার জন্ম প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্টভাবে জানা গেলেও বাংলা ভাষা সম্পর্কে সে কথা বলা যাবে না।

পৃথিবীর প্রধান পাঁচটি ভাষা-বংশের একটি হচ্ছে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-বংশ বা আদি আর্য ভাষাগোষ্ঠী। আদি আর্য ভাষাগোষ্ঠী থেকেই জন্ম হয়েছে বাংলা ভাষার। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-বংশের পূর্বদিকের সবচেয়ে প্রান্তিক ভাষা বাংলা। জন্মসূত্রে বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে আইরিশ, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, গ্রিক, রুশ, ফারসি, হিন্দি, নেপালি, অসমিয়া প্রভৃতি ভাষার।

বাংলা ভাষার রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস ও বিবর্তনধারা। খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে মধ্য এশিয়ায় বাস করত এক দল যাযাবর লোক। এরা ব্যবহার করত ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা। পরবর্তী সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে তারা নতুন দেশে চলে গেল। ক্রমেই তারা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে।

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর একটি দল ভারতে প্রবেশ করে। তাদের ভাষা ‘আর্য’ [Noble] রূপে পরিচিত ছিল। অগ্রবর্তী দলের পেছনে ছিল আরেকটি দল। তারা ইরান ও মধ্য এশিয়ায় বসবাস শুরু করে। ক্রমেই ইরানীয় ও ভারতীয় আর্য ভাষার মিলনে জন্ম নেয় ইন্দো-ইরানীয় ভাষা।

আনুমানিক তিন হাজার বছর আগে জন্ম নিয়েছিল ইন্দো-ইরানীয় ভাষা। এ ভাষার প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় ‘ঋাগ্গ্বেদে বেদে’ (আ. ১২০০-১১০০ খ্রি.পূ. কালে রচিত)। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকেই আর্যরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ শুরু করে। আর্যদের সঙ্গে ছিল শক্তিশালী বৈদিক ভাষা ও দেবগীতিধর্মী সাহিত্য। স্থানীয় অনার্য অধিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে আর্য ভাষা ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করল। দেখা দিল নানামাত্রিক বিকৃতি ও বিচ্যুতি। এ সংকট থেকে উত্তরণে বৈদিক ভাষার সংস্কার অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সংস্কার করা নতুন ভাষার নাম হলো সংস্কৃত ভাষা। সংস্কৃত ভাষা কিন্তু সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল বিদগ্ধ জন, অভিজাত শ্রেণী ও পুরোহিত সম্প্রদায়ের মধ্যে। সাধারণের অধিকারের দাবি থেকে ক্রমেই জন্ম নিল প্রাকৃত ভাষা। প্রাকৃতজনের ভাষা বলে নতুন এ ভাষার নাম হলো প্রাকৃত ভাষা। সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে বিরোধী সম্পর্ক থেকেই জন্ম নিয়েছে প্রাকৃত ভাষা।

Bangla_The Dhaka Report

প্রাকৃত ভাষা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ু ও উচ্চারণের ভিন্নতার কারণে একেক অঞ্চলের প্রাকৃত ভাষা একেক রূপ পরিগ্রহ করতে থাকে। ক্রমে অঞ্চলের পরিচয়ে প্রাকৃত ভাষা বিভিন্ন হয়ে পড়ল এবং দেখা দিল মাগধী প্রাকৃত, মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত, শৌরসেনী প্রাকৃত, পৈশাচী প্রাকৃত, গৌড়ীয় প্রাকৃত ইত্যাদি।

ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, মাগধী প্রাকৃতের অপভ্রংশ [বা অবহট্ঠ অর্থাৎ যা খুব বিকৃত হয়ে গেছে] থেকে কালক্রমে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করেছে বাংলা ভাষা। পক্ষান্তরে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন, ৬৫০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো সময়ে গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে জন্ম নিয়েছে বাংলা ভাষা। গোটা প্রক্রিয়াটি হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন এভাবে হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা রূপান্তরিত হয়ে বঙ্গীয় অঞ্চলে জন্ম নিয়েছিল এক মধুর কোমল-বিদ্রোহী প্রাকৃত। তার নাম বাংলা। ওই ভাষাকে কখনও বলা হয়েছে ‘প্রাকৃত’, কখনও বলা হয়েছে ‘গৌড়ীয় ভাষা’। কখনও বলা হয়েছে ‘বাঙ্গলা’ বা ‘বাঙ্গালা’। এখন বলি ‘বাংলা’।

উনিশ শতক পর্যন্ত বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে কারও কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে আস্তে আস্তে খুলতে থাকে এই জট। বিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকে এ বিষয়ে দুটি প্রধান মত সমান্তরালভাবে প্রচারিত হতে থাকে। সংস্কৃতপন্থিরা বলতে থাকেন, বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে সংস্কৃত থেকে। পক্ষান্তরে বাংলাপন্থিরা বলতে থাকেন, বাংলার জন্ম প্রাকৃত ভাষা থেকে।

বিশ শতকের প্রথম দশকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা সংঘটিত হয়। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের পুঁথিশালা থেকে আবিষ্কার করেন বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদের পুঁথি। অন্যদিকে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বসন্তরঞ্জন রায় বাঁকুড়া জেলার বিষুষ্ণপুর গ্রামের এক গোয়ালঘর থেকে আবিষ্কার করেন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের পুঁথি। প্রয়োজনীয় সম্পাদনা শেষে পুঁথি দুটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয় ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আবিষ্কার প্রকাশিত হয় ‘হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা’ আর বসন্তরঞ্জনের আবিষ্কৃত পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হয় ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য নামে। ‘হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা’ এবং ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যদ্বয় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পণ্ডিত-গবেষকরা বাংলা ভাষা বিষয়ে, বাংলা ভাষার উৎপত্তি বিষয়ে নানা ধরনের গবেষণা শুরু করেন। বিজয়চন্দ্র মজুমদার, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখের নাম এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন, সপ্তম শতাব্দী থেকেই সৃষ্টি হয় বাংলা ভাষার। তার পর নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে বর্তমান বাংলা ভাষা। চর্যাপদের বাংলা ভাষার সঙ্গে একালের বাংলা ভাষার পার্থক্য অনেক। চর্যাপদের ভাষা স্পষ্ট ছিল না। ছিল আলো-আঁধারির খেলা। নাম পেয়েছে সে ভাষা ‘সন্ধ্যাভাষা’ অভিধায়। চর্যাপদে পড়ে পাই ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর ভাষা। এ কাব্যের ভাষা অনেক স্পষ্ট। রূপকের আচরণ এখানে নেই। এর ভাষায় স্থান পেয়েছে অনেক সংস্কৃত শব্দ। কিন্তু পণ্ডিতদের ধারণা, চর্যাপদ থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষায় যেতে আরও কিছু স্তর অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু সে ভাষার কোনো নিদর্শন আমাদের হাতে এসে পৌঁছেনি।

চর্যাপদের ভাষাকে বলে প্রাচীন যুগের বাংলা ভাষা আর শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষা হচ্ছে আদি মধ্যযুগের ভাষা। বাংলা ভাষার মধ্যযুগের পরিধি ১২০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সময়ের বাংলা ভাষার নিদর্শন পাওয়া যাবে মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণ বিজয়’, কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ পাঁচালী’, কবীন্দ্র-পরমেশ্বর-শ্রীকর নন্দীর ‘মহাভারত পাঁচালী’, বিপ্রদাস-বিজয়গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’, মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’, ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ প্রভৃতি কাব্যে। ‘মনসামঙ্গল’ ছাড়া এসব কাব্যে পশ্চিমবঙ্গ-বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। ব্যবহৃত হয়েছে অনেক সংস্কৃত শব্দ। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে পূর্ববাংলার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কারণ মনসামঙ্গল প্রধানত পূর্ববঙ্গে রচিত হয়েছে।

চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পর মধ্যযুগে প্রচলিত ভাষার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। বৈষ্ণব ও অনুবাদ সাহিত্যে প্রচুর তৎসম শব্দ ব্যবহৃত হতে থাকে। বৈষ্ণব পদাবলিতে বিদ্যাপতি ও গোবিন্দ দাসের ভাষায় বাংলার পাশাপাশি মৈথিলি ভাষা স্থান পায়। অন্যদিকে ষোড়শ শতাব্দী থেকে মুসলিম কবিদের রোমান্সমূলক প্রণয়কাব্যে প্রচুর পরিমাণ আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহৃত হয়ে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সঞ্চারিত হয়। শাহ মুহম্মদ সগীর, আলাওল, মুহম্মদ কবির, দৌলত উজির বাহরাম খান, শেখ চান্দ প্রমুখ কবি এ ক্ষেত্রে পালন করেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। ভারতচন্দ্র রায়-গুণাকরও তার কাব্যে প্রচুরসংখ্যক আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করে বাংলা ভাষার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

উনিশ শতকে বাংলা ভাষা গদ্য ও পদ্য এ দুই ধারায় বিকশিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক শক্তি নিজেদের প্রয়োজনে কাজের গদ্য সৃষ্টিতে সহযোগ দিয়েছিল। ক্রমেই কাজের গদ্য থেকে জন্ম নিল বাংলা গদ্য ভাষা। ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়েছে ইংরেজি, ফরাসি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ প্রভৃতি ভাষার অনেক শব্দ। চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজের পরিধি অতিক্রম করে ক্রমেই এসব ভাষা সাধারণ মানুষের কাছাকাছি চলে আসে।

উনিশ-বিশ শতকে বাংলা ভাষা নানা মাত্রিকতায় বিকশিত হয়েছে। মধুসূদনের হাতে বাংলা ভাষা পেয়েছে পেশির লাবণ্য। রবীন্দ্রনাথ তাকে করে তুলেছেন মানবচিত্তের সমুদয় ভাবের প্রকাশক্ষম। নজরুলের হাতে এসে বাংলা ভাষায় সঞ্চারিত হয়েছে দ্রোহের আগুন। জসীম উদ্দীন আবার সেখানে নিয়ে আসেন লোকায়ত জীবনের উত্তাপ। লোককবিদের রচনায় পাই বাংলা ভাষার আরেক স্বতন্ত্র রূপ। সব মিলিয়ে উনিশ-বিশ শতকের কবিতার হাত ধরে বাংলা ভাষা ক্রমেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে।

গদ্য ভাষার ক্ষেত্রে প্রথমেই স্মরণে আসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা। অবশ্য তার আগে উইলিয়াম কেরি, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার কিংবা ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাও আমরা স্মরণ করব। তবে বাংলা ভাষাকে প্রথম সুশৃঙ্খল ও শিল্পিত করে তোলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বাংলা গদ্যে বিরামচিহ্নের সুষ্ঠু ব্যবহার ও বিষয়ানুগ ভাষা প্রয়োগ বিদ্যাসাগরের অক্ষয় কীর্তি। এর পর বঙ্কিমচন্দ্র, মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরীর শিল্পিত হাত বাংলা গদ্য ভাষাকে নিয়ে গেছে শিল্পের সিদ্ধিচূড়ায়। একুশ শতকে এসে বিশ্বায়নের প্রভাবে বাংলা ভাষায় এখন আবার নতুন বাঁক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। পরিবর্তন-প্রক্রিয়ার পেছনে আছে নানা ঘটনা, নানা অনুষঙ্গ। সন্দেহ নেই অনাগতকালে বাংলা ভাষা অঙ্গীকার করবে আরও অনেক নতুন মাত্রা, অঙ্গে জড়াবে সে আরও কত অলঙ্কার!

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Share.

Leave A Reply