২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪|২৩ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯|১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭|বুধবার, রাত ১২:০০

পুলিশ থেকে ক্ষমা আদায়কারী সাহসী হাবিবা জান্নাতের কথা

সালমান তারেক শাকিল:

হাবিবা জান্নাত—বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি। বৃহস্পতিবার পহেলা বৈশাখের দিন সন্ধ্যার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তার গায়ে হাত দিতে লাঞ্ছিত করার পাশাপাশি গালি দেন পুলিশ কনস্টেবল রুহুল আমিন। এরপরই তিনিসহ অন্য শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুললে ওই কনস্টেবল তার কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। এমনকি লিখিতভাবে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনাও করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। পহেলা বৈশাখের দিনে ঘটে যাওয়া ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে এ প্রতিবেদকের মুখোমুখি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান, প্রাণ পরিসংখ্যান ও তথ্য পরিসংখ্যান বিভাগের স্নাতকোত্তরের এই শিক্ষার্থী।

প্রশ্ন: পহেলা বৈশাখের ঘটনা সংক্ষেপে বলুনকী ঘটেছিল? আপনি কিভাবে ঘটনা মোকাবিলা করলেন?

হাবিবা জান্নাত: পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধভাবে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। সারাদিনের উৎসব শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমরা রাজু ভাস্কর্যের একপাশে এসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে আবার গোটা ক্যাম্পাস টহল দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ওই সময় সেখানে অবস্থানরত একজন পুলিশ কর্মকর্তা ওই জায়গায় এসে আমাদের সরে যেতে বলেন।

পুলিশের আইজির গাড়িকে জায়গা করে দেওয়ার কথা বলে রুহুল আমিন নামের এক পুলিশ কনস্টেবল এসে আমার গায়ে ধাক্কা দেন। উপস্থিত ছাত্র ফেডারেশনের বন্ধুদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ওই পুলিশ সদস্য আমাকে উদ্দেশ করে অশালীন ভাষায় গালি দেন। সঙ্গে-সঙ্গে তাকে পাকড়াও করেন ছাত্র ফেডারেশনের কর্মীরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এসে উপস্থিত হন পুলিশের কর্মকর্তারা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। তাদের ঘটনা জানানোর পর তারা মৌখিকভাবে এর নিষ্পত্তি করতে চান। কিন্তু আমাদের দাবি ছিল, লিখিতভাবে এর জন্য ক্ষমা চাইতে হবে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাবখানা ছিল এমন, তারা চাইলেই মুখে যৌননিপীড়ন করতে পারেন। একরকম ‘স্যরি’ বললেই বিষয়টা শেষ হয়ে যাবে। পুলিশের এই অশালীন আচরণের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করি আমরা। বিক্ষোভের মুখে নতি স্বীকার করে প্রক্টরের কার্যালয়ে ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় নেতাকর্মী ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর, ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার, পুলিশের রমনা জোনের ডিসি, এডিসি, শাহবাগ থানার ওসি ও পুলিশের অন্যান্য কর্মকর্তা। এরপর দাবি অনুযায়ী লিখিতভাবে ক্ষমা চান ওই রুহুল আমিন। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ওই ঘটনার জন্য ডিএমপি’র যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় আমাদের কাছে অনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান।

প্রশ্ন: আপনাকে ঠিক কোন চেতনা এই প্রতিবাদে উদ্বুদ্ধ করেছে?

হাবিবা জান্নাত: আমি বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে গত পাঁচ বছর ধরে যুক্ত আছি। সংগঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য একটি শোষণ-নিপীড়নহীন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। যে সমাজে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা থাকবে। এই চেতনাকে সামনে রেখেই আমাদের সংগ্রাম আমরা পরিচালিত করছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি একক সাহসিকতার চেয়ে সামগ্রিক সাহসিকতায় সব নিপীড়নের মোকাবিলা করতে চাই।

প্রশ্ন: পুলিশের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া হয়েছেআপনি এই ক্ষমা চাওয়ায় সন্তুষ্ট?

হাবিবা জান্নাত: ব্যক্তি রুহুল আমিন অপরাধ করেছেন, ক্ষমাও চেয়েছেন। তার পক্ষ হয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ক্ষমা চেয়েছেন। ওই পুলিশ সদস্যকে শাস্তি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে এই পদক্ষেপ আপাতত যথার্থ হলেও এই অসদাচারণের ঘটনায় জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী জনগণের সঙ্গে নিত্যদিন যে আচরণ করে থাকে, তাই প্রতিফলিত হয়েছে। প্রতিবাদের মুখে তারা ক্ষমা চেয়েছেন, ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি বা নারী তাদের নিপীড়নের শিকার হলে এই সাধারণ ক্ষমা প্রার্থনাটুকুও পাওয়া যায় না। ব্যবস্থা গ্রহণ তো অনেক দূরের কথা। এই ঘটনার মাধ্যমে এটাও প্রমাণিত হয় যে, অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। আমরা গত বর্ষবরণে যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন কোনও পদক্ষেপ দেখিনি, যাতে নারীর প্রতি নিপীড়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে। পুলিশের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হলেও আমি মনে করি বর্তমান পরিস্থিতিতে এর মাধ্যমে জনগণ বিশেষ করে নারীসমাজের মধ্যে একটা প্রতিবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটবে।

প্রশ্ন: আপনার মতো নারীরা যদি এগিয়ে আসে, আপনার কি মনে হয় তাহলে নারীর প্রতি সহিংসতা কমবে?

হাবিবা জান্নাত: যেকোনও ব্যক্তিগত প্রতিবাদ-প্রতিরোধই জরুরি। তবে তার চেয়ে আরও বেশি দরকার, সেই প্রতিবাদগুলোর সামষ্টিক রূপ। নারীর প্রতি সহিংসতা রুখতে নারী-পুরুষ সবারই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। এর কোনও বিকল্প নেই।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে নারী সহিংসতার কারণ কী মনে করেন?

হাবিবা জান্নাত: বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় রীতি-নীতি কোনও কিছুই নারীবান্ধব নয়। নারীর প্রতি এই সমাজের নিপীড়নমূলক পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সব জায়গাতেই প্রতীয়মান হয়। দেশের মানুষের নিরাপত্তা বলতে আজ কিছুই নেই, নারীদের ক্ষেত্রে সেটা আরও প্রকট। সম্প্রতি তনু ধর্ষণ ও হত্যার মধ্য দিয়ে আরও নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ক্যান্টনমেন্টকে ধারণা করা হয় সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে। সেখানেও নারী আজ নিরাপদ থাকতে পারছে না। ধারাবাহিকভাবে এই নিপীড়নগুলোর কোনও বিচার হচ্ছে না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই নারীর প্রতি সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ বলে আমি মনে করি।

প্রশ্ন: নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে কী ধরনের ব্যবস্থাগ্রহণ করতে পারে সরকার?

হাবিবা জান্নাত: যে সরকার নিজেই নারীবান্ধব নয়, ওই সরকারের কাছে প্রতিকার পাওয়ার আশা স্রেফ অন্ধের কাছে পথের দিশা চাওয়া আর ছাড়া কিছুই নয়। আমি মনে করি, সংগ্রামের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা জনগণের পক্ষের শক্তিই পারে নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। সেই লক্ষ্যেই নারী হিসেবে আমার এবং আমাদের সবার প্রতিদিনের মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। কার্টিসি: বাংলা ট্রিবিউন।

Share.

Leave A Reply