সিম নিবন্ধনে শেষ মুহূর্তের ভোগান্তি

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

শেষ সময়ের বিপুল চাপে গ্রাহক ভোগান্তির মধ্যেই বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়া পৌঁছেছে বেঁধে দেওয়া সময়ের শেষ দিনে; অনিবন্ধিত সিম বন্ধ করা নিয়ে আরও ভোগান্তির আভাস মিলেছে অপারেটরদের কথায়।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের কথায় জানা গেছে, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে যেসব সিমের নিবন্ধন হয়নি, সেগুলো সহজেই চিহ্নিত করা যাবে। তবে সমস্যা হবে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেসব সিম নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখা নিয়ে।

তাদের ভাষ্য, অনিবন্ধিত সিমগুলো বন্ধ করতেই তিন ঘণ্টা লেগে যাবে। তারপর শুরু হবে সেগুলো সচলের পালা। এই জটিলতা শেষ হতে লম্বা সময় লেগে যেতে পারে। অবশ্য সিম পুনঃনিবন্ধনের সময় আরও কিছু বাড়তে পারে বলে ইতোমধ্যে ইঙ্গিত এসেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের কথায়। সার্বিক পরিস্থিতি জানাতে শনিবার সংবাদ সম্মেলনে আসছেন তিনি।

দেশের মানুষের হাতে থাকা ১৩ কোটি মোবাইল সিমের মধ্যে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ৮ কোটি ৩৮ লাখ সিম বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে পুনঃনিবন্ধিত হয়েছে। এর বাইরে আঙুলের ছাপ না মেলাসহ বিভিন্ন কারণে সোয়া এক কোটি গ্রাহক সিম নিবন্ধনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হওয়ার একদিন আগে শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সিম নিবন্ধন কেন্দ্রগুলোতে ছিল গ্রাহকদের ভিড়। পুনঃনিবন্ধন শেষ করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা আর ভোগান্তির কথা বলেছেন তাদের অনেকে।

নিবন্ধনকারীদের পক্ষ থেকে বার বার এনআইডি সার্ভারে ঢুকতে সমস্যা হওয়ার কথা বলা হলেও জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ বলেছে, সমস্যা তাদের নয়, অপারেটরদের সার্ভারে। এর সমাধান না হওয়ায় নিবন্ধন না করেই ফিরে যেতে হয়েছে অনেক গ্রাহককে।

গ্রাহক ভোগান্তি কমাতে নির্বাচন কমিশনের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে অপারেটরদের ডিভাইস বসানোর ‘অনুরোধ’ করা হলেও সবক্ষেত্রে তারা সেটি না করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম।

আগারগাঁওয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন কার্যালয়ে অপারেটর প্রতিনিধি ও এনআইডি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি নিবন্ধনের সমস্যা দ্রুত সারানোর নির্দেশ দেন অপারেটরদের।

গত ১৬ ডিসেম্বর থেকে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম পুনঃনিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সার্ভারে থাকা আঙ্গুলের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে চলছে সিমের এই নিবন্ধন; নতুন সিম কিনতেও যেতে হচ্ছে একই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে।

দিনভর ভোগান্তি

রাজধানীর ফার্মগেইট এলাকায় সিম নিবন্ধন করতে আসা শিপন ‍মুস্তাকিম বলেন, সকালে গ্রামীণফোনের সিম ‍পুনঃনিবন্ধন করতে গেলে প্রথমে তাকে বলা হয় সার্ভার ‘ডাউন’। দীর্ঘসময় অপেক্ষার পর তার সিমের পুনঃনিবন্ধন হয়।

কেবল ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য স্থানেও কাস্টমার কেয়ার সেন্টার ও রিটেইলার পয়েন্টে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ার কথা জানিয়েছেন গ্রাহকরা।

বেলা ১২টার দিকে ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বরে টেলিটকের কাস্টমার কেয়ার সেন্টারে গ্রাহকদের ভিড় দেখা যায়। আগারগাঁওয়ের তালতলায় ঝলক টেলিকম নামের একটি দোকানে ঢোকাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

রিটেইলারের এই দোকানে ছবি আর এনআইডির অনুলিপি জমা দিয়ে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর টেলিটকের সিম নিবন্ধন করতে পেরেছেন বলে জানান হাসান নামের এক গ্রাহক।

এরপর তিনি গ্রামীণফোনের সিম নিবন্ধনের চেষ্টা করেন। কিন্তু মোবাইল নম্বর আর এনআইডির নম্বর দেওয়ার পর নিবন্ধন কোডের জন্য কয়েক বার এসএমএস পাঠানের নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা আর আসেনি। এক পর্যায়ে সিম পুনঃনিবন্ধন না করেই তিনি চলে যান।

বিকাল ৫টায় হাতিরপুলের এক রিটেইলার জানান, সার্ভারে ঢুকতে না পারায় তিনি গ্রাহকদের নিবন্ধন সিম নিবন্ধন করাতে পারছেন না। রাত ৮টার সময়ও একই পরিস্থিতির কথা জানান তিনি।

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবির বলেন, “নিবন্ধনের অতিরিক্ত চাপে এ সমস্যা হতে পারে। অপারেটর ও এনআইডি কর্তৃপক্ষের কারিগরি দল এ সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছে।”

পরস্পরকে দোষারোপ

দিনভর বিভিন্ন স্থানে নিবন্ধন কার্যক্রম ঘুরে দেখে সব পক্ষের অভিযোগ শুনে শুক্রবার বিকালে আগারগাঁওয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন কার্যালয়ে অপারেটর প্রতিনিধি ও এনআইডি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, সিম পুনঃনিবন্ধনে সৃষ্ট জটিলতার জন্য অপারেটর ও এনআইডি কর্তৃপক্ষ সেখানে একে অপরকে দোষারোপ করেন।

অপারেটরদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এনআইডি সার্ভারে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো প্রায় তিন লাখ গ্রাহকের তথ্য প্রক্রিয়াধীন বলে সিগন্যাল পাঠানো হচ্ছে। তারা সঠিকভাবে এনআইডির সহায়তা পাচ্ছেন না।

অন্যদিকে এনআইডি উইংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা সহায়তার অনুরোধ পাননি। পর্যাপ্ত তথ্যও অপারেটররা সরবরাহ করেননি।

বৈঠক শেষে এনআইডি উইংয়ের পরিচালক (অপারেশন্স) সৈয়দ মুহাম্মদ মূসা বলেন, তাদের সার্ভার সচল রয়েছে; সেখানে কোনো সমস্যা নেই।

“অপারেটররা বলেছে, আঙুলের ছাপ যাছাইয়ে তারা যে পরিমাণ রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছে সে পরিমাণ সাড়া পাচ্ছে না। আমরা বলেছি, তা হওয়ার সুযোগ নেই। বরং আমরাই অপারেটরদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ রিকোয়েস্ট পাইনি।”

প্রতি সেকেন্ডে ছয় হাজার সংখ্যক আঙুলের ছাপসহ তথ্য যাছাইয়ের সুযোগ এনআইডির তথ্যভাণ্ডারে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যে কোনো ধরনের কাজ মোকাবেলায় প্রস্তুতি রয়েছি।”

প্রতিমন্ত্রী তারানা বৈঠকে বলেন, তিনি কোনো অজুহাত শুনতে চান না, রাতের মধ্যে অপারেটরদের সার্ভার ঠিক করতে হবে।

উপজেলা নির্বাচন অফিসে অপারেটরদের কোনো সেবা কেন্দ্র না থাকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আঙুলের ছাপ নিয়ে অনেককে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। গ্রাহকরা উপজলা নির্বাচন অফিসে ছুটছেন। তা হালনাগাদ করার পরই সেখানে সেবা দিতে পারলে ভালো হতো। এখন পর্যন্ত নির্বাচন অফিসে কোনো অপারেটর বসেনি।”

অনিবন্ধিত সিমের ভাগ্য

বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম পুনঃনিবন্ধনের জন্য বেঁধে দেওয়া সময় পার হওয়ার পর ৩০ এপ্রিল কয়েক ঘণ্টার জন্য সিম বন্ধের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা বৃহস্পতিবারই জানিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম।

তিনি বলেছিলেন, “১ মে থেকে অধিকাংশ অনিবন্ধিত সিম তিন ঘণ্টা বন্ধ রাখছি এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে তাদের দ্রুত গিয়ে রি-ভেরিফিকেশন করে নেওয়া প্রয়োজন।”

কিন্তু মোবাইল ফোন অপারেটররা বলছেন, তিন ঘণ্টার জন্য সিম বন্ধ ‍ও চালু করার কাজটি করতে তাদের নতুন জটিলতায় পড়তে হতে পারে, কেননা এ কাজটি করার স্বয়ংক্রিয় কোনো পদ্ধতি তৈরি করা নেই।

শীর্ষ এক অপারেটরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে অনিবন্ধিত মোবাইল সিম বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করতে কমপক্ষে তিন ঘন্টা সময় লাগবে। এ সময়ের মধ্যে সিম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

“আবার সিম চালু করতেও তিন ঘণ্ট বা তার বেশি সময় প্রয়োজন হবে। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনিবন্ধিত মোবাইল সিমের গ্রাহককে ছয় ঘণ্টার বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হবে।”

সংবাদ সম্মেলনে আসছেন তারানা

অনিবন্ধিত সিমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবির। শুক্রবার তিনি বলেন, “গ্রাহকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধনে আসছে। প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে শেষ করার জন্য আরও কিছু সময় বাড়ানো উচিৎ। সময় বাড়ালে যারা এখনও নিবন্ধন করতে পারেনি তারাও প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারবেন।”

সময় বাড়ানোর ঘোষণা যে আসতে পারে তেমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে প্রতিমন্ত্রীর কথাতেও।

শুক্রবার বিকালে রাজধানীর ফার্মগেইটে গ্রামীণফোন সেন্টারে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “জনগণের সমস্যা, সুবিধা-অসুবিধার প্রতি আমরা সবসময় শ্রদ্ধাশীল। কালকে আপনাদের জানিয়ে দেব, আমি আরেকটু বুঝি।”

বিটিআরসি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে,সিম পুনঃনিবন্ধনের সার্বিক পরিস্থিতি জানাতে শনিবার বিকাল ৫টায় সংবাদ সম্মেলন হবে। বিটিআরসি কার্যালয়ে ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমই সভাপতিত্ব করবেন। বিটিআরসি চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারাও এ সংবাদ সম্মেলনে  উপস্থিত থাকবেন। কার্টিসি: বিডিনিউজ।

Share.

Leave A Reply