৪ কার্তিক, ১৪২৪|২৭ মুহাররম, ১৪৩৯|১৯ অক্টোবর, ২০১৭|বৃহস্পতিবার, রাত ১২:১০

সুন্দরবনে চলছে দখলের প্রতিযোগিতা

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

নদী আর বনের মিশ্রণে মন মাতানো সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ সুন্দরবন। বাঘ, কুমির, হরিণ, পাখিদের জন্য উপনিবেশ, নদী ও বন-জঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গোধূলিতে ঘরে ফেরা পাখির কাকলি এবং কল কল শব্দে বয়ে যাওয়া নদীর অন্তহীন রূপ এই সুন্দরবনের। বিজ্ঞানীরা বলেন, জোয়ারে লবণ পানি আর ভাটায় মিষ্টি পানির মিশ্রণে এই সুন্দরবনের সৃষ্টি। সুন্দরবন ছিল অসংখ্য দ্বীপ, খাল ও নদী দিয়ে ঘেরা। কিন্তু এই চিত্র এখন আর নেই। ফারাক্কার প্রভাবে অনেক আগে থেকেই এই রূপ হারিয়ে গেছে।

সুন্দরবন বিভাগের মতে, সুন্দরবনের মধ্যে আর আশপাশে ১১৯৪টি খাল বহু আগেই বিলীন হয়ে গেছে। আর সেই হিসাবে কয়েকশ’ নদীও শুকিয়ে গেছে। খাল আর নদী শুকিয়ে যাওয়ায় আগুনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার সক্ষমতা সুন্দরবনের আর নেই। আগে আগুন লাগলে নদী বা খালের তীরে গিয়ে শেষ হতো। কিন্তু এখন খাল আর নদী না থাকায় আগুন সহজে নিভছে না।

তবে ইতিহাস বলে সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে মানুষ। জনবসতির কারণে বছরের পর বছর ছোট হয়ে আসছে সুন্দরবন। সেই সঙ্গে খাল আর নদী না থাকায় মনুষ্য সৃষ্টি আগুন বিস্তৃর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় বন বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে। আর এই সুযোগে ভূমি অফিসের দুর্নীতিগ্রস্তদের সহায়তায় বনভূমির মালিক হয়ে যাচ্ছেন এলাকার প্রভাবশালীরা। অতি সম্প্রতি সুন্দরবনের আশপাশে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বনভূমি দখলের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে একটি প্রভাবশালী মহল। যার ফলশ্রুতিতে বার বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। আর আগুনে পুড়ে যাওয়া স্থানে খুব সহসাই আর নতুন করে জঙ্গল সৃষ্টি হয় না। বর্তমান চিত্র এতটাই ভয়াবহ যে, যাদের বন রক্ষা করার কথা তারাই সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে জবাই করে সব সোনার ডিম একবারে পেতে চাইছে।

Sundarbans 02_The Dhaka Report

গত এক মাসের মধ্যে সুন্দরবনে চারবার আগুন লেগেছে। তা-ও ধানসাগর স্টেশনে। বর্ষা মৌসুমে বনের নিচু অংশ পরিষ্কার করে সেখানে মাছ ধরার লোভে প্রথম দুইবার আগুন লাগানো হয়। তৃতীয়বার আর সর্বশেষ গত বুধবার আগুন লাগানো হয় দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষোভে। এমনটি ধারণা করছে সংশ্লিষ্ট মহল। সরেজমিনে স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এ কথা জানা যায়।

বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৭ মার্চ পূর্ব সুন্দরবনের ধানসাগর স্টেশনের নাংলী এলাকায় সর্বপ্রথম আগুন লাগে। এতে বনের ১ দশমিক ৬৬ একর জায়গা পুড়ে যায়। বন বিভাগের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, জেলেদের অসতর্কতাবশত ফেলা বিড়ি কিংবা সিগারেটের আগুন থেকেই এ আগুন লেগেছে। এরপর একই এলাকায় দ্বিতীয় দফা আগুন লাগে ১৩ এপ্রিল। আগুনে বনের প্রায় সাড়ে ৮ একর জায়গা পুড়ে যায়। ৭ লাখ টাকার পরিবেশ ও বনজ সম্পদের ক্ষতি হয়। বনবিভাগ গঠিত তদন্ত কমিটি আগুন লাগানোর ক্ষেত্রে লোকালয়ের কিছু দুর্বৃত্তদের সম্পৃক্ততা পায়। বনবিভাগ রায়েন্দা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহজাহান হাওলাদার ওরফে শাহজাহান শিকারী ও তার পাঁচ সহযোগীর বিরুদ্ধে ১৬ এপ্রিল আদালতে বন আইনে মামলা করে। মামলার সকল আসামি শরণখোলা উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা।

এ ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় ১৮ এপ্রিল একই এলাকায় আবার আগুন লাগে। এতে বনের আধা একর জায়গার গাছপালা আগুনে পুড়ে যায়। বনবিভাগ ১৯ এপ্রিল শরণখোলা থানায় বন আইনে শাহজাহান হাওলাদার ওরফে শাহজাহান শিকারীসহ পাঁচজনসহ অজ্ঞাত পাঁচজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করে। আগের ঘটনায় মামলা করায় ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে এ দুর্বৃত্তরা আবার আগুন লাগিয়েছে— এমন ধারণা বনবিভাগের।

সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল বুধবার আবার ধানসাগর স্টেশনের তুলাতুলী এলাকায় আগুন লাগে। এবার ৩ একরের মতো জায়গার লতাগুল্ম ও গাছ আগুনে পুড়ে গিয়েছে। বনবিভাগের এবারও ধারণা, একই দুর্বৃত্তরাই এ কাজ করেছে।

এ বিষয়ে রায়েন্দা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহজাহান হাওলাদারের বক্তব্য জানার জন্য তার মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম মিয়া বলেন, ‘আসামিদের আটকের চেষ্টা চলছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো আসামিকে আটক করা সম্ভব হয়নি।’

Sundarbans Fire_The Dhaka Report

গত বৃহস্পতিবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, আগুন এক জায়গায় লাগেনি। প্রায় ৩ একর জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে আগুন জ্বলছে। ফায়ার সাভির্সের কর্মীরা একদিকে পানি দিয়ে আগুন নিভালে আর একদিকে আগুন জ্বলে উঠছে। প্রচণ্ড তাপ আর বাতাসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। আবার বনের যেখানে আগুন লেগেছে সেখান থেকে সুন্দরবনের সংশ্লিষ্ট খালের দূরত্ব কম করে দুই হাজার মিটারের মতো। পানি আনতেও বেগ পেতে হচ্ছে।

বাগেরহাট জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মানিকুজ্জামান বলেন, ‘বাগেরহাট সদর, শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জের তিনটি দল এবং বনবিভাগ, টাইগার টিমের কর্মীরা এবং স্থানীয় জনতা সম্মিলিতভাবে আগুন নিভানোর কাজ করছে। বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন স্থানে আগুন লেগেছে। এতে বোঝা যায়, ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।’

নাশকতাকারীরা এবার কয়েক কিলোমিটারের এলাকাজুড়ে অন্তত ২০টি স্থানে আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় সেখানকার বনে টেকা দায় হয়ে পড়েছে বন্য প্রাণিকুলের। একরের পর একর বনাঞ্চলের সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য।

শুক্রবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে সুন্দরবনে লাগা আগুনে পুড়ে মরে থাকতে দেখা গেছে একটি কচ্ছপ। পোড়া এই কচ্ছপের চিত্র দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে কয়েকজন কর্মী বলেন, আগুনে গুইসাপসহ ছোট-বড় সাপ পুড়ে মারা গেছে, যা তারা দেখেছেন এবং বন কর্মকর্তাদের নির্দেশে দূরে ফেলে দিয়েছেন।

এদিকে সুন্দরবনে আগুন লাগার কারণে শুক্রবার (২৯ এপ্রিল) সকাল থেকে গোটা পূর্ব সুন্দরবন বিভাগজুড়ে জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালদের পাস পারমিট দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বন বিভাগ। তবে বিদেশি পর্যটকরা অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবেন। এর আগে বৃহস্পতিবার শুধুমাত্র চাঁদপাই রেঞ্জে সকল ধরনের পাস পারমিট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর এক দিন পরই গোটা পূর্ব সুন্দরবন বিভাগজুড়ে এই র্নিদেশ দেয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত জেলে বাওয়ালী, মৌয়াল ও সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে রেড অ্যালার্ড জারি করেছে বন বিভাগ। এ দুটি রেঞ্জজুড়ে টহল দিচ্ছে র‌্যাব ও কোস্টগার্ড সদস্যরা।

আগুন লাগার তদন্ত কমিটির প্রধান পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘একই স্টেশনের মধ্যে চারবার আগুন লাগার ঘটনা ইচ্ছাকৃত। কোনোভাবেই এটিকে দুর্ঘটনা বলা যাবে না। দুর্বত্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার কারণে তারা সুন্দরবনকে ধ্বংস করার মতো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আসামিদের আটক করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তারা বার বার একই কাজ করে যাচ্ছে।’

Sundarban_The Dhaka Report

‘স্থানীয়দের সঙ্গে বনবিভাগের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কিনা’— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে নাংলী ক্যাম্পের কর্মকর্তাসহ দুই নৌকাচালককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বনবিভাগ। বরখাস্তকৃতরা হলো— নাংলী ক্যাম্পের কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন হাওলাদার, নৌকাচালক (বোটম্যান) মোবারক হোসেন ও পলাশ মজুমদার।’

শুক্রবার দুপুরে বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মো. জহির উদ্দিন আহমেদ নাশকতার আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলার কারণে ইতোমধ্যে তিনজন বনকর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। যাদের অবহেলায় সুন্দরবনে নাশকতা হচ্ছে সেসব বিভাগীয় কর্মীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সকল বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। সুন্দরবন সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে কোনো দ্বিধা করা হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুন্দরবনে এবার দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনের ধরনটা একটু ভিন্ন। দুর্বৃত্তরা তুলাতুলি এলাকার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ২০টি স্থানে আগুন দিয়েছে, যা আমাদের শনাক্ত করতে সময় লেগেছে। যে কারণে আগুন নেভাতে সময় লাগছে। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। এখনই ফায়ার সার্ভিসকে সুন্দরবন থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে না। তারা বন বিভাগের সঙ্গে আগুন লাগার এলাকায় থেকে পর্যবেক্ষণ করবে।’

তবে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা কতদিন সুন্দরবনে থাকবে, তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি জহির উদ্দিন আহমেদ। কাটির্সি: দ্য রিপোর্ট।

Share.

Leave A Reply