‘বন দখলের জন্যই বারবার সুন্দরবনে আগুন’

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

সুন্দরবনের কয়েক একর বিল এলাকায় অবৈধভাবে মাছ শিকার এবং বনের সম্পদ ভোগ-দখলের জন্য ‘স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরোধের জেরে’ বারবার আগুন লাগানো হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের আওতাধীন বেশ কয়েক একর বনভূমি তুলনামূলকভাবে নিচু। শুষ্ক মৌসুমে ওই বনভূমিতে পানি থাকে না; তবে বর্ষার সময় পানি জমে। সে সময় ওই এলাকায় প্রচুর মাছ পাওয়া যায়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, বর্ষায় ওই এলাকায় কারেন্ট জাল দিয়ে শিং, মাগুর, কইসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ শিকার করে জেলেরা। প্রতি মৌসুমে লাখ লাখ টাকার মাছ ধরা হয়। কয়েকশ জেলে সেখানে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত, যারা বন বিভাগের কাছ থেকে অনুমতি নেয় না। ‘প্রভাবশালী সেই চক্র’ টাকার বিনিময়ে জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ করে দেয়।

তারা বলছেন, বনবিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ‘হাত করে’ ওই চক্রের সদস্যরা বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের এই এলাকায় মাছধরা নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন।

সম্প্রতি ‘তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ায়’ আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টায় বার বার নাশকতা ঘটানো হচ্ছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি স্বীকার না করে বনবিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের কেউ এতে জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ১২ বছরে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জে শুধু ধানসাগর স্টেশনের আওতাধীন এলাকাতেই ১৬ বার আগুনের ঘটনা ঘটেছে। গত ২৭ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিলের মধ্যে চারবার আগুন লেগেছে বনে।

সর্বশেষ গত ২৭ এপ্রিল ধানসাগর স্টেশনের ২৫ নম্বর কম্পার্টমেন্টের তুলাতলায় এলাকায় আগুন লাগার পর বনবিভাগ সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের দুটি রেঞ্জে বনের সব ধরনের সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করে।

আগের কোনো আগুনের ঘটনায় মামলা না হলেও গত ১৩ এপ্রিল, ১৮ এপ্রিল ও ২৭ এপ্রিল অগ্নিকাণ্ডের পর তিনটি মামলা করেছে বনবিভাগ।

Sundarbans Fire_The Dhaka Report

ধানসাগর স্টেশনের শেষ অংশ ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা এলাকাটি ভোলা নদী দিয়ে বন থেকে বিচ্ছিন্ন। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বনসংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দারা হরহামেশা সুন্দরবনে আসা-যাওয়া করছেন। সেখানে গবাদি পশুও চড়াচ্ছেন তারা।

ভোলা নদী পার হয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার বনের ভেতর ঢুকলে দেখা যায় আগুনে পোড়ার ক্ষত। কয়েক একর এলাকায় বনভূমি পুড়ে ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে।

রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সুন্দরবন সহব্যবস্থাপনা কমিটির শরণখোলা রেঞ্জের সভাপতি আসাদুজ্জামান মিলন বলেন, “ধানসাগর স্টেশনের আওতাধীন বনে দশটি নিচু এলাকা (বিল) রয়েছে। ওই বিলগুলোতে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর পরিমাণ মাছ পাওয়া যায়। জেলেদের কাছে ওই বিল খুবই লোভনীয়।”

আসাদুজ্জামান মিলন বলছেন, রায়েন্দা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহজাহান হাওলাদার ওরফে শাহজাহান শিকারিসহ আট থেকে দশজনের একটি প্রভাবশালী চক্র বনের ওই বিল এলাকায় বর্ষা মৌসুমে মাছধরার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে।

“বনবিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হাত করে তারা জেলেদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে মাছ ধরার সুবিধা করে দেয়।”

ভোলা নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ওই নদীর চর এখন বেদখল হয়ে গেছে অভিযোগ করে চরটি উদ্ধার এবং সেখানে পরিকল্পিত বনায়নের পাশাপাশি বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দাবি জানান আসাদুজ্জামান।

বনসংলগ্ন উত্তর রাজাপুর গ্রামের এক জেলে বলেছেন, যারা বনের ওই এলাকায় মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করেন, রায়েন্দা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহজাহান শিকারি তাদের একজন।

বনবিভাগ গত ১৩ এপ্রিল আগুনের ঘটনায় যে ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেছে তাতে শাহজাহান শিকারির নামও রয়েছে।

Sundarbans 02_The Dhaka Report

স্থানীয়রা বলছেন, বনের ওপর আধিপত্য নিয়ে সম্প্রতি স্থানীয় ইউপি সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন খানের সঙ্গে শাহজাহান শিকারির বিরোধ তৈরি হয়। এরপরই সাম্প্রতিক আগুনের ঘটনাগুলো ঘটে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, “সুন্দরবনে আগে কীভাবে আগুন লেগেছে তা আমি জানি না। তবে সর্বশেষ তুলাতলা এলাকার আগুন দেখে আমি নিশ্চিত, উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেখানে আগুন দেওয়া হয়েছে।”

বর্ষা মৌসুমে কয়েকশ জেলে অবৈধভাবে রাতে সুন্দরবনের নিচু এলাকায় জাল পেতে মাছ ধরে জানিয়ে তিনি বলেন, অবৈধভাবে মাছ ধরা বন্ধ করা গেলে সুন্দরবনকে আগুনের হাত থেকেও হয়তো রক্ষা করা যাবে।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে আওয়ামী লীগ নেতা শাহজাহান হাওলাদারের সঙ্গে কয়েক বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মোজাম্মেল হোসেন বলেন, “সুন্দরবনে আগুন দিয়ে যারা ক্ষতি করছে, তারা আমার দলের হলেও ছাড় পাবে না। তাদের ধরে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।”

নাশকতা ঠেকানোর উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, চাঁদপাই রেঞ্জের আওতাধীন এলাকায় বিনা অনুমতিতে সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মানুষ যাতে বনে ঢুকতে না পারে সে জন্য তিনজন করে পাঁচটি দল গঠন করা হয়েছে।

“ওই কমিটির সদস্যরা পর্যায়ক্রমে সুন্দরবনের ওই অংশে দিন-রাত পাহারা দিচ্ছেন। বন কর্মকর্তাদের টহলও বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বনসংলগ্ন বাসিন্দাদের সচেতন করা হচ্ছে।”

প্রভাবশালী ওই চক্রের সঙ্গে বনবিভাগের কর্মীদের যোগসাজশের অভিযোগের বিষয়ে ডিএফও সাইদুল ইসলাম বলেন, “বন বিভাগের কোনো স্টাফ যদি কোনো জেলেকে অবৈধভাবে মাছ ধরার সুবিধা দিয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে ওই স্টাফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তিনটি মামলার মধ্যে দুটি হয়েছে বাগেরহাটের বন আদালতে; অন্যটি শরণখোলা থানায়। তিন মামলারই বাদী ছিলেন ধানসাগর স্টেশনের বন কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ, যাকে মঙ্গলবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

ওই তিন মামলায় ১৭ জনকে আসামি করা হলেও শাহজাহান শিকারি ছাড়া বাকিদের নাম বনবিভাগ প্রকাশ করেনি।

Share.

Leave A Reply