ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেকর্ড

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

সারা দেশে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী এরই মধ্যে প্রথম চার দফার ভোট হয়েছে। বাকি রয়েছে আর দুই ধাপের ভোট।

এখন পর্যন্ত পাওয়া নির্বাচনের ফলাফল ও তথ্য অনুযায়ী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। শুধু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত কেন, অতীতের সব রেকর্ডকে পার করে গেছে এবারের প্রথম চার দফায় নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার ঘটনাও।

সবশেষ তথ্য অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় অন্তত ৮০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আর হাজার ছাড়িয়েছে আহতের সংখ্যা।

ইউপি ভোটে সব সময় বেশি সহিংসতা হয় বলে জানালেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাচন কমিশনার। তাঁর মতে, আগে গণমাধ্যম কম থাকায় হয়তো সব খবর পাওয়া যেত না। এখন গণমাধ্যম শক্তিশালী হওয়ায় যেকোনো ঘটনা খুব দ্রুত প্রকাশ পেয়ে যায়।

১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের সময় যে ইউপি ভোটকে অস্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়েছিল তখন ১০০ জন চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর এবার মাঠ পর্যায় থেকে ইসিতে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এবার ইউপি ভোটে চার হাজার ১২২ ইউপির মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ২১২ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৭১২টি ইউপির মধ্যে ৫৪টিতে, দ্বিতীয় ধাপে ৬৩৯টির মধ্যে ৩৪টিতে, তৃতীয় ধাপে ৬১৫টির ইউনিয়নের মধ্যে ২৯টিতে, চতুর্থ ধাপে ৭০৩টির মধ্যে ৩৫টিতে, পঞ্চম ধাপে ৭২৯টির মধ্যে ৪২ টিতে এবং ষষ্ঠ ধাপে ৭২৪ ইউপির মধ্যে ১৮টি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছেন বা জয় পাবেন বলে ইসির কাছে তথ্য রয়েছে। যদিও ইসির পক্ষ থেকে ষষ্ঠ ধাপে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্যা ঠিক আছে কি না তা আবারো নিশ্চিত করার জন্য মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে আইনে কোনো বাধা নেই। তিনি বলেন, ‘তবে যদি কোথাও অনিয়ম হয় বা কাউকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়ার বিষয়ে কমিশনে অভিযোগ করলে আমরা সেই সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’

প্রার্থীদের সুবিধার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ছাড়াও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান মো. শাহনেওয়াজ।

ইসি সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালের ইউপি ভোটে মাত্র চারজন, ১৯৯৭ সালে ৩৭, ২০০৩ সালে ৩৪ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তা ছাড়া ২০১১ সালের নির্বাচনে ইউপি ভোটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার তথ্য নেই ইসিতে।

এ ছাড়া ইসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৪ জন ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হন। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ২৩৪ পৌরসভার নির্বাচনে ১৪০ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এদের মধ্যে ছয়জন মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ৯৪ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর ৪০ জন ছিলেন। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনেও বেশ কয়েকজন ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছিলেন।

চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রথম ধাপে ১১৯, দ্বিতীয় ধাপে ৭৯, তৃতীয় ধাপে ৮১, চতুর্থ ধাপে ১০৬ ও পঞ্চম ধাপে ১০০ ইউপিসহ পাঁচ শতাধিক ইউপিতে কোনো প্রার্থী দেয়নি বিএনপি।

ইসির একটি সূত্র জানিয়েছে, বিনাভোটে চেয়ারম্যান হওয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অবশ্য রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহার করে এবারের নির্বাচন হওয়াকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কয়েকজন নির্বাচন কর্মকর্তা। তাঁদের মতে দলীয় প্রভাব খাটিয়েই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিনাভোটে প্রার্থীরা জয়ী হচ্ছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আমল মজুমদার বলেন, বিনা ভোটে নির্বাচন হওয়ার যে প্রচলন শুরু হলো তা নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। এটা দলীয়ভাবে প্রথম নির্বাচন তাই কমিশনকে আরো সচেতন হওয়ার দরকার ছিল। কারণ সরকারদলীয় প্রার্থীরাই বিনা ভোটে নির্বাচিত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে অন্য কোনো দল ক্ষমতায় এলে সে দলের প্রার্থীরাও একই কায়দায় জয়ী হতে চাইবে। যা গণতন্ত্রের জন্য সুখকর হবে না।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি তফসিল ঘোষণার মধ্যদিয়ে শুরু হয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। পঞ্চম ধাপে ২৮ মে ৭২৯ ও ষষ্ঠ ধাপে ৪ জুন ৭২৪ ইউপির ভোটের মাধ্যমে এই ভোট শেষ হবে। কার্টিসি: এনটিভি।

Share.

Leave A Reply