৯ চৈত্র, ১৪২৩|২৩ জমাদিউস-সানি, ১৪৩৮|২৩ মার্চ, ২০১৭|বৃহস্পতিবার, দুপুর ১২:১৯

রঙ তুলিতে বাবার জন্য ভালোবাসা

সাদিয়া শারমিন, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

সময়, সম্পর্ক আর সামাজিক মাধ্যম! এই তিন ‘স’ নিয়ে এগিয়ে চলছি আমরা। যুগের হাওয়া যখন ডিজিটাল তখন সময় আর সামাজিক মাধ্যম এই দুইয়ের চাপে সম্পর্কের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়! এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাবা দিবস। সোশ্যাল মিডিয়ায় ফ্লাডিং চলছে বাবাকে নিয়ে লেখা পোস্টের। বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণা, ক্ষণিকের জন্য হলেও নিজের শিকড়ে ফেরা। দিবসকেন্দ্রিক হলেও বিষয়টা ইতিবাচক।

বলছিলাম সময়ের স্রোতে ভাসা দিবস নামক কিছু টুকরো ভালোবাসার কথা! টুকরো কেন? এই জন্য যে মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদ্যতার সম্পর্কে যখন ভাটা চলছে তখন সম্পর্কগুলোকে চাঙ্গা করতে ওই একটা দিনও অনেক কিছু! হোক না দিবসভিত্তিক, হোক না ব্যস্ততার মাঝে কিছু সেলফি তোলা, হোক না শুধু প্রোফাইল পিকের জন্য জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে মুহূর্তের জন্য জড়িয়ে ধরা… হোক না এমন আরও অনেক কিছু; যা মুহূর্তের মধ্যে কিছু মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বইয়ে দিয়ে পারে। পারে কিছুক্ষণের জন্য চোখের পানি কেড়ে নিতে! যাদের পরিবারের কাউকে জড়িয়ে ধরে হৃদ্যতা অনুভবের চেয়ে প্রোফাইল পিকে ‘আই লাভ ইউ মম/ড্যাড’ লিখে লাইকের উদ্দেশ্যই বেশি বাস্তবে তারা সত্যিকারের ভালোবাসার উপলব্ধির বাইরে।

আজ ১৯ জুন, রোববার। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে জুন মাসের তৃতীয় রোববার বাবা দিবস হিসেবে পালিত হয়। ধারণা করা হয়, ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই প্রথম ‘বাবা দিবস’ পালিত হয়। পরে ওয়াশিংটনে সনোরা স্মার্ট ডড নামে এক নারী নিজ উদ্যোগে ১৯ জুন থেকে ‘বাবা দিবস’ পালন শুরু করেন।

শায়িরার মর্মস্পর্শী উত্তর, ‘মিস! শোন; আমি তো কোনদিন বাবা আঁকিনি। জানো না? আমার তো বাবা নেই। মা বলছে, বাবা মরে গেছে। আকাশে থাকে। তুমি না আমাকে একটা বাবা এঁকে দাও। আমি না দেখে দেখে আঁকি।’

দুনিয়ার নানা প্রান্তে বাবা শব্দের সমার্থক অনেক শব্দ থাকলেও এর আসল অর্থ যেন নির্ভরতার বটবৃক্ষ। পরিবারের বন্ধনে মায়ের পাশাপাশি যে মানুষটি বিশেষ ভূমিকা রাখেন তার নাম বাবা! তাই তাকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে কেউ যদি বাবার স্নেহের শিশুদের মধ্যে তার অবস্থান খুঁজতে গিয়ে ভিন্ন রকম কিছু পেয়ে যান তবে সেটা শেয়ার না করলেই নয়।

আর্ট একাডেমি ই মনসিজ প্রতি শনিবার বিষয়ভিত্তিক কিছু ক্লাসের আয়োজন করে। ১৮ জুন প্রতিষ্ঠানটির চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু ছিল ‘আমার বাবা’। উদ্দেশ্য একটাই, ‘বাবা দিবসে বাবার ছবি এঁকে তাঁকে চমকে দেওয়া’। এত ছোট ছোট হাতগুলো কেমন করে তাদের বাবাকে আঁকছে? নিজের মনের মাধুরী মিশিয়েই বাবার ছবি এঁকেছে ই মনসিজের এই ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা।

নিজের হাতে আঁকা বাবার ছবি নিয়ে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা।

নিজের হাতে আঁকা বাবার ছবি নিয়ে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা।

প্লে পড়ুয়া ছোট্ট মেয়ে আফসিন। লম্বা চুলে বাবার মুখটা এতটাই ঢেকেছে যে ছেলে কি মেয়ে বোঝাই মুশকিল। কাছে যেতেই জিজ্ঞেস করছে, ‘দেখ তো, আমার বাবা হইছে না? হ্যাঁ সূচক উত্তর মিলতেই এক দৌড়ে সে উধাও! কোথায় গেল! কোথায় আবার! পাশের রুমে চেয়ারে বসে থাকা বাবাকে তার ছবিটা দেখাতে আর একটু করে চুমু খেতে। এভাবেই গভীর মনোযোগে সবার বাবাকে আঁকা চলছে।

কারও সামনে যেতে কেউ কেউ আবার খাতা লুকিয়ে নিচ্ছে, ‘বাবা আঁকা শেষ হয়নি তো! পরে দেখ’। কেউবা আবার রঙ নিয়ে ব্যস্ত। বাবাকে কোন রঙ্গের ড্রেস পরলে সুন্দর লাগবে। বাবাকে কি পাওয়ারযুক্ত চশমা দিব নাকি সানগ্লাস। উহু! লাল নাহ। বাবা তো লাল একেবারেই পরে না। আচ্ছা বাবাকে একটা ড্রাগনের কার্টুন গেঞ্জি পরাই? কত রকম যে অদ্ভুত প্রশ্ন তাদের! একজন তো আবার ‘আমার বাবার চুলই নেই’ বলে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেল!

হঠাৎ দেখি নার্সারি পড়ুয়া নাহিয়ান কালো রঙয়ে তার বাবার মুখটা ঢাকছে। জিজ্ঞেস করতেই উত্তর দিলো ‘আমার বাবা তো একটু কালো তাই কালো দিচ্ছি! এমন মন্তব্যে উত্তর কি আর মেলে! নজর গেল ওর পাশের ছোট্ট বাচ্চাটার দিকে। সে এখন পর্যন্ত কিছু আঁকেনি! ওর নাম শায়িরা। জিজ্ঞেস করলাম ‘কি বাবা! তুমি আঁকছ না যে!’ এ প্রশ্নের যে উত্তরটা সে দিল, তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না!

শায়িরার মর্মস্পর্শী উত্তর,’মিস! শোন; আমি তো কোনদিন বাবা আঁকিনি। জানো না? আমার তো বাবা নেই। মা বলছে, বাবা মরে গেছে। আকাশে থাকে। তুমি না আমাকে একটা বাবা এঁকে দাও। আমি না দেখে দেখে আঁকি।’

শায়িরার আঁকা বাবার ছবি।

শায়িরার আঁকা বাবার ছবি।

পুরোটাই থমকে আছি। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি নিশ্চুপ! শুধু ওর দিকে তাকিয়েই আছি! কি বলব বা কি বলা উচিত? আমার মাথায় ছিল না! ওকে শুধু বললাম, মামনি, তুমি বাবার ছবি কখনো দেখেছ? বলল হ্যাআআআ…(সুর টেনে)। ‘‘আমরা তাহলে দুজন মিলে ছবির বাবাটাকে আঁকবো। আচ্ছা?” আবার সেই হাসি! বলল-‘‘আআআ…চ্ছা!!”

আমি ঠিক ওর পাশে বসতে পারছিলাম না। দাঁড়াতেই দেখলাম ওর মা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। বুঝতে পারছিলাম না তাকে কি বলা উচিত। শুধু বললাম, আমি সত্যি খুব সরি। উনি বললেন, ও অনেক আগেই মারা গেছে। ওকে (শায়ীরা) দেখেও যেতে পারেনি! থাক। কোন সমস্যা নেই আপু। এ নিয়ে শায়িরা কাদবে না। তবে বাসায় গেলে বাবাকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন করবে। একটাই সমস্যা, আমি ওর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না!

এরপর রুমে চলে আসলাম। রঙ পেন্সিলের একটা বক্স গোছাচ্ছি আর চুপ করে নিজের সঙ্গেই বলে যাচ্ছি; নাহ! আমার কোনো ক্ষমতা নেই শায়িরার বাবাকে তার মেয়ের বাবাকে নিয়ে আঁকা ছবিটা দিয়ে চমকে দেওয়ার! কিংবা তার কন্যা কতটা দরদ দিয়ে তাকে এঁকেছে সেই অনুভূতি পৌঁছে দেওয়ার। যদি দিতে পারতাম তবে বাবাদের নিয়ে আনন্দ দেওয়ার উদ্যোগটা কিছুটা হলেও সার্থক মনে হত।

পরিশেষে শুদ্ধতার দৃষ্টি থেকে সব বাবাদের কাছে ছোট্ট একটা মেসেজ, ওর (আপনার শিশুর) প্রয়োজন শুধু আপনার উপার্জনকৃত কিছু অর্থ নয়। ওই ছোট ছোট হাতের কোনে আপনার স্নেহমাখা মুখটাকে বড় বেশি প্রয়োজন। তাই সম্পর্কগুলোকে আগলে রাখুন।

বিশ্ব বাবা দিবসে দুনিয়ার সব দায়িত্ববান বাবাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট।

আরও পড়তে পারেন:

রাজধানীতে মুদ্রা প্রদর্শনী!

ইসলামে মায়ের সম্মান ও অধিকার

লাখ টাকার বিয়ের শাড়ি এবং…

Share.