বিনা টিকিটে সামরিক জাদুঘর পরিদর্শন!

মুহম্মদ পাঠান সোহাগ, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর রয়েছে এক দীর্ঘ ঐতিহ্যের ইতিহাস। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বাক্ষর রেখেছে এ বাহিনী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের জন্য সুনাম বয়ে নিয়ে এসেছে। সামরিক বাহিনীর এমন নানা সাফল্যের নিদর্শন দেখতে পাবেন রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরে। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এ জাদুঘর সপ্তাহে পাঁচদিন খোলা থাকে।

ঢাকায় বিজয় সরণিতে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারের পশ্চিম পাশে বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরের অবস্থান। এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এই জাদুঘরে দেখা মিলবে সামরিক বাহিনীর নানা গৌরবোজ্জ্বল কর্মকাণ্ড আর শান্তিরক্ষী মিশনে এ বাহিনীর সাফল্যের নানা নিদর্শন। রয়েছে নানা সমরাস্ত্রের সংগ্রহ। দ্বিতল ভবনের সামনে সুবিশাল মাঠের চারপাশে সজ্জিত এ সামরিক জাদুঘর।

১৯৮৭ সালে প্রথম সামরিক জাদুঘরটি মিরপুর সেনানিবাসে প্রতিষ্ঠিত হয়। সামরিক জাদুঘরের গুরত্ব এবং দর্শকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ১৯৯৯ সালে জাদুঘরটি স্থায়ীভাবে বিজয় সরণিতে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের ব্যাজ, পোশাক, অস্ত্র, গোলাবার, ক্যানন, এন্টি এয়ারক্রাফট গান এবং যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন যানবাহন এখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

সামরিক জাদুঘরের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে ট্যাংক পি টি-৭৬। রাশিয়ার তৈরি এই ট্যাংকটি পানিতেও ভেসে চলতে সক্ষম। এই ট্যাংকটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকা থেকে বাংলাদেশ বাহিনী কর্তৃক পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর নিকট হতে উদ্ধার করা হয়। সামরিক জাদুঘরের মাঠের উত্তর ও পূর্ব দিক দিয়ে সুসজ্জিতভাবে সাজানো রয়েছে আরও ১৬টি ট্যাংক ও কামান। এগুলো খোলা আকাশের নীচে রাখা আছে। মাঠে পূর্ব প্রান্ত দিয়ে সারিবদ্ধভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত ১০৫/৫২ সি এম ক্রুপ গান, ১৯৭৩ সালে মিসর কর্তৃক আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ব্যবহৃত ব্যারেল ১০০ মি. মি. ট্যাংক গান, অষ্টাদশ শতাব্দীর ছয়টি ছোট-বড় কামান। মাঠের উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রদর্শিত হচ্ছে মোটরলঞ্চ ‘এম এল সূর্যোদয়’। এটি জাপান সরকার অনুদান হিসেবে দিয়েছিল।

মূল ভবনের দোতলায় রয়েছে ৮টি গ্যালারি। প্রথম গ্যালারিতে হাত-কুঠার, তীর, ধনুকসহ পুরনো যুগের অস্ত্রশস্ত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। দ্বিতীয় গ্যালারিতে রয়েছে ডিবিবিএল গান, এসবিবিএল গান, বিশেষ ব্যক্তিবর্গের ব্যবহৃত হাতিয়ারসহ যুদ্ধাস্ত্র। তৃতীয় গ্যালারিতে এলএমজি, এসএমজিসহ মাঝারি অস্ত্র। চতুর্থ গ্যালারিতে রয়েছে মর্টার, স্প্যালো, এইচএমজিসহ ভারী অস্ত্র।

পঞ্চম গ্যালারিতে সর্বসাধারণের প্রদর্শিত হচ্ছে সশস্ত্র বাহিনীর শীত ও গ্রীষ্মকালীন পোশাক পরিচ্ছদ, র‌্যাঙ্ক, ব্যাজ ও ফিতা। ষষ্ঠ গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল, সেক্টর কমান্ডারদের পোর্ট্রেট, কিছু ব্যবহার্য সামগ্রী। সপ্তম গ্যালারির নাম দেয়া হয়েছে ‘বিজয় গ্যালারি’। এতে সশস্ত্র বাহিনীর যেসব ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছেন তাদের পোর্ট্রেট ও সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অষ্টম গ্যালারিতে রয়েছে সাবেক সব সেনাপ্রধানের তৈলচিত্র, বীরশ্রেষ্ঠ ও বীরপ্রতীকদের নামের তালিকা।

ভবনের নিচতলায় প্রদর্শিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী যে গাড়িটি নিয়ে বিভিন্ন যুদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করেন সেই জিপ গাড়িটি। এর পাশাপাশি রয়েছে গোলন্দাজ বাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত ১৪.৫ মি. মি. কোয়াড বিমান বিধ্বংসী কামান, ১২০ মি. মি. মর্টার ব্রান্ডেট এ এম ৫০, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর ব্যবহৃত ৬ পাউন্ডার ট্যাংক বিধ্বংসী কামান, ১০৬ মি. মি. রিকয়েললেস রাইফেল। আরও আছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে উদ্ধারকৃত স্টাফ কার মার্সিডিজ বেঞ্জ ও সিলিন্ডার ২০০০ সি সি।

সামরিক জাদুঘরের  বিশেষ আকর্ষণ ‘মুজিব কর্নার’। এটি মূল ভবনের নিচতলায় পশ্চিম পাশের কক্ষে সম্প্রতি স্থাপন করা হয়েছে। এখানে স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত ৩০টি অঙ্কিত আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে।

বিনা টিকেটে সামরিক জাদুঘরে প্রবেশ সম্পর্কে নয়ন আহমেদ বলেন, মাঝে মধ্যেই বন্ধুরা মিলে এখানে আসি। পরিবেশ ভালো, মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখি, জানার অনেক বিষয় আছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিডি, বই কেনা যায়। প্রবেশ ফি থাকলে এভাবে আসা হতো না।

এছাড়া ‘ইতিহাস দর্পণ’ নামে একটি আইটি কর্নার আছে এ জাদুঘরে। এখানে দুটি রুমের মধ্যে একটি ১১টি আকর্ষণীয় টার্চ স্কিন কম্পিউটারের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত চলচ্চিত্র এবং দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে করণীয় এবং অন্যটিতে বড় স্ক্রিনে ‘১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ নামের এক ঘন্টা ৫০ মিনিটের চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

সামরিক জাদুঘরের ‘ইতিহাস দর্পণ’ নামের আইটি কর্নারের সহকারী স্টোর কিপার মো. আসাদুল্লা বলেন, প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ জন দর্শনার্থী এ জাদুঘর পরিদর্শন করেন। গ্রীষ্মকালে কম থাকলেও শীতকালে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি থাকে। এ সময় বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা পরিদর্শনে আসে। তবে অন্যান্য জাদুঘরের মতো প্রবেশ মূল্য থাকলে সবার মধ্যে একটা আকর্ষণ থাকত।

এ জাদুঘর সপ্তাহে পাঁচ দিন খোলা থাকে। দিনগুলো হচ্ছে শনি, রবি, সোম, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার। গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা  ৬টা পর্যন্ত আর শীতকালে ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত। বুধবার বন্ধ। শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত খোলা। এছাড়া অন্যান্য সরকারি ছুটির বন্ধ থাকে

Share.

Leave A Reply