কেন আমি হিজাব পরা শুরু করলাম?

তাসনিয়া রশিদ: যখন থেকে আমি হিজাব পরা শুরু করি অসংখ্য মানুষ আমাকে প্রশ্ন করেছেন, কেন? কোন কারণে হঠাৎ আপনি মাথা ঢাকা শুরু করেছেন? আমার জবাব ছিল সব সময় একই: আমি বরং ভেবেছিলাম আপনারা জিজ্ঞেস করবেন কোন কারণে সব সময় সঠিক জানা সত্ত্বেও এটা করতে আমার এতো দীর্ঘ সময় লেগেছে।’

কয়েক সপ্তাহ আগে, রমজান মাসে বাংলাদেশে এক বেদনাদায়ক ও নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমরা মূল্যবান ২০টি জীবন হারিয়েছি কয়েকজন নিষ্ঠুর জঙ্গির হাতে। এ ঘটনা জাতিকে নাড়া দিয়েছে ও শোকাহত করেছে। পুরো জাতির মতো আমাকেও। ঘটনা হলো, হামলাস্থল হলি আর্টিজান বেকারিতে আমি নিয়মিত যেতাম। হামলায় আমার নিজের অবস্থান নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি এবং বুঝতে পারি আমার মৃত্যু শুধু অবশ্যম্ভাবী ছিল না, অনিবার্যও ছিল।

একজন মুসলমান হিসেবে আমি পরকালে বিশ্বাসী। আমি মনে করি আমার কৃতকর্মের জবাব দিতে হবে। তাই যখন আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করবেন কেন আমি তাঁর হিজাব পরার নির্দেশ অমান্য করেছি, তখন কি জবাব দেব আমি?

সত্য হলো, শেষ পর্যন্ত সাহস করে হিজাব পরা শুরু করার কয়েক বছর আগ থেকেই তা পরার চিন্তা করছিলাম আমি। এক্ষেত্রে আমার প্রধান বাধা হিজাব পরাকে সমাজে পিছিয়ে পড়া এবং ইসলামি জঙ্গিবাদে আচ্ছন্ন করে এমন চর্চা হিসেবে দেখার মনোভাব। যা ইসলামের শত্রুরা সব সময় লালন করে থাকে।

কিন্তু আল্লাহ’র নির্দেশের চাইতে সমাজের এসব মনোভাবের গুরুত্ব কতটুকু? তাদের এসব অর্থহীন ইচ্ছা পূরণ আমাকে আল্লাহ’র ক্রোধ ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পারবে না। দুর্ভাগ্যক্রমে, আমি এমন এক সমাজে বেড়ে উঠেছি যেখানে আমার স্পষ্ট অনুধাবন বুঝতে অনেক দেরি হয়েছে।

পশ্চিমা দেশে বেড়ে ওঠায় আমি হিজাবের বিরুদ্ধে অসংখ্য যুক্তির কথা শুনেছি। এর মধ্যে রয়েছে, হিজাব পরলে কীভাবে নারীরা নিপীড়িত হয়, নারীদের লজ্জা হয় এবং তাদের সামর্থ্য কমে যায়। হাইস্কুলে এক শিক্ষককে পেয়েছি যিনি বলেছেন যে কোরআনে হিজাব পরার কথা উল্লেখ নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, কোরআনের কয়েকটি আয়াত পড়া থাকায় আমি তা খারিজ করে দিতে পেরেছি (২৪:৩০-৩১; ৩৩:৫৯; ৩৩:৩২-৩৩)।

Hijab_The Dhaka Report

আমি এটাও প্রত্যক্ষ করেছি যে, ‘স্বাধীনতার’ চর্চা করতে গিয়ে কিভাবে নারীরা সৌন্দর্যের সামাজিক মানদণ্ডের গোলাম হয়ে পড়েন। তাদের লড়াই যেন মিডিয়ার অঙ্কিত শরীর ও চেহারা পাওয়ার জন্য। কেউ নিজের জন্য আকুলভাবে চায়; অন্যরা ছুরির নিচে নিজেকে সঁপে দেয়। কেউ কেউ সর্বশেষ ফ্যাশন ট্রেন্ডের সঙ্গে আপডেট থাকার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। অন্যরা সমাজের প্রত্যাশা এবং ঝোঁক বা বাতিক মেটানোর অক্ষমতায় দৃশ্যত হতাশ হয়ে পড়েন।

যেভাবে বেড়ে উঠেছি, তাতে আমি অনুধাবন করতে পেরেছি যে, এই কপট স্বাধীনতা পরিবারের পবিত্র ভিত্তির ব্যয় থেকে এসেছে। সঙ্গীর স্বাধীনতায় তারা সন্তুষ্ট হওয়ায় ঘর ও পরিবারের প্রতি পুরুষ ও নারীর নিস্পৃহতা, দম্পতিদের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ, পরিবারিক দ্বন্দ্ব, অভিভাবকহীন অবৈধ সন্তান, সঞ্চিত মানসিক অসুস্থতা, হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি, অপরাধ, আত্মহনন, অবিবাহিত নারী ও পুরুষের সংখ্যার তীব্রতা বৃদ্ধি, বিয়ের বয়সে বিলম্ব করা, বিভিন্ন নৈতিক ও যৌন বিকৃতির প্রতি তরুণদের প্রবৃত্ত হওয়া এবং বিবাহ বিচ্ছেদের পরিসংখ্যানের উত্থান ঘটে । অবশ্যম্ভাবীভাবে নিঃসঙ্গতায় ভোগা নারী ও পুরুষের অত্যধিক প্রাচুর্য লক্ষ্যণীয় হয়।

পশ্চিমের স্বাধীনতার সমালোচনা করা এবং ইসলামের নিপীড়নকে উন্নীত করার আমি কে? কি ধরনের সমাজে আমরা বসবাস করি! যদি নারীরা পথভ্রষ্টতা ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে হিজাবের বিধিনিষেধ গ্রহণ করেন?  এটা কিভাবে সম্ভব যে, আমরা হিজাব পরাকে কাঙ্ক্ষিত মনে করবো; যেখানে পুরুষরা অন্য নারীর সৌন্দর্যের জন্য নিজের স্ত্রীর প্রতি উদাসীনতায় পর্যবসিত হন! ফলে এসব ব্যক্তিরা কি তাদের পরিবারে অজুহাত বা ঝগড়া-বিবাদের একটা রণক্ষেত্র চালু করছেন না? আমি একটি ভঙ্গুর বাড়ি থেকে এসেছি। পরিবারের ভিত্তিকে মজবুত করতে হিজাবের প্রতি আমার নিখাদ আস্থা রয়েছে। বিবাহ বিচ্ছেদ, একাকীত্ব, হতাশা এবং অভিভাবকহীন শিশুদের পরিমাণ হ্রাসকল্পেও এটা ইতিবাচক।

ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে: ০১. অহংকার চুরমার করা কঠিন। ০২. শান্তি ও সমৃদ্ধি বিনয় বা নম্রতা ছাড়া কখনোই সাধিত হতে পারে না। যে সমাজের মানুষ নম্রতার চর্চা করেন সেখানে সবসময় নারীদের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকবে। এ কারণেই আমি পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনার ভয়কে অতিক্রম করাকেই বেছে নিয়েছি। একইসঙ্গে বলিউড মানসিকতাকেও। আমি এটাকে বেছে নিয়েছি আমার স্রষ্টাকে মান্য করার জন্য। আমার কল্যাণের জন্যই তিনি আমাকে মাথা ও শরীর আবৃত করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, সিস্টেমের গোলাম হওয়ার চেয়ে আমি বরং একজন ট্রেন্ডসেটারে (একটা ট্রেন্ড বা প্রবণতাকে পরিচালনা করা) পরিণত হবো।

আমি চেষ্টা করবো একজন পেশাদার এবং সমাজের একজন বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে আমি আমার ক্ষমতা বা সম্ভাবনা পূরণে আপ্রাণ চেষ্টা করবো। আমি শুধু আল্লাহ’র কাছেই জবাব দেবো। কার্টিসি: বাংলা ট্রিবিউন।

Share.

Leave A Reply