তুরস্ক কেন টার্গেট?

মাহমুত ওভার:

আমরা একবিংশ শতাব্দীর প্রথম বৈশ্বিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছি, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তুরস্ক। ১৫ জুলাইয়ের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ছিল দেশটিকে একটি গৃহযুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতার দিকে টেনে নেয়া। আসল কথা হলো, যারা বৈশ্বিক প্রক্রিয়ার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিল তারা এত দ্রুত তুরস্কের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ আশা করেননি। এর কারণ নিঃসন্দেহে তুরস্কের উন্নতি এবং প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের নতুন রাজনীতির ফলে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর বিরক্তি অনুভব করা। বিশেষ করে ২০১৩ সালের পর এই অবস্থান বৈশ্বিক শক্তিগুলোকে এতটাই বিরক্ত করেছে যে, তারা ভেতর ও বাইরে দু’দিক থেকেই আঘাত হানতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত অকল্পনীয় মাত্রায় পৌঁছে।

কেউ কেউ বলতে পারেন, তুরস্ক যখন বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে, তখন বৈশ্বিক শক্তিগুলো কেন দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে? কিন্তু এটাও সত্য যে, তুরস্কের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং মুসলিম বিশ্বের ওপর এর সম্ভাবনাময় প্রভাবের কথাও সবার ভালোভাবে জানা। কেউ এই সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখছে না।

সাত বছর আগে লেখা একটি বইয়ের কথা এখানে উল্লেখ করা ভালো হবে। বইয়ের লেখক জর্জ ফ্রেডম্যান, যিনি স্ট্রার্টফর-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং এই প্রতিষ্ঠানটি সিআইএর ছায়া সংগঠন হিসেবে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানটি ১৫ জুলাই রাতে এরদোগানের পরিকল্পনা কী হবে তা আগেভাগে প্রকাশ করে। ফ্রেডম্যানের বইয়ের নাম ‘দ্য নেক্সট হানড্রেড ইয়ার্স: এ ফোরকাস্ট ফর দ্য টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি।’

২০০৯ সালে প্রকাশিত বইটিতে তুরস্কের অবস্থানও পর্যালোচনা করা হয়েছে। তাতে জোর দিয়ে বলা হয়, ২০২০ সালের দিকে ককেসাস অঞ্চলে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমস্যা দেখা দেবে। ফ্রেডম্যান যুক্তি দেখান, এ সময় রাশিয়া একটি পতনের সম্মুখীন হবে এবং তুরস্ক এই অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হবে। এই অবস্থা তত দিন চলবে যত দিন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে সমর্থন দিয়ে যাবে।

তাহলে, এর পর কী ঘটবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে যে, বর্তমান সঙ্ঘাতটি আগেভাগেই ঘটে গেছে। বইটিতে লেখা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক আধিপত্যবাদকে ভয় পায়। যুক্তরাষ্ট্র একই সাথে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শত্রুদের মুখোমুখি হতে চায় না এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর তুরস্ককেও একই দৃষ্টিতে দেখা শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের সম্পর্ক ক্রমেই বিরোধপূর্ণ হয়ে উঠবে। ৩০-এর দশকে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে তার আঞ্চলিক স্বার্থের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করবে। এর ফলে তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে যুক্তরাষ্ট্র। এই দেশটি ক্রমেই ইসলামিক রাষ্ট্র হয়ে উঠবে। এই সময়ের পর থেকে তুর্কি শক্তির বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক রাজনীতি গ্রহণ করবে যুক্তরাষ্ট্র।’

এই অভিমত শুধু রিপোর্ট বা বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চল্লিশ বছর আগে বৈশ্বিক শক্তি যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল; তার মধ্য দিয়েই গুলেনিস্ট টেরর অর্গানাইজেশন (এফইটিও) এর মাধ্যমে একটি সহিংস ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালানো হয়। তবে লাখ লাখ মানুষ তাদের বুক দিয়ে বুলেট ঠেকিয়ে দিয়েছে, ঠেকিয়ে দিয়েছে বোমা ও ট্যাংক। ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন হতে দেয়নি তারা।

এখন প্রশ্ন হলোÑ আগামীতে কী হবে? বৈশ্বিক শক্তি কি তার দখলদারিত্বের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবে, নাকি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা কোনো সমঝোতামূলক পথে আসবে। প্রথমটি হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। তাই এরদোগানও চান জনগণ গণতন্ত্র পাহারা দিয়ে রাখুক। বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন বিপদ এখনো কাটেনি।

উদাহরণস্বরূপ, সাবেক এফবিআই ট্রান্সলেটর সেবিল এডমন্ডস আরেকটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সম্ভাবনার কথা বলেন। এই প্রচেষ্টা হবে একেবারে ভিত্তিহীন একটি দাবির ওপর। আর দাবিটি হলো- ইনসারলিক অ্যায়ার বেজ এবং অন্যান্য ন্যাটো ঘাঁটিতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্রগুলো ‘দায়েশ’ (ইসলামিক স্টেটের আরেক নাম)-এর কাছে চলে যাবে। অনেকে এটাও বলে যে, অর্থনীতির মাধ্যমেও অভ্যুত্থান ঘটানো সম্ভব। যাই হোক, তারা যে পরিকল্পনাই করুক না কেন; তাদের তুরস্কের জনগণের মুখোমুখি হতে হবে। এই সেই জনগণ যারা ১৫ জুলাই জন্ম দিয়েছে গণতন্ত্রের এক রূপকল্পের।

কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে; তুরস্ক ভিন্ন রকম একটি মিশন কাঁধে নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এটা শুধু তার নিজের ভবিষ্যতের জন্যই নয়, এটা বিশ্বব্যাপী ‘ন্যায়বিচার ও ‘সহানুভূতি’র কণ্ঠস্বর উচ্চকিত করার’ প্রচেষ্টারও একটি অংশ। তাই তারা তুরস্ককে একদণ্ড শান্তিতে থাকতে দেবে না। এ কথা মনে রেখেই তুর্কিদেরকে ম্যারাথন দৌড়বিদের মতোই প্রস্তুতি নিতে হবে ভবিষ্যতের জন্য।

ইস্তাম্বুলের ডেইলি সাবাহ থেকে অনুবাদ: মাসুম বিল্লাহ।

বিভাগ:কলাম
Share.

Leave A Reply