১৪ চৈত্র, ১৪২৩|২৮ জমাদিউস-সানি, ১৪৩৮|২৮ মার্চ, ২০১৭|মঙ্গলবার, বিকাল ৫:৫৭

যে কারণে বাংলাদেশের জন্য বিষফোঁড়া রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম। বিশিষ্ট খনিজ সম্পদ বিশেষজ্ঞ। অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে। খনিজ সম্পদ, জ্বালানি, পরিবেশসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন করছেন দীর্ঘদিন থেকে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন গণমাধ্যমের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু। আজ থাকছে শেষ পর্ব।

প্রশ্ন: সরকার বলছে, সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা বনের কোনো ক্ষতি করবে না। আপনার বিশ্লেষণ কি?

বদরুল ইমাম: পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকান। তারা যে কোনো বন থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে এমন প্রকল্প করে। আমাদের সরকার বলছে, সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। ভালো কথা। কিন্তু ভারতের যে অংশে সুন্দরবন তা থেকে ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে এমন প্রকল্প করতে পারে কিনা, দেখাক। কখনই করতে পারবে না। কারণ তাদের বন বিভাগের আইনই আছে যে, সর্বনিম্ন ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে এমন প্রকল্প করতে পারবে না।

ভারত তো কয়লার ওপর অনেক অভিজ্ঞ। অভিজ্ঞতা থেকেই তারা আইন করেছে। আমরা কেন সে আইন নেব না। এই প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছে নেই। আমি ভারতীয় দলকেও এই প্রশ্ন করেছি। বলেছি, আপনারা পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে এমন একটি প্রকল্প করুন তো দেখি? কোনো জবাব দিতে পারেননি।

প্রশ্ন: তাহলে কি সরকারের ওপর যথাযথ চাপ তৈরি করা গেল না?

বদরুল ইমাম: এটি বোধের ব্যাপার। আমরা যারা এসব নিয়ে কথা বলি, তারা সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী। আমরা সরকারের ভালো কাজকে অবশ্যই স্বাগত জানিয়েছি। অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই সরকারের কোনো বিকল্প নেই। আমরা কখনই চাই না সরকার বিপদে পড়ুক।

সরকার পক্ষের লোকজন বলছে, পশুর নদীর পানি কোনোভাবেই দূষণ হবে না। বলছে, কোনো ছাই উড়বে না। সালফার উড়বে না। এভাবেও মানুষকে বোঝানো যায়!। দুনিয়ায় এমন কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হয়নি যেখানে দূষণ হয় না। প্রযুক্তির কারণে দূষণ কিছুটা কমতে পারে মাত্র। কিন্তু দূষণ হবে না এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না।

সুতরাং আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে এই প্রজেক্ট করলে অবশ্যই সুন্দরবনের ওপর প্রভাব পড়বে। কারণ সুন্দরবন হচ্ছে জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা। সরকার কেন বাস্তবতা বোঝে না, তা আমাকে অবাক করেছে। আমি জানি, সরকারের অনেকেই বিষয়টি উপলব্ধি করার পরেও তারা প্রকাশ করতে পারছে না।

প্রশ্ন: তাহলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র তো সরকারের জন্যও বিশেষ বার্তা?

বদরুল ইমাম: অবশ্যই মনে করি আগামী ১০ বছরের মধ্যেই এই প্রকল্প থেকে ফিরে আসতে হবে। তখন হয়তো সুন্দরবনের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি নিশ্চিত, যারা সরকারকে বুদ্ধি দিচ্ছে, তারাই একদিন আমাদের বলবে, কেন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধে সরকারের ওপর আরো চাপ প্রয়োগ করিনি।

প্রশ্ন: সরকার তো আপনাদের সমালোচনাকে উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা মনে করে?

বদরুল ইমাম: ১৩২০ মেগাওয়াটের আরো চারটি প্রকল্প হচ্ছে। আমরা কোনো সমালোচনা করছি না। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র যে কোনো জায়গায় সরিয়ে নেয়া হোক, আমি নিজে এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করব। সরকারের উন্নয়নে বাধা দেয়া আমাদের কারোই উদ্দেশ্য নয়। সরকার ভালো করুক আমরা মনেপ্রাণে চাই। কিন্তু সুন্দরবন ধ্বংস করে কেন?

প্রশ্ন: কেন সুন্দরবনে? আপনার কাছে কি মনে হয়?

বদরুল ইমাম: এই প্রশ্ন অনেকের কাছেই দানা বেঁধেছে। তবে আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, সুন্দরবন কোনো এক শক্তির রোষানলে পড়েছে। কেন যেন মনে হয়, কোনো একটি পক্ষ হয়তো ষড়যন্ত্র করছে, বাংলাদেশে সুন্দরবন না থাকুক। এমন একটি প্রাকৃতিক সম্পদ বাংলাদেশে থাকায় অনেকের কাছেই হয়তো ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রশ্ন: জনআন্দোলনের কারণে ফুলবাড়ীতে সরকার পিছু হঠলো। এখানে আন্দোলন জমছে না কেন?

বদরুল ইমাম: ফুলবাড়ী আর রামপালের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ফুলবাড়ী ঘনবসতি এলাকা। ফুলবাড়ীর ক্ষতিটা একেবারে চোখের সামনে চলে এসেছিল। অনেককে উচ্ছেদ করতে হচ্ছিল। রামপালে তা নয়। এখানে কৌশলে আগে থেকেই উচ্ছেদ করা হয়েছে।

অপরদিকে ঘটনাচক্রে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া উভয়ই ফুলবাড়ী আন্দোলন মেনে নিয়েছেন এবং তারা জনগণের আন্দোলনে সহযোগিতা করেছিলেন। বিরোধী দলে থেকে দুই নেত্রীই ফুলবাড়ী আন্দোলনকে সাপোর্ট করেছেন।

প্রশ্ন: অমন আন্দোলনের সম্ভাবনা এখানেও ছিল। ফুলবাড়ীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেত…

বদরুল ইমাম: যখনই খনন করা হবে তখনই ফুলবাড়ীর ক্ষতিটা সামনে চলে আসবে। কিন্তু রামপালে তা নয়। রামপালের ক্ষতিটা হয়তো ১০ বছর পরে দেখা যাবে। পার্থক্যটা এখানেই। ফুলবাড়ীর ক্ষতিটা হচ্ছে প্রত্যক্ষ এবং রামপালের ক্ষতি হচ্ছে পরোক্ষ। ফুলবাড়ীর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সরকার আগে থেকেই রামপাল থেকে লোকজনকে উচ্ছেদ করেছে। রামপালে হয়তো এখন একজন মানুষও মরবে না, কিন্তু সুন্দরবন মরবে। আর সুন্দরবন মরলে অনেক কিছুই আর বাঁচানো যাবে না।

প্রশ্ন: এর মধ্য দিয়ে তো ভারতবিরোধী মনোভাবও তীব্র হচ্ছে?

বদরুল ইমাম: তা হতে পারে। ভারতে এমন প্রকল্প করতে পারছে না। অথচ এখানে তারা শত বাধা উপেক্ষা করেই করছে। ভারত তার দেশে এমন প্রকল্প করুক না দেখি। আমরা তাদের কাছ থেকে একই দামে বিদ্যুৎ কিনব। কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু তারা এটি করবে না। স্বার্থ উভয়ের-ই।

প্রশ্ন: এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রামপালের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী বলবেন?

বদরুল ইমাম: সরকার লাঠিপেটা শুরু করে দিয়েছে। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ একবার পা ভেঙেছেন। আরেকবার হয়তো ভাঙবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার এই প্রকল্প করতে যাবে। চুক্তির আগ মুহূর্তেও মনে করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত সরকারের শুভবুদ্ধি‌র উদয় হবে। কিন্তু চুক্তির পর আমি হতাশ হয়েছি। চুক্তি যেভাবে হওয়ার সেভাবেই হয়েছে। খুব অবাক হয়েছি। কোনোভাবেই মানতে পারছি না।

প্রশ্ন: এই নিরাশা কী নিজে থেকেই, নাকি আন্দোলনের সামগ্রিক রূপ আমলে নিয়েই?

বদরুল ইমাম: আন্দোলন আরো হবে। কিন্তু সরকার এই ক্ষেত্রে আরো অনড় হবে। ফুলবাড়ীতে একটি কোম্পানি এসেছিল। আর রামপালে একটি বড় শক্তি এসেছে এবং সরকার সেই শক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। সমস্যাটা এখানেই।

চুক্তির এক সপ্তাহ আগেও সরকার আমাদের বলেছিল, বিষয়টি আমরা দেখছি। অথচ যা হবার তাই হলো। নিরাশা মূলত এখান থেকেই।

শেষ পর্যন্ত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জন্য বিষফোঁড়া হবেই, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। মাত্র ১৩০০ মেগাওয়াটের জন্য এমন বিষফোঁড়া কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। কার্টিসি: জাগো নিউজ।

Share.

Leave A Reply