যুক্তরাষ্ট্র কি পশ্চিম এশিয়া থেকে পিছু হটছে?

স্ট্যানলি জনি:

২০০৯ সালের ৪ জুন কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন হাজার শ্রোতার সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘দীর্ঘ দিনের অবিশ্বাস’ দূর করে ইজরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ায় তার মনোযোগ নিবদ্ধ করার মাধ্যমে ইসলামি বিশ্বে ‘নতুন শুভসূচনার’ প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

নীতিগত কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপনের পরিকল্পনা তার না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট তার পূর্বসূরির ভুলভ্রান্তি সংশোধন করে পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবেন বলে তখন ব্যাপক আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। ওবামার হোয়াইট হাউজ ত্যাগ করার মাত্র কয়েক মাস বাকি রয়েছে। তিনি কি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন এনেছেন?

তার সমালোচক ও সমর্থক উভয়ের মধ্যে যারা মনে করেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনি মৌলিক পরিবর্তন এনেছেনÑ বিভিন্ন কারণে তারা এটা মনে করেন। যে দেশের নেতারা এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বড় শয়তান’ বলে আখ্যায়িত করে থাকে, সেই ইরানের সাথে ওবামা শান্তি স্থাপন করেছেন। তার প্রশাসন ইজরাইলি সমালোচনা এবং ইরানের সাথে চুক্তির ব্যাপারে সৌদি আরবের উদ্বেগ সত্ত্বেও এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ব্যাপারে ঐতিহ্যগত সমীকরণের বাইরে গিয়ে কাজ করেছে। তিনি ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছেন এবং তার দেশ ও আঞ্চলিক মিত্রদের পক্ষ থেকে ব্যাপক চাপ সত্ত্বেও সিরিয়া সরকারের ওপর হামলা চালাতে অস্বীকৃতি জানালেন।

এসব কারণে কেউ কেউ ওবামাকে শান্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একজন আদর্শিক উদারমনা বলে আখ্যায়িত করতে প্ররোচিত হন। অন্যদের মতে, তার পর্যবেক্ষণের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়া থেকে হটে যাচ্ছে।

ইরাক ও ইরান

জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের সাথে তুলনা করলে ওবামার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বুশ ছিলেন অত্যধিক আগ্রাসী খেলোয়াড়। তিনি তেমন কৌশলী ছিলেন না। তাকে বড় ধরনের কোনো আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়নি। অপর দিকে প্রেসিডেন্ট ওবামা উত্তরাধিকার সূত্রে ইরাক যুদ্ধ, ইরানের সাথে বিপজ্জনক অচলাবস্থা এবং ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদের হুমকি লাভ করেছেন। এটা ভুললে চলবে না, পরবর্তীকালে তিনি আরব দেশগুলোতে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও সঙ্কটজনক পরিস্থিতি দেখতে পান। পররাষ্ট্রনীতির বৃহত্তর ছক অনুযায়ী ওবামা প্রশাসনকে ক্রমবর্ধমান উচ্চাভিলাষী চীন এবং পুনরুত্থানশীল ও প্রতিশোধপরায়ণ রাশিয়ার মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সুতরাং তার জন্য একটি নতুন নীতি বা কৌশল প্রণয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

উদাহরণস্বরূপ ইরাকের বিষয়টি ধরা যাক। প্রেসিডেন্ট বুশের আমলেই যুক্তরাষ্ট্রে ইরাক যুদ্ধবিরোধী জনমত গড়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট বুশ নিজেই ইরাকের সব এলাকা থেকে সব যুক্তরাষ্ট্রন সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যাপারে ২০১১ সালের ডিসেম্বর সময়সীমা নির্ধারণ করেন। ওবামা পরিকল্পনার সাথে লেগে থাকেন। তিনি সৈন্য প্রত্যাহার করেন; কিন্তু উদ্দেশ্য সাধন তথা সুবিধা আদায়ের জন্য অন্য উপায়ে ইরাকি রাজনীতির সাথে আটকে রইলেন। কারণ তিনি পশ্চিম এশিয়ায় একটি বিপর্যয়কর ও অপ্রিয় যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ইসলামি বিশ্বের আবার আস্থা অর্জনের মাধ্যমে অন্যান্য চ্যালেঞ্জের দিকে অধিক মনোযোগ দেয়ার লক্ষ্যে তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেছেন। ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস) ইরাকি শহরগুলো দখল করে নেয়ার পরই কেবল ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যাপারে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সমালোচকেরা বলেন, বেশ আগেভাগেই সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে এবং এতে ইরাকের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। ২০০৬-০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন যখন তুঙ্গে ওঠে, তখন ইরাকবাসী যে গোষ্ঠীগত গৃহযুদ্ধ ও ব্যাপক রক্তপাতের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে, এ সত্যটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় এ ধরনের যুক্তির দ্বারা; কিন্তু মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি দেশে উগ্রপন্থীদের সহিংসতাকে চিহ্নিত করতে পারেনি। অপর দিকে, ইরাক সরকারের গোষ্ঠীতন্ত্র এবং সিরিয়ার বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের কারণে আইএসের উত্থান ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক যুদ্ধ এবং বাগদাদের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে শিয়াদের অধিষ্ঠান ইরানের আঞ্চলিক উপস্থিতিকে শক্তিশালী করেছে। এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরানের পরমাণু সঙ্কট নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সব ধরনের বিকল্পই আলোচনার টেবিলে ছিল। এর মধ্যে ওবামার জন্য একমাত্র টিকে থাকার মতো একমাত্র বিকল্প ছিল কূটনীতি। সুতরাং তিনি ইরানি শাসকদের প্রতি কঠোর অবরোধ আরোপ এবং একই সাথে শান্তির পথে আসারও প্রস্তাব দেন। ওবামার এই উদ্যোগ কার্যকর হয়েছে। অবরোধে ইতোমধ্যে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার কারণে দেশটিতে গণ-অসন্তোষ সৃষ্টির হুমকির মধ্যে ছিল ইরানিরা। তাই তারা ওবামার শান্তি প্রস্তাব লুফে নেয়। এখন প্রধান সমালোচনা করে বলা হচ্ছে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দুই মিত্র ইজরাইল ও সৌদি আরবের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে; কিন্তু প্রেসিডেন্ট ওবামা ইরানের সাথে চুক্তির মাধ্যমে তথা বাস্তবে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের পরিবর্তন করতে পারবেন না।

সত্যিকারভাবে পরমাণু চুক্তি এবং এই চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে ইরান শক্তিশালী হয়েছে। ইরান পরিণত হয়েছে একটি ক্ষমতাধর শক্তিতে; কিন্তু চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হওয়া থেকে অন্তত ১০ বছর পেছনে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত ওই অঞ্চলে পরমাণু শক্তির অধিকারী একমাত্র দেশ হিসেবে ইজরাইলের অবস্থানকেই শক্তিশালী করা হয়েছে। ইজরাইলের উদ্বেগকে শান্ত করার জন্য ওবামা প্রশাসন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইজরাইলি বর্বরতার ব্যাপারে কৌশলে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। ১৯৬৭ সালের পর এটাই হচ্ছে প্রথম মার্কিন প্রশাসন, যারা এমনকি জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইজরাইলের সমালোচনা করে কোনো প্রস্তাব পাস হতে দেয়নি। অধিকন্তু, ওয়াশিংটন সম্প্রতি আগামী ১০ বছরে ইজরাইলের জন্য ৩৮ বিলিয়ন ডলারের একটি সামরিক সহযোগিতা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এটা হচ্ছে, ইজরাইলের জন্য সামরিক সহায়তা দানের বৃহত্তম প্যাকেজ। রিয়াদ যখন ইয়েমেনে বোমা হামলা চালিয়েছে, তখনো একই সময়ে ওবামা সৌদিদের ব্যাপারে ৬০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাজ

এই ভারসাম্য হচ্ছে ওবামার সিরিয়া নীতির স্পষ্ট ও যথার্থ প্রমাণ। তার সমালোচকেরা বললেন, সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করার ব্যাপারে তার অনিচ্ছা দেশটির সঙ্কটকে গভীরে নিয়ে গেছে। ওবামা আদর্শিকভাবে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার মতো প্রেসিডেন্ট নন। তিনি লিবিয়ায় সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছেন। এখন সেখানে যে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য চলছে, সে জন্য তিনি আংশিক দায়ী। ওবামার নীতি হলো- ঝুঁকি কম, অর্থাৎ ন্যূনতম ঝুঁকি থাকলে শক্তি ব্যবহার করা। লিবিয়ায় হামলা চালানো ছিল তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ; কিন্তু সিরিয়ার পরিস্থিতি ভিন্ন। সিরিয়া পশ্চিম এশিয়ার একেবারে বুকের ওপর অবস্থিত। অপর দিকে সিরিয়া হচ্ছে রাশিয়ার মিত্র এবং ইরানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার। সিরিয়ার ওপর সরাসরি কোনো হামলা চালানো হলে সঙ্কট আরো মারাত্মকভাবে বিস্তার লাভ করবে। অপর দিকে, বাশার আল আসাদের পরবর্তী সিরিয়ার পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সরকারবিরোধীরা এখনো বহু ভাগে বিভক্ত। তাদের সাথে উগ্রপন্থীরাও রয়েছে। ওবামা কেবল একটি সরাসরি সঙ্ঘাতকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র একেবারে শুরু থেকে সিরিয়া সঙ্কটে প্রক্সিযুদ্ধের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিল। এখনো সঙ্ঘাত এড়িয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের একটি অংশকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিতÑ যেমন আসাদ সরকারের প্রতি রাশিয়া সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

সুতরাং এখন এটা স্পষ্ট যে, ওবামা হচ্ছেন ওই ধরনের প্রেসিডেন্ট, যিনি ঝুঁকি কম থাকলে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করেন। অন্য কোনো বিকল্প না থাকলে কূটনীতিকে গুরুত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি চ্যাম্পিয়ন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ যখন বিপন্ন হয়ে পড়ে, তখন তিনি বারবার প্রক্সিযুদ্ধের মহড়া দেন এবং আগ্রাসনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে তা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসে। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়া থেকে পিছু হটছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম এশিয়া নীতিতে স্নায়ুযুদ্ধ রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার জন্যই ওবামা এসব করছেন। তিনি বহুমুখী নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বেপরোয়া আগ্রাসী ভূমিকার দিকে ফিরে যাচ্ছেন।

ভারতের দি হিন্দু থেকে অনুবাদ : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

Share.

Leave A Reply