১০ মাঘ, ১৪২৪|৪ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৩৯|২৩ জানুয়ারি, ২০১৮|মঙ্গলবার, রাত ২:৩৭

কোন বয়সে কোন বই?

ফিচার ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম:

হ‌ুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি! আপনি কোথায়? বইয়ের ‘আয়না’ চরিত্রে নিজেকে কল্পনা করতেই ভালো লাগত দিব্যির (ছদ্মনাম)। নিজের সব কর্মকাণ্ডে চেষ্টা করতেন এই চরিত্রকে খোঁজার। মানুষের মন বোঝা-পড়া থেকে শুরু করে অন্যকে সহজে নিজের আয়ত্বে নিয়ে আসা। বছর দুয়েক আগে কলেজে পড়ার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও দিব্যি নিজের প্রোফাইল নেম বেছে নেন আয়না নামটি। এরপর বন্ধুমহলে দিব্যির পরিচয় ছড়িয়ে পড়ল ‘আয়না’ নামে। কিন্তু হুট করে মাস কয়েক আগে দেখা গেল এই নামটা মুছে ফেলা হলো। তারপর স্ট্যাটাস থেকেই জানা গেল, বিভিন্ন লেখকের বই পড়ছেন তিনি।

হুট করে একদিন ফেসবুকেই জানালেন, চেতন ভগতের থ্রি মিসটেকস অব মাই লাইফ বইয়ের বিদ্যা নামে এক তরুণীর চরিত্রে ডুবে গেছেন তিনি। বন্ধুরা আয়না বলে ডাকলেও বিরক্তি প্রকাশ করছেন। দিব্যি বললেন, স্কুল-কলেজে পড়ার সময় পাঠ্যবইয়ের বাইরে হ‌ুমায়ূন আহমেদ ও জাফর ইকবালের বই-ই পড়তাম শুধু। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বন্ধুদের কাছে গল্প শুনতে শুনতে বিভিন্ন লেখকের বিভিন্ন ধরনের বই পড়া শুরু করি। তার মধ্যে যেসব লেখকের বই বেশি পছন্দ হয়েছে, সেসব বইয়ের চরিত্রে নিজেকে ভাবতে এখন বেশ ভালো লাগছে। ইচ্ছা করে সেই সব চরিত্রের মতো নিজেকেও গড়ে তুলতে।

পাঠকের মধ্যে এ ধরনের পাঠাভ্যাস পরিবর্তনকে খুবই স্বাভাবিক বলছেন লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী শাহনাজ মুন্নী। তিনি বলেন, এটা সত্যি যে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে রুচির পরিবর্তন হয়। তাই বয়সভেদে পাঠকের পাঠাভ্যাস পরিবর্তন হয়। যেমন অল্প বয়সে জটিল বিষয়ের বই ভালো লাগে না। তখন মন বেশ নরম থাকে। রোমান্টিক ও কবিতার বই পড়তে ভালো লাগে। আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জটিল বিষয়ের বইয়ের সঙ্গে অভ্যস্ত হন পাঠক।

তবে কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম থাকে না তা কিন্তু নয়। যেমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তরুণ কবিরুল ইসলাম অল্প বয়স থেকেই জটিল বিষয়ক বই পড়তে ভালোবাসতেন। তিনি বলছিলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি, ইতিহাসের প্রতি আমার দুর্বলতা রয়েছে। এ জন্য এ ধরনের বই পড়তে চাইতাম। এখনো এই অভ্যাস ঠিকে আছে। বলা চলে, উপন্যাস কিংবা আবেগী বই আমাকে টানতে পারেনি অতটা।’

Book_The Dhaka Report

সময় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমদ বিষয়টাকে স্পষ্টও করলেন এবং জানালেন কোন বয়সের পাঠকেরা কেমন বই পড়েন। তিনি বলেন, সাধারণত বয়স বাড়লে আগের পড়া বইগুলো কম ভালো লাগে। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে একই বই বিভিন্নবার পড়লে অনুভূতির হেরফেরও হয়। শিশু বয়সে রূপকথা, কৈশোরে কিশোর উপন্যাস, গোয়েন্দা বই, সায়েন্স ফিকশন ও সাহিত্য এবং উচ্চমাধ্যমিকের পর সামাজিক, রোমান্টিক ও ননফিকশন পড়তে পাঠকের ভালো লাগে। মধ্য বয়সে একই পাঠক আবার জটিল বিষয় পড়তে পছন্দ করেন। যেমন প্রবন্ধ, ইতিহাস, দর্শন, আত্মজীবনী ও ভ্রমণকাহিনি-সম্পর্কিত বই।

এই নিয়মকে স্বাভাবিক বলেছেন ফরিদ আহমদ। কিন্তু কেউ কেউ তো ব্যতিক্রমী থাকেন, যাঁরা আগে থেকেই জটিল বিষয় নিয়ে ভাবেন। তাঁরা নিজের ইচ্ছার সঙ্গে মিলিয়ে বই পড়েন বলে জানান তিনি। যেমন যাঁদের নাটক, চলচ্চিত্রের প্রতি ঝোঁক রয়েছে, তাঁরা সত্যজিৎসহ এ বিষয়ের নানান বই পড়েন।

২০১৩ সালে পাঠকদের পাঠাভ্যাস নিয়ে যুক্তরাজ্যে এক জরিপ চালিয়েছে দেশটিতে বই পড়তে পাঠকদের আগ্রহী করার দাতব্য প্রতিষ্ঠান বুকট্রাস্ট। তাতে বলা হয়, বয়স ও জীবনের সঙ্গে বই পড়ার যোগসূত্র রয়েছে। জীবনের শুরুতে নিজেদের আগ্রহের পাশাপাশি মা-বাবা এবং স্কুলে কেমন বই পড়তে উৎসাহ বোধ করে সেটার ওপর নির্ভর করে অল্প বয়সে কেমন বই পড়বে।

বুকট্রাস্টের এই গবেষণায় চারটি বিষয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে তুলে ধরা হয়। প্রথমত, পাঠক এমন বই পড়তে চান, যেটা তাঁকে আরও আনন্দ দেবে। দ্বিতীয়ত, বইয়ের বিষয়বস্তু এমন চান, যেটি নিজের জীবনের সঙ্গে মেলে। তৃতীয়ত, অনেকে বই পড়ে তাঁদের জীবনে উন্নতি ঘটাতে চান। চতুর্থত, সেই বই-ই পড়তে চান, যেটা তাঁকে অণুপ্রেরণা দেবে। কার্টিসি: প্রথম আলো।

Share.

Leave A Reply