জয়তু নারী!

সাদিয়া বিনতে শাহজাহান: ম্যাগাজিনটার ফ্রন্ট পেজে খুবই বাজেভাবে পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। চোখ পড়তে নিজেরই কেমন লজ্জা করে। এ রকম কয়েকবার হয়েছে। ম্যাগাজিনের উদ্ভট খোলামেলা মডেলের ছবি কেউ দেখার আগেই আমি পাচার করেছি ডাস্টবিনে, কতবার মেজাজ খারাপ করে চিতার আগুনের মতো পুড়িয়েছি গ্যাসের চুলোয়।

বাবা-ভাই কিংবা কোন ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে শহরের বড় বড় মোড়ে কোনো কাজে গেলে লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে রয়। আমি সংকুচিত হয়ে যাই। আমার দৃষ্টি মাটির সঙ্গে মিশে যায়। কি করে মাথা উঁচুতে রাখবো?

মাথার ওপর বিলবোর্ডে সর্বাঙ্গ উন্মোচন করে রাখা রূপসী আমার সব লাজের কারণ। আমার সর্বস্ব দিয়ে গোপন করা বিষয়গুলোকে সে প্রচার করছে উন্মত্তভাবে, স্বগৌরবে। আমার মান মিশে যায় ধুলোর সঙ্গে। আমি আর গোপন থাকি কই?

লাক্স সাবান কিংবা প্যারাসুট নারিকেল তেলের বিজ্ঞাপনগুলো দেখে কি আপনার মনে হয় না, কেবল নারীরাই ওসব ব্যবহার করে পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য। তামাম পুরুষ জাতি যেন জীবনে কোনোদিন লাক্স সাবান কিংবা নারিকেল তেল; এগুলো ব্যবহারই করেনি।

কিছুদিন আগে একটা প্যারাসুট নারকেল তেলের বিজ্ঞাপন ছিলো এমন; স্বামী অফিসে যাচ্ছে। কিন্তু স্ত্রী তাকে কোনোভাবেই যেতে দেবে না। নানাভাবে চেষ্টা করে সে ব্যর্থ হয়। অবশেষে প্যারাসুট তেল দেওয়া ঘন কালো চুল দেখিয়ে সে তার স্বামীকে বশে আনে। বিজ্ঞাপনটার ট্যাগলাইন ছিলো সম্ভবত এমন, “ভালোবেসে বেঁধে রাখুন চুলে!” আশ্চর্য, তার মানে কি নারীরা সৌন্দর্য প্রদর্শন ছাড়া পুরুষের মন জয় করতে অক্ষম? পুরুষের মনোরঞ্জন ব্যাতীত নারী জাতির আর কোনো কাজই থাকতে পারে না?

Lux_The Dhaka Report

আজকাল একটা ব্যাপার খেয়াল করবেন, নারীদের পোশাকের আকৃতি দিনদিন কমে আসছে। মানে স্বল্প দৈর্ঘ্যের পোশাকে অধিকাংশ নারীই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। শর্ট ড্রেসে খোলামেলাভাবে নিজেকে প্রদর্শনের পেছনে কি যুক্তি? কেন সে এটা বেছে নিয়েছে? এ ব্যাপারে কজন নারী সঠিক যুক্তি দেখাতে পারবেন? আমি জানতে চাই কজন? অদ্ভুত না?

এরাই আবার নারী অধিকার নিয়ে কথা বলে; যেখানে তারা নিজেরাই ক্রেতাদের পছন্দসই মোড়কে নিজেদের উপস্থাপন করছে নিত্য লাল-নীল বাহারি ঢংয়ে।

আপনি কিভাবে খাবেন, কি জুতো পরবেন, কোন দিবসে আপনি বিশাল লাল টিপ পরবেন, কোন দিবসে কালো টিপ! এসব কারা ঠিক করে দেয়? আপনি কাদের হাতের কাঠ-পুতলি? তো আর দিনশেষে, আমি নারী, আমি নারী, আমাকে অধিকার দিন; এসব বলে আওয়াজ তোলার কোনো তরজমা কি আদৌ আছে?

শুনুন, অধিকার কেউ কাউকে দেয় না। আর ওই অধিকারের মূল্য কি, যদি তা সম্মানের সঙ্গে না হয়? এবার অধিকারের কথা ভুলে যান, আগে সম্মানের কথা ভাবুন; সম্মান আসলে অধিকার আপনাআপনি আসবে।

৮ই মার্চের মর্মার্থ বুঝার আগে আপনার প্রতিটি দিনের মাঝে প্রাপ্ত সম্মান-অসম্মানের মর্মার্থ খুঁজুন। আর সবচেয়ে বড় কথা; “আগে নিজেকে সম্মান করতে শিখুন; পরে অন্যদের হতে সম্মানের আশা করতে যাবেন।”

পোশাক-আশাক, রূপ-সৌরভ আপনার পরিচয় কিংবা অধিকারের বিষয়বস্তু নয়; বরং দশ পুরুষের সামনে আপনার সম্মানের সঙ্গে বেড়ে উঠতে পারাটাই আপনার সাফল্য। এটা আপনার অধিকার।

নারী-পুরুষ একে অপরের প্রতিযোগী নয়, বরং পরিপূরক। একজন ব্যাতীত অপরজন অচল! তাই অধিকারের প্রতিযোগিতায় না নেমে বরং সম্মানের সঙ্গে ভালোবেসে পাশাপাশি কদম ফেলুন। একে অপরের সহযোগী হোন, প্রতিপক্ষ নয়। নিজে সম্মানিত হয়ে অপরকেও সম্মান করুন। ভালো থাকুন।

লেখক: কবি, গল্পকার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।

বিভাগ:কলাম
Share.

Leave A Reply