বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবেই শেভরনের গ্যাসক্ষেত্র কিনছে চীন

বিজনেস ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম: বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে প্রথমবারের মতো বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে চীন। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে ভারত ও জাপানের সঙ্গে প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নিচ্ছে বেইজিং। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, শেভরনের কাছ থেকে বাংলাদেশী তিনটি গ্যাসক্ষেত্র কিনে নিচ্ছে চায়না ঝেনহুয়া অয়েল ও সিএনআইসি করপোরেশন নামে দুই চীনা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম। আওতাধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রতিবছর ১ কোটি ৬০ লাখ টন জ্বালানি তেলের সমপর্যায়ের গ্যাস উত্তোলন করে শেভরন, যা বাংলাদেশের মোট উত্তোলনের প্রায় অর্ধেক।

আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় বর্তমানে আশপাশের দেশগুলোর অবকাঠামোগত প্রকল্প ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে চীন ও ভারত। এ প্রতিযোগিতায় চীনের সর্বশেষ চাল হলো শেভরনের গ্যাসক্ষেত্র ক্রয়। এর আগে চলতি বছরের মার্চেই বাংলাদেশের একটি গ্যাস প্রকল্পে ৬ কোটি ডলারের এক ঋণসহায়তার অনুমোদন দিয়েছে চীনের নেতৃত্বাধীন বহুপক্ষীয় সংস্থা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। প্রকল্পটির মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে। অন্যদিকে গত দুই মাসের মধ্যে পারমাণবিক জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে বেশ ক’টি চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। বাংলাদেশের রামপালে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নাধীন, যাতে ভারত থেকে আমদানি করা কয়লা ব্যবহার করা হবে।

বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের খেলায় নাম লিখিয়েছে জাপানও। ২০১৬ সালের জুনে বাংলাদেশে বেশকিছু বড় ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১৫০ কোটি ডলারের এক ঋণসহায়তা দিয়েছে দেশটি। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রাজধানী ঢাকার পরিবহন খাতে একটি র্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম স্থাপন। গত বছরের নভেম্বরেই যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে পেট্রোলিয়াম খাতের একটি জয়েন্টভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে বাংলাদেশ ও জাপান।

File photo of a Chevron gas station sign in Del Mar, California

চীন ও ভারত— এক ধরনের অমোচনীয় জ্বালানি ক্ষুধা রয়েছে দুই দেশেরই। এ কারণে জ্বালানির বিদেশী উৎস তো বটেই, একই সঙ্গে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের নৌপথের ওপরও তাকিয়ে থাকতে হয় দেশ দুটিকে। তবে বাংলাদেশ থেকে পাইপলাইনে গ্যাস নেয়ার বিষয়ে এখনই প্রস্তুত নয় চীন। কিছুদিন আগেই মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথভাবে গ্যাস ও জ্বালানি তেলবাহী আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন চালু করেছে দেশটি। মিয়ানমার থেকে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুনমিংয়ে এক পরিশোধনাগারে জ্বালানি বয়ে নিয়ে যাবে পাইপলাইনটি। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সংযোগ স্থাপনকারী কোনো পাইপলাইনের কাজ শুরু হয়নি এখনো।

অন্যদিকে বাংলাদেশ নিজেই পেট্রোলিয়াম পণ্যের নিট আমদানিকারক দেশ। বাড়তি জনসংখ্যার চাপ মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়তই জ্বালানি সংকটে ভুগতে হয় দেশটিকে। এত দিন শেভরনের আওতাধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলিত গ্যাস কিনে নিয়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। চীনও বাংলাদেশে উত্তোলিত গ্যাস নিয়ে এ ধরনেরই কোনো চুক্তিতে পৌঁছতে পারে।

জ্বালানি খাত বাংলাদেশে ক্ষমতাধর দেশগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার একটি দিক মাত্র। গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়েও বাংলাদেশের মন জয়ের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত চীন, ভারত ও জাপান। এর আগে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর সম্প্রসারণে ৯০০ কোটি ডলারের একটি প্রস্তাবনা দিয়েছিল চীন। এছাড়া সড়কপথে চীনের ইউনান থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পর্যন্ত দীর্ঘ একটি সড়ক নির্মাণেরও আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্কের মধ্য দিয়ে চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত আন্তঃমহাদেশীয় রেল নেটওয়ার্ক স্থাপনেরও প্রস্তাবনা রয়েছে। তবে এর সবই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের অপেক্ষাধীন প্রস্তাবনা মাত্র।

Share.

Leave A Reply