৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫|৬ রবিউস-সানি, ১৪৪০|১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮|শুক্রবার, সন্ধ্যা ৭:০২

হারিয়ে যায় দূরের আকাশ অগোচরে

সাদিয়া বিনতে শাহজাহান, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম: জাহেদ ছেলেটা মারা গেছে কাল রাতে! আমরা একই এলাকায় থাকতাম। ইনফেক্ট এখনো আমি আছি, ও নেই! বছর পাঁচেক আগে আমি যখন রোজ এপ্রোন গায়ে কলেজের জন্য বেরুতাম, ওকে দেখতাম কলেজ ইউনিফর্ম পড়ে রাস্তায় পথ চলতে।

আমরা একই বয়সী ছিলাম অথবা ও আমার বছর দুয়েক বড় হবে। দুজন দুজনকে চিনতাম বটে, কিন্তু কখনো কথা হয়নি। কতবার ও তাকিয়ে রইতো, কথা বলতে চাইতো। আমি এড়িয়ে যেতাম। বলতে গেলে সংকোচ, ওই বয়সে যা হয় আরকি। আশা যাওয়ার পথে রোজ দেখতাম ওকে। রোজ! একদম শুরুতে আমরা যে গলিতে থাকতাম ওরাও ওদিকেই থাকতো।

আমরা বাসা চেঞ্জ করার পর অদ্ভুতভাবে একদিন খেয়াল করলাম ওরাও আমাদের আশেপাশে শিফট হয়েছে।একদিন এক আন্টির সঙ্গে উনার বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিলাম। আশ্চর্যজনক হলেও দেখলাম ও ড্রয়িং রুমে পা দুলিয়ে দুলিয়ে টিভি দেখছে। আমাকে ওখানে দেখে একদম ভূত দেখার মতো পালালো।

আমি তখন কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখলাম। কিন্তু ও বই খাতা ছেড়ে একদম পাকা ব্যবসায়ী। এলাকায় দোকান খুলে বসলো। কে না চিনে ওকে। স্বভাব-চরিত্রের গুণে সবার প্রিয় হয়ে উঠলো। আব্বু ছিল ওর নিয়মিত খরিদ্দার। আমি কতোবার প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে ওর দোকানের কাছে যেতাম বটে, কিন্তু অন্য দোকানে চলে যেতাম। ওই যে সংকোচ। আমার যাওয়ার পথে ওকে রোজ দেখতাম তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে মনে হতো ও কি অপেক্ষা করে আমার আসা যাওয়ার? হয়তো তা নয়। আমাদের মাঝে এমন কিছুই ছিলো না। কক্ষনো না। কখনো কথাও বলিনি পর্যন্ত। গত পরশু সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথেও দেখেছি ওকে। অফ হোয়াইট কালারে পাঞ্জাবী পড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আমার দিকে তখনো তাকিয়ে মিষ্টি হেসেছিলো বোধ হয়! কে জানতো ওই শেষ দেখা! শেষ হাসি।

সকালে আব্বু এসে যখন হঠাৎ করে জানালো ও আর নেই। আমি ধড়ফড় করে শোয়া থেকে উঠে বসলাম। বিশ্বাস হচ্ছিলো না মোটেও! আব্বুকে বললাম, মনে হয় তুমি ভুল শুনেছ! পরশুও তো দেখলাম ওকে। আব্বুর চোখে অদ্ভুত কষ্ট দেখতে পেলাম। বললো, “এমন জোয়ান ছেলে! আহা! বড় ভালো ছিল। কাল একটা কাজে অনেকবার ফোন দিয়ে ওকে পাইনি। আজ সকালে ওর দোকানে গিয়ে জানতে পারলাম। আমি ভুল শুনি নাইরে। ও আর নেই!”

আমার মনটা খাঁ খাঁ লাগছে। টনটনে ব্যাথা। কেন লাগছে? ও তো আমার কেউ ছিল না। কেউ না! একজন পথচারী ছাড়া আর কিছুই নয়। তবুও কেন! কি অদ্ভূত জীবন-যৌবন! কি অদ্ভূত মৃত্যুপথ!

আজ বিকালে বের হয়ে আমাদের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কেমন শূন্য লাগছিলো। পথঘাট একদম ফাঁকা, ছন্নছাড়া। কেউ কি আড়ালে উঁকি দিচ্ছে আমায়! ওর দোকানের সামনে আসতেই তাকালাম। খিল দিয়ে বন্ধ করা। মনে হচ্ছিলো জনমের তরে বন্ধ হয়ে গেছে ওই দোকানটার কপাট! আঁধার চিরতরে ছেয়ে গেছে পথটায়।

আসার সময় ও এক নজর তাকালাম। কেউ কি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে ওখানাটায়! আধাঁরে? যদি বলে বসে, “তোমার সঙ্গে কথা হলো না এ জনমে! কেমন আছো? ঠিকমতো চলছে তো জীবন? দেখা হবে! ভালো থেকো!”

Share.

Leave A Reply