৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫|৯ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০|১৮ নভেম্বর, ২০১৮|রবিবার, দুপুর ১:৫৩

বৃষ্টি বিন্দুর আত্মকথা

নাহিদা আশরাফী: ‘ও মুখুজ্জ্যে দাদা,আজ কি আর বেরুবে? দ্যাখো তো কি অনাসৃষ্টি। সককাল থেকে ঝরঝর কেবল ঝরেই যাচ্ছে। কাজকম্ম সব রসাতলে গেল। মেজ বৌ ও মেজ বৌ– ছাতাখানা আর প্লাস্টিকের চটিজোড়া দাও দিকিনি। উত্তরপাড়ায় মাছের আড়ৎ খানায় একটু ঢু মেরে আসি—যদি কিছু মেলে এই বরষায়। দানাপানি দুচারটে মুখে তো দিতে হবে।“
—–হাক ডাক করা শৈলেন বাবুর ইচ্ছে শক্তি ই জয়ী হলো আমায় উপেক্ষা করে।
আর কেনই বা হবে না?
হেমন্ত লক্ষী যে এই বরষায় তারই চৌচালা টিনের ঘরে আসন পেতেছে ।
ত্যাক্ত বিরক্ত মুখুজ্জ্যে বাবু ছাইরঙা এই মেঘের দিনে ঝুলবারান্দায় বসে,
আমার পতনের নিমগ্ন দর্শক হয়ে আছেন।
আমার পতনের সাথে মুখুজ্জ্যে বাবু তার জীবনের
কোন সাদৃশ্য খুজে পান কি না; কে বলবে?
‘অমন করতে নেই রে খুকি। জল কাদায় সব মাখিয়ে দিলি যে।
জ্বর না বাধিয়ে আর ছাড়বি না দেখছি।‘
বাবা যতই সাবধান করে খুকি ততই ঝুটি দুলিয়ে
ছোট্ট দুটি পায়ে দাপিয়ে বেড়ায় জল জমা রাস্তা।
খুকুর স্কুলের ফ্রক,বাবার প্যান্ট ভিজে একাকার।
খুকুকে বকতে গিয়ে অজান্তেই হেসে ওঠেন বাবা।
চকিতে মনে পড়ে যায় স্কুলবেলার সেই দুরন্তপনাটুকু ।
বসন্তের সোনা রং বাবার সোনালী স্মৃতিতেই যেন বন্দী হয়ে আছে।
সেই স্মৃতি ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগোতেই চোখে পড়ে তিন কিশোরীর বৃষ্টি বিলাস,
জল জমা সবুজ মাঠে উঠতি যুবকদের ফুটবল ম্যাচ,
রমিজ মিয়ার চায়ের দোকানে চা পানরত আশাহীন যুবকের নির্লিপ্ত চোখ।
শীতের সবটুকু বিষন্নতা আর নির্লিপ্ততা যে চোখে আশ্রয় নিয়েছে।
গ্রীষ্মও তার উত্তাপ ঢালে হুডতোলা,নীল পলিথিনে মোড়া রিক্সায়
একজোড়া কপোত কপোতির তপ্ত নিশ্বাসে।
অথবা নব পরিনীতার বদ্ধ ঘরে।
টুপটাপ টুপটাপ পতনে ওদের ব্যাকুলতার সঙ্গীতে আমি সুর বিন্যাস করি।
টিনের চালে আমার মুখরিত পতনে মানব হৃদয় হয়ে ওঠে কবি।
আর জলের বুকে জল পতনের মৃদঙ্গনাদে কবি হয়ে ওঠে কবিতা।
শব্দেই ধারন করে শরতের সব টুকু শুভ্রতা।
অথচ দেখো যে আমাকে নিয়ে এতকিছু
সেই আমাকেই কত উপেক্ষা,কত অবহেলা।
ইচ্ছে করলেই আমি ভিজিয়ে দিতে পারি
মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন,
হকারের নিত্যকার হাকডাক,
যৌবনবতী কন্যার শাড়ির আঁচল।
ইচ্ছে করলেই ছুঁয়ে দিতে পারি অষ্টাদশীর লাজ রাঙা কপোল।
তোমার খোপার মেঘে ঝাপ দিয়ে অনায়াসে পেতে পারি বকুল চাপার ঘ্রান।
তোমার বুকের ভাজে ঠোঁটের কোনে আটকে থেকে হতে পারি মাদক মাতাল।
শুধু পারি না তোমার মন ভেজাতে।
অথচ দ্যাখো,এই আমাকেই শব্দে গেঁথে কত সহজেই কাব্য আঁকেন কবি।
কত উপেক্ষায় আর অবহেলায় আমায় মাড়িয়ে, পিছু ফেলে
অষ্টাদশীও তাই কবিতেই উন্মুখ হয়।
বৃষ্টি বিন্দুর পরজনম বলে যদি কিছু থাকে তবে —-
তবে হিজল বা তমাল নয়,
নদী, নক্ষত্র,নারীও নয়,
চাঁদ,ফুল,পাখি কিংবা মানুষও নয়।
আর জনমে কবিই হবো।

Share.

Leave A Reply