৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪|৩ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯|২২ নভেম্বর, ২০১৭|বুধবার, বিকাল ৪:৪৯

রহস্যজনক নিখোঁজের তদন্তও রহস্যঘেরা

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম: সাভারের কাতলাপুরের পালপাড়ার বাড়ি থেকে ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর রহস্যজনকভাবে ‘অপহৃত’ হন ঢাকা মহানগর ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নূর মোহাম্মদ ওরফে নুরু হাজি। এরপর গত ৬ বছরেও নুরু হাজির খোঁজ মেলেনি। ঢাকা মহানগর ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম নিখোঁজ হন ২০১০ সালের ২৫ জুন। তার ছেলে আবু সাইদ চৌধুরী শেরেবাংলা নগর থানায় প্রথমে জিডি ও পরে একটি মামলা করেন। দীর্ঘদিন পরও তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আওয়ামী লীগ-বিএনপির এ দুই নেতার রহস্যজনক অপহরণ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তও কার্যত থেমে আছে। তদন্ত নিয়ে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের তেমন আগ্রহও নেই। শুধু এ দুই মামলা নয়; রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আরও কিছু আলোচিত মামলার তদন্ত রহস্যজনক কারণে আটকে আছে বছরের পর বছর। সর্বশেষ গত সোমবার কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার শ্যামলী থেকে রহস্যজনকভাবে অপহৃত হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সৌভাগ্যবশত যশোর থেকে উদ্ধার হলেও এর রহস্য উন্মোচিত হবে কি-না তা নিয়ে আছে নানা সংশয়। এ ঘটনায় আদাবর থানায় মামলা করে তার পরিবার। এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে ২০১৪-১৭ সাল পর্যন্ত রহস্যজনকভাবে অপহরণ বা নিখোঁজ হন ২৮৪ জন। তাদের মধ্যে মৃতদেহ পাওয়া গেছে ৪৪ জনের। গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ৩৬ জনকে। পরিবারের কাছে ফেরত এসেছেন ২৭ জন। বাকি ১৭৭ জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে স্বজন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কোনো সদুত্তর নেই। আবার যারা রহস্যজনক নিখোঁজ বা অপহরণের পর ফেরত এসেছেন তাদের মুখও রহস্যজনকভাবে বন্ধ। একাধিক দফায় গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তারা কিছু বলতে নারাজ। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের স্বজনের অভিযোগের তীর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে।

২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদার আবুল হাসানাত পলিন (৪০) তার ছেলেকে বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পৌছেঁ দিয়ে নিজের গাড়িতে বাসায় ফিরছিলেন। স্কুল গেট থেকে গাড়িটি একটু সামনে যেতেই গতিরোধ করে একটি মাইক্রোবাস। পলিনকে টেনেহিঁচড়ে নিজের গাড়ি থেকে নামিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। প্রায় তিন মাস পর পলিনের খোঁজ মিললেও কেন, কী কারণে, কারা তাকে অপহরণ করেছে তা জানা যায়নি।

২০১৪ সালের ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন। ৩৪ ঘণ্টা পর তাকে চোখবাঁধা অবস্থায় কে বা কারা মিরপুরে নামিয়ে দিয়ে যায়। এরপর অটোরিকশায় ধানমণ্ডিতে যাওয়ার পথে পুলিশ চেকপোস্টে তাকে আটকানো হয়। পুলিশ তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে বাসায় পৌঁছে দেয়।

Enforced Disappearances 02

আবু বকর সিদ্দিক অপহরণের ঘটনায় ফতুল্লা থানায় মামলা করেন তার স্ত্রী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। ওই ঘটনার পর একজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারকে প্রধান করে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তারা একাধিক দফায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন ছাড়াও ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। তবে কিছু দিন যাওয়ার পর তদন্তের সব আয়োজন থেমে যায়। মামলার তদন্তেরও নেই অগ্রগতি।

২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর সাভারের কাতলাপুরের পালপাড়ার বাড়ি থেকে অপহৃত হন ঢাকা মহানগর ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরু হাজি। একই বছরের ৩ ডিসেম্বর আগারগাঁও থেকে নিখোঁজ হন নুরু হাজির জামাতা আবদুল মান্নান ও মান্নানের বন্ধু ইকবাল। এরপর আর তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার যোগাযোগ করা হলে নুরু হাজির স্বজনরা জানান, এখন আর নুরু হাজির খোঁজে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নেই। কেন, কারা, কী কারণে তাকে অপহরণ করেছে, সে রহস্য আজও উদ্ঘাটন হয়নি। তবে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার সময় অপহরণকারীরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বলে পরিচয় দিয়েছিল। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, এখনও নুরু হাজির খোঁজ পাওয়া যায়নি।

রাজধানীর মহাখালী এলাকা থেকে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতে রহস্যজনকভাবে অপহৃত হন বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী। বিএনপি ও ইলিয়াসের পরিবারের অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গাড়িচালক আনসারসহ ইলিয়াসকে ধরে নিয়ে গুম করেছে। তবে প্রথম থেকে র‌্যাব-পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ ঘটনার সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পৃক্ত নয়। এ ঘটনার পর ইলিয়াসের স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা বনানী থানায় জিডি করেন।

এ পর্যন্ত ৪০ বারের বেশি আদালতে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। তবে এসব প্রতিবেদনে ইলিয়াস আলীকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন তথ্য নেই। ইলিয়াস আলীর ছেলে লাবিব ইলিয়াস বলেন, প্রথমে কিছু দিন তৎপর থাকার পর এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ আর যোগাযোগ করেন না।

২০১৫ সালের ১০ মার্চ উত্তরার একটি বাসা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ। ৬২ দিন পর ভারতের মেঘালয়ের শিলং থেকে তিনি উদ্ধার হন। ওই বছরের ১২ মে মেঘালয় ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতাল থেকে সালাহউদ্দিন তার স্ত্রীকে ফোন করেন। সেখানকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করে, মেঘালয়ের গলফ গ্রিন এলাকায় অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ঘোরাঘুরির সময় তাকে আটক করা হয়েছে।

২০১১ সালের ১৪ জুলাই থেকে খোঁজ নেই রাজধানীর বঙ্গবাজার এলাকার ব্যবসায়ী ও ঢাকা সুপার নামে একটি মার্কেটের সভাপতি হাজি ওয়াজিউল্লাহর। স্বজনদের আশঙ্কা, মার্কেট নিয়ে বিরোধের জের ধরে তাকে গুম করা হয়েছে। কোনো ক্লু না পাওয়ায় গোয়েন্দা পুলিশ এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।

২০০৮ সালের ২৬ জুন নিখোঁজ হন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা লিয়াকত হোসেন। লিয়াকতের পরিবারের অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয়েছে। ৯ বছরেও তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।

২০১৬ সালের ১৬ মার্চ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ জোহা। ৫ দিন পর তাকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর তানভীরকে বাসায় পেঁৗছে দেয় পুলিশ। কেন, কারা, কী কারণে তাকে তুলে নিয়েছে তা আজও জানা যায়নি। তানভীর এ ব্যাপারে এখনও মুখ খোলেননি।

২০১৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে বনানীতে এক আত্মীয়র বাসা থেকে সাদা পোশাকের পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তার স্বজনরা। স্বজনদের অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ প্রায় ২১ ঘণ্টা পর ধানমণ্ডি এলাকা থেকে মান্নাকে গ্রেফতার দেখায়। প্রায় এক বছর ৯ মাস কারাগারে থাকার পর ২০১৬ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং সেনা বিদ্রোহে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জামিন পান মান্না।

২০১৪ সালে সুনামগঞ্জ থেকে অপহরণের সাড়ে তিন মাস পর টঙ্গীতে পাওয়া যায় বিএনপির যুক্তরাজ্য শাখার সহসভাপতি মুজিবুর রহমানকে। কেন কী কারণে কারা এ ঘটনায় জড়িত তার আসল কাহিনী আজও জানা যায়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, নিখোঁজ বা অপহরণের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রথম লক্ষ্য থাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে জীবিত উদ্ধার করা। এরপর কারা, কী কারণে অপহরণ করেছে তা খুঁজে দেখা হয়। অনেক সময় অপহরণের কারণ বা জড়িতদের খুঁজে বের করা না গেলেও তদন্ত অব্যাহত থাকে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, অনেক সময় পেশাদার অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা পুলিশ-র‌্যাবের পরিচয়ে টার্গেট করা ব্যক্তিকে তুলে নেয়। এমন অনেক চক্রকে গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নকল পোশাক উদ্ধার করা হয়েছে। অনেক সময় অপহৃত হওয়ার পর ভুক্তভোগীরা থানায় দায়ের করা জিডি ও মামলার অনুলিপি নিয়ে র‌্যাবের কাছে আসেন। এরপর র‌্যাব তদন্ত শুরু করে। আবার অনেক ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে র‌্যাব তদন্ত করে থাকে। কার্টিসি: সমকাল।

Share.

Leave A Reply