৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪|৩ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯|২২ নভেম্বর, ২০১৭|বুধবার, বিকাল ৪:৪৪

গণিতে দুর্বল ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম: একটি বিদ্যালয় ভবনের দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট ও প্রস্থ ২৫ ফুট। ভবনটির চারপাশ একবার ঘুরে আসতে মোট কত ফুট হাঁটতে হয়? গণিতে দখল পরিমাপে প্রশ্নটি করা হয়েছিল পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের। আবার সখিপুর গ্রামে পরিবার আছে ২০০টি। এর মধ্যে নিজস্ব জমি রয়েছে ৭৫ শতাংশ পরিবারের। তাহলে গ্রামটিতে নিজস্ব জমির মালিক কতটি পরিবার? এমন প্রশ্নও করা হয়েছিল শিক্ষার্থীদের। এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পেরেছে  পঞ্চম শ্রেণীর মাত্র ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী। ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীই এ ধরনের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। গণিতের মৌলিক বিষয়ে দক্ষতা জানতে তাদের উপযোগী আলাদা প্রশ্ন করা হয় তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদেরও। সঠিক উত্তর দিতে পেরেছে এ শ্রেণীর মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষার্থী।

গণিতে দক্ষতা যাচাইয়ে দেশের তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ওপর জরিপ চালিয়ে দুই বছর অন্তর প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন বিভাগ। ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসেসমেন্ট ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের গণিতে এ দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। আগের বছরগুলোর প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গণিতে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের দখল আগের চেয়ে কমেছে।

সারা দেশের ১ হাজার ১৮৫টি বিদ্যালয়ের তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ওপর জরিপটি চালায় ডিপিই। গণিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাইয়ে চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয় জরিপে। বিষয়গুলো হলো— সংখ্যা, পরিমাপ, তথ্য-উপাত্ত এবং আকার ও পরিধি। নির্দিষ্ট শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের উপযোগী করেই প্রশ্নগুলো করা হয়। তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা হয় ৩৫টি। পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সামনে প্রশ্ন ছিল ৪০টি। এর মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের জ্ঞান, চিন্তার ক্ষমতা, বোধগম্যতা ও প্রায়োগিক ব্যবহারের দক্ষতা পরিমাপ করা হয়।

শিক্ষার্থীদের দেয়া উত্তরের ভিত্তিতে পাঁচটি আলাদা ব্যান্ডের মাধ্যমে গণিতে তাদের দক্ষতা প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শ্রেণীর জন্য প্রযোজ্য গণিতের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্নদের ব্যান্ড ১-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর গণিতের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা ও দক্ষতা রয়েছে এমন শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ব্যান্ড ৫-এ। এছাড়া সংখ্যা পুনর্বিন্যাস ও মুদ্রা শনাক্তকরণে সক্ষম শিক্ষার্থীদের রাখা হয়েছে ব্যান্ড ২-এ, ছয় অংক পর্যন্ত গাণিতিক হিসাব করতে সক্ষমদের ব্যান্ড ৩ ও আর্থিক হিসাবে দশমিকের ব্যবহার করতে সক্ষমদের ব্যান্ড ৪-এ। ব্যান্ড ৫-এ রয়েছে পঞ্চম শ্রেণীর মাত্র ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী।

প্রতিবেদনে ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৫ সালের জরিপের ফলাফলের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে গণিত বিষয়টি ভালোমতো আয়ত্তকারী অর্থাৎ, ব্যান্ড ৫ মাত্রার শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। ২০১৫ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ শতাংশে। আর পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে ২০১১ সালে পূর্ণ দক্ষতা তথা ব্যান্ড ৫ মাত্রার দক্ষতা অর্জনকারী শিক্ষার্থী ছিল ৩২ শতাংশ। ২০১৫ সালে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০ শতাংশে।

Math_The Dhaka Report 03

আর্থিক হিসাবে দশমিকের ব্যবহার করতে সক্ষমদের রাখা হয় ব্যান্ড ৪-এ। ব্যান্ড ৪ অর্জনকারী শিক্ষার্থীর হারও কমছে। ২০১১ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে ব্যান্ড ৪ মাত্রার শিক্ষার্থী ছিল ১৪ শতাংশ। ২০১৩ সালে তা বেড়ে ২০ শতাংশ হলেও ২০১৫ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ শতাংশে। আর পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে ২০১১ সালে ব্যান্ড ৪ মাত্রার দক্ষতা অর্জনকারী শিক্ষার্থী ছিল ৩৪ শতাংশ। ২০১৩ সালে অপরিবর্তিত থাকলেও ২০১৫ সালে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশে।

ছয় অংক পর্যন্ত গাণিতিক হিসাব করতে সক্ষমদের ব্যান্ড ৩। তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যান্ড ৩ অর্জনকারী শিক্ষার্থীর হারও কমছে। ২০১১ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে ব্যান্ড ৩ অর্জনের হার ছিল ৩৫ শতাংশ, ২০১৩ সালে এ হার কমে ৩৩ ও ২০১৫ সালে আরো কমে ৩২ শতাংশ হয়েছে। আর পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে ব্যান্ড ৫ ও ৪ অর্জনকারী শিক্ষার্থীর হার আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় ব্যান্ড ৩ অর্জনের হার বাড়ছে। বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সিংহভাগের দক্ষতা ব্যান্ড ৩ মাত্রার। ২০১১ সালে পঞ্চম শ্রেণীতে ব্যান্ড ৩ অর্জনকারী ছিল ২৯ শতাংশ, ২০১৫ সালে এসে তা দাঁড়ায় ৪২ শতাংশে।

গণিতে অদক্ষতার পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তার মতে, এর একটি হলো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ না দেয়া, অন্যটি মানসম্মত শিক্ষকের অভাব। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে শিক্ষার মানের প্রতি মনোযোগ বাড়ানো, শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

তিনি বলেন, শুধু প্রাথমিক নয়, মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদেরও গণিতে দক্ষতা নিম্নপর্যায়ে। মাধ্যমিকের ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল গণিতে অকৃতকার্যতা। আমরা প্রসারের তুলনায় গুণগত মানে মনোযোগ কম দেয়ার ফলে এমনটা হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতে দক্ষতায় লিঙ্গভেদে তারতম্য দেখা গেছে। পঞ্চম শ্রেণীতে গণিতে দক্ষতায় মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা এগিয়ে। ২০১৫ সালে গণিতে ছেলেদের গড় স্কোর ছিল ১১০ দশমিক ৪ ও মেয়েদের ছিল ১১০। তবে তৃতীয় শ্রেণীর ছেলেমেয়েদের অবস্থান সমান।

দেশের সাতটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের ওপরই জরিপটি চালানো হয়। এতে বিভাগভেদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতে দক্ষতায় তারতম্য দেখা যায়। জরিপের ফলাফল বলছে, তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতে দক্ষতায় সবচেয়ে এগিয়ে রাজশাহী বিভাগ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে সিলেট। পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও গণিত দক্ষতায় এগিয়ে রাজশাহী বিভাগ। এক্ষেত্রেও বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে সিলেট বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আমরা এমডিজি অর্জন করে খুব বেশি আত্মতুষ্টিতে ভুগছি। টেকসই উন্নয়নে আমাদের মনোযোগ কম। তাই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালুর পর শ্রেণীকক্ষভিত্তিক পঠনপাঠনের গুরুত্ব কমেছে। শ্রেণীভিত্তিক পাঠদানে শিক্ষকদের মধ্যেও দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলেও তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ কম। আর দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণেও অনেক শিক্ষার্থী যথাযথ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কার্টিসি: বণিক বার্তা।

Share.

Leave A Reply