৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪|৩ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯|২২ নভেম্বর, ২০১৭|বুধবার, বিকাল ৪:৪৬

লক্ষ্মীপুরের সেরা মেধাবীদের খোঁজে

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম: পর্দা উঠছে চতুর্থ মনোয়ার স্মৃতি আন্তঃস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও কর্মশালার। এ আয়োজনে অংশগ্রহণের জন্য জেলার সেরা মেধাবীদের খুঁজছে লক্ষ্মীপুর ডিবেট অ্যাসোসিয়েশন। আগামী ১১-১২ আগস্ট লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিতব্য এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আগ্রহীদের কাছ থেকে নাম আহ্বান করা হয়েছে। আগ্রহীরা স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন। লক্ষ্মীপুর সিদ্দিক টাওয়ারের চতুর্থ তলায় ডিবেট অ্যাসোসিয়েশন অফিস থেকেও রেজিস্ট্রেশন ফরম সংগ্রহ করা যাবে।

বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও কর্মশালার আহ্বায়ক লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বপন। পুরো আয়োজনের মডারেটর হিসেবে আছেন লক্ষ্মীপুর ডিবেট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ আবু সায়েম।

চতুর্থ মনোয়ার স্মৃতি আন্তঃস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজক সংগঠন যুক্তিবাদী তারুণ্যের মিলনমেলা লক্ষ্মীপুর ডিবেট অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি মাজেদ আজাদ বলেন, বিতর্ক নিয়ে আমাদের প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের। তৃণমূল থেকে গণতন্ত্রমনা, যুক্তিনির্ভর মানুষদের খুঁজে বের করা, তাদের বিকাশে কাজ করাই আমাদের লক্ষ্য। আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। একটি অংশগ্রহণমূলক, যুক্তিবাদী, অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য আমরা তাদের প্রস্তুত করতে চাই।

Munaowar Inter School Debate Competition 04

মাজেদ আজাদ বলেন, মনোয়ারের মতো স্কুলপড়ুয়া একজন শিশু উদার, অসাম্প্রদায়িক, গণতন্ত্রমনা ও যুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নকে ধারণ করতো। এমন স্বপ্নচারী শিশুদের নিয়ে আমরা কাজ করে যেতে চাই। তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার অংশীদার হতে চায় লক্ষ্মীপুর ডিবেট অ্যাসোসিয়েশন। আর তাই শৈশব থেকেই তাদের যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের এই প্রচেষ্টা।

মনোয়ার স্মৃতি আন্তঃস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও কর্মশালার প্রথম আসর অনুষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে। ক্ষুদে মেধাবী বিতার্কিক মোহাম্মদ মনোয়ার উদ্দিন-এর স্মরণে এই নামকরণ করা হয়। লক্ষ্মীপুরের ডিবেট অ্যাসোসিয়েশনের এই মেধাবী বিতার্কিক ২০০৪ সালের ৩০ নভেম্বর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
এক নজরে মোহাম্মদ মনোয়ার উদ্দিন
লক্ষ্মীপুরের মেধাবী মুখ, ক্ষুদে বিতার্কিক মোহাম্মদ মনোয়ার উদ্দিন শিবলু (১৯৯১-২০০৪)। সে ছিল লক্ষ্মীপুর ডিবেট অ্যাসোসিয়েশন-এর সবচেয়ে প্রতিভাবান বিতার্কিক। ২০০৪ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’তে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় বিতর্ক উৎসবে সে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখে। মৃত্যুর কিছুদিন আগেই বিটিভি’র স্কুল বিতর্কের জন্য তার নাম পাঠানো হয়।

স্কুলের নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সে বিভিন্ন রকমের বই, শিশু-কিশোর ম্যাগাজিন, গল্প, মনীষীদের জীবনী পড়তে পছন্দ করতো। ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় কবিতা লেখার প্রতি তার ব্যাপক ঝোঁক ছিল।

মোহাম্মদ মনোয়ার উদ্দিন

মোহাম্মদ মনোয়ার উদ্দিন

মনোয়ারের জন্ম ১৯৯১ সালের ২২ আগস্ট বৃহস্পতিবার। এদিন রাত ৮টা ৫ মিনিটে নানাবাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দত্তপাড়া ইউপি’র শ্রীরামপুর পাটওয়ারী বাড়িতে তার জন্ম। মনোয়ারের জন্মের পর কয়েক বছর তার নানাবাড়িতে কাটে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে দাদাবাড়ি সংলগ্ন বাঙ্গাখাঁ ২ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। এই বয়সেই সে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও ধর্মানুরাগের বহু উজ্জ্বল নিদর্শন স্থাপন করে।

১৯৯৬ সালে তারা সপরিবারে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সমতা কলোনীর বাসায় চলে আসে। মনোয়ার তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কাকলী স্কুলে পড়াশুনা করে। সেখানে তার অনন্য প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে অধ্যক্ষ তাকে ‘পণ্ডিত’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি তাকে এ নামেই ডাকতেন। ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় সে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করে।

২০০২ সালে সামাদ স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ১০০ নাম্বারের ভর্তি পরীক্ষায় ৯৯ নাম্বার পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে। পড়াশুনার বাইরে স্কুলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখে। অনন্য মেধাবী হওয়ায় স্কুলে অনেকেই তাকে বিদ্যাসাগর বলে ডাকতো।

ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় তার অসাধারণ সাফল্যে সেখানকার শিক্ষকরা তাকে স্কুলটিতে ভর্তি করানোর অনুরোধ করেন। বয়স কম হওয়ায় তার আম্মু সেখানে ভর্তি করাতে রাজি হননি। ক্যাডেট কলেজে লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও মেডিকেলে বাদ পড়ে।

মোহাম্মদ মনোয়ার উদ্দিন

মোহাম্মদ মনোয়ার উদ্দিন

মনোয়ার ছিল খুবই ধার্মিক একজন বালক। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতো। মাথায় টুপি এবং টাখনুর ওপর প্যান্ট পরা ছিল তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। সে দান করতে পছন্দ করতো। ক্লাস সেভেনে থাকাকালে লক্ষ্মপুর কালেক্টরেট মসজিদে জুমার নামাজের পর মসজিদের তহবিল সংগ্রহকালে সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ৫০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। একটা ছোট্ট বাচ্চার এমন প্রতিশ্রুতিতে উপস্থিত অনেকে অবাক হয়ে পড়েন। তৎকালীন জেলা প্রশাসক একেএম মাহবুবুল আলম কাছে ডেকে জানতে চান, ‘তুমি এতো টাকা কোথায় পাবা?’ মনোয়ার উত্তর দেয় আমার বৃত্তির টাকা আছে। ডিসি সাহেব খুশি হয়ে বলেন, তুমি সারাজীবন বৃত্তি পেতে থাকবা।

মনোয়ারের বাবা-মা দুজনই সরকারি চাকুরিজীবী। বাবা মোহাম্মদ মোছলেহ উদ্দিন পরিসংখ্যান কর্মকর্তা (সদ্য অবসরপ্রাপ্ত)। মা মিসেস সেতারা বেগম বাঙ্গাখাঁ ২ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তিন ভাইবোনের মধ্যে মনোয়ার ছিল সবার ছোট। বড় বোন নাঈমা জান্নাত ঢাকায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা পদে কর্মরত রয়েছেন। দ্বিতীয় বড় ভাই মুহাম্মদ মিছবাহ উদ্দিন পাটওয়ারী বাংলা ট্রিবিউনের সাব এডিটর।

২০০৪ সালে সামাদ স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। ছয় বিষয়ের দিন সমাজ বিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়ে বিকালে বাসায় ফিরে আসর নামাজ আদায় করে উঠানে ক্রিকেট খেলতে যায়। হঠাৎ করে বল পাশের বাউন্ডারি ওয়ালের বাইরে গেলে বল আনতে গিয়ে সেখানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ইন্তেকাল করে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজউন। তার একাধিক জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ্মীপুর সোনামিয়া ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত প্রথম জানাজায় মানুষের ঢল নামে। লক্ষ্মীপুরের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন মাহমুদ, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা তার জানাজায় অংশ নেন।

Share.

Leave A Reply