এই তো জীবন

সাদিয়া বিনতে শাহজাহান: আমার রুমের ড্রেসিং টেবিলটা ব্যালকনির খুব কাছাকাছি। বাইরের ধুলোবালির আস্তর জমে সহজেই। এই যে দেখুন না, সময়ই পাই না ধুলোগুলো মুছবার। এতো এতো কাজ সেরে বাসায় ফিরে টুকটাক কিছু খেয়ে ইচ্ছে করে গা এলিয়ে রাজ্যের ঘুম দেই। বই নিয়ে যে দুই-এক পাতা পড়ে সুখ নেবো সে সময়টাও নেই। আয়মান কতো আগে ওর লেখা বই দিয়ে বলেছিলো “আন্টি পড়ে জানাবেন কেমন হয়েছে।” অথচ কি হতভাগী আমি সময়ে কুলোতে পারছি না দুই এক পাতা পড়ার। সকাল সন্ধ্যে দৌড়োতে দৌড়োতে জাস্ট হাঁফিয়ে উঠি।

পুবের রুম থেকে ছোট ভাইটা আমার রুমে এসে গল্প করার জন্য হা-পিত্যেস করে। বাসার হাতের কাজ, টুকটাক পড়া শেষে যেই একটু হাত পা ছড়াবো বিছানায়, আব্বু এসে বলবে- “টুকি, আজ এটা হইছে, ওটা ভালো হয় নাই, কাল কি রান্না করবি? কাল কি ফ্রি আছিস?”

ঘুম ঘুম চোখ বাবাকে বলি “যাও ঘুমিয়ে পড়ো। কাল ভোরে উঠতে হবে, ক্লাস আছে। না হয় ক্লাসে বসে বসে তোমার মেয়ের ঘুমে কাহিল অবস্থা হবে, যাও তো!”

হ্যাঁ, সত্যি রোজ সকালের ক্লাসগুলোতে আমার সত্যি ঘুম পায়। তবুও পাথরের মুর্তির মতো স্যারে চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি, শুধু তাকিয়েই থাকি। কিছু কর্ণগোচর হয়, বাকিসব হাওয়ায় মিলিয়ে ভেসে বেড়ায় ক্লাস রুমের কোণায় কোণায়।

কলেজের খুব ভালো বান্ধবী ছিল টুম্পা। ক’দিন আগে বাসে দেখা। কি সুন্দর হাতে শাখা জোড়া। কপালে জ্বলজ্বল সিধুঁর আর টিপ পড়ে হা করে ঘুমিয়ে আছে। আমি পাশে বসে জাস্ট কানের কাছে গিয়ে জোরে বললাম, “কিরে তোর দু’টাকা দামের বরই আচার কই?” ও “এহ্” বলে বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো অনেকক্ষণ। কলেজের সময়ে ক্লাসে কোচিংয়ে, বাসে এমনকি দুই এক মিনিট যখনি সময় পেতো টুপ করে ঘুমাতো ও।

ক্লাসে সবাই যখন অর্থনীতির রাজপাঠে ব্যস্ত, ও তখন ঘুমের রাজ্যে হাবুডুবু খেতো! ঘুমকে এক পাশে রেখে বাকিসব কাজকে সে থোড়াই তোয়াক্কা করতো না। ওর হাতে অলটাইম দুটাকা দামের বড়ই আচারের প্যাকেট থাকতো। ও বলতো ওটা নাকি ওর ঘুম তাড়ানোর ওষুধ। বরই বিচি মুখে থাকলে নাকি ঘুম কম পায় একটু। আমারো ইদানিং ওর থিওরি অ্যাপ্লাই করতে ইচ্ছে করে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে খুব বড় একটা সময় কাটিয়েছি বন্ধু মনসুরের সঙ্গে।

ইদানীং ও চাকরি বাকরির তোড়জোড়ে আছে। সামনে বিয়েশাদি করবে বন্ধু আমার। এদিকে আমিও নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ভীষণ। সময় হয় না ওকে একটু ফোন করে খোঁজ নেওয়ার।

কলেজের ফ্রেন্ডরা তো অনেকেই লা-পাত্তা। এদিকে বাকি যারা কাছের মানুষ ছিলো যোগাযোগও ধীরে ধীরে কমছে। কাজিনরাও যে যার সংসার, পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও কিছুদিন থেকে বেশ ভালো সময় কাটছে সবার সাথে। মুরাদ ভাইয়ের বিয়ের রেশ এখনো কাটেনি। দাওয়াত এখানে ওখানে দেখা হওয়া এখনো জারি আছে।

তবুও এতো কিছুর ভীড়ে কিছু সময়, প্রিয় মুখ, মধুর সম্পর্কগুলোকে ভীষণ মনে পড়ে। একসময়ের কাছে থাকা মানুষগুলোর সাথে দুরত্ব বাড়ছে দ্রুত। নিজের হয়ে থাকা জায়গা গুলোও দ্রুত বদল হচ্ছে। নতুনে ভরপুর হচ্ছে নতুন জগত, সম্পর্কের মুগ্ধতা। একদিন যা আমার ছিলো তা এখনো আমার আছে বলার অধিকারটাও লোপ পাচ্ছে।

হায় জীবন!

তবুও মাঝে মাঝে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধোঁয়া উঠা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমি সময়কে ইউটার্ন করি। ফিরে যাই সোনালী সময়ে, সবচে সুন্দরে।

মাঝে মাঝে সময় করে খুব বেশি ইচ্ছে করে ধুয়ে মুছে সাফ করি ধুলোজমা ড্রেসিং টেবিল, শোপিছ, আমার বুক শেলফটা, শখের বইয়ে প্রিয় লেখকের নাম লেখা মলাট।

জীবনপথের পদচারণা গুলোতে আবার মুখরিত হতে আমারো ভীষণ ইচ্ছে করে। শরতের কাশফুল ছুঁয়ে উচ্ছাসে ভাসতে ইচ্ছে করে। সময় করে পাতায় পাতায় কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে। কোথাও যেন এক টুকরো দুঃখ ছুঁয়ে যায়। কারো জন্যে মনটা হু হু করে। ভীষণ!

Share.

Leave A Reply