৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪|২ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯|২২ নভেম্বর, ২০১৭|বুধবার, রাত ১:৩৯

সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় দৌলাতুন নাহারকে

নিজস্ব প্রতিবেদক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। এদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ৫টা ২২ মিনিটের দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিস্ফোরিত হয় ১৩টি গ্রেনেড। সৌভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও নিহত হন মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইভি রহমান-সহ ২৪ জন। গ্রেনেডের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হন কয়েকশ মানুষ। এদেরই একজন ঢাকা মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দৌলাতুন নাহার। সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

সেদিনের হামলায় হারিয়েছেন বাম চোখ আর ডান পা। দু্‌ই পায়ে বহু স্প্লিন্টারের দাগ আর ক্ষতচিহ্ন। শুধু পা নয় পুরো শরীর বিদ্ধ হয়েছে এমন অসংখ্য স্প্লিন্টারের আঘাতে। এক সময় রাজপথে গগনবিদারী স্লোগান তোলা এ নেত্রীর জীবন এখন দুর্বিষহ। স্বাভাবিক চলাফেরার শক্তি কেড়ে নিয়ে দুর্বৃত্তের ছোঁড়া গ্রেনেড।

মাঝে একবার অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথায় হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক অপারেশনে রাজি হচ্ছিলেন না। কারণ, পুরো শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার। অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে যদি কোনো বিপত্তি বাধে। পরে যা-ই ঘটুক দায় আমার—এমন নিশ্চয়তা পেয়ে অপারেশনে রাজি হন চিকিৎসক। এখনো শরীরে থাকা স্প্লিন্টারের ব্যাথায় ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। হাত, পা, পিঠ, মাথা সর্বত্র ব্যথা হয়। পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে পড়ে। প্রায় প্রতি রাতেই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে যতটা সম্ভব মায়ের পাশে থাকার চেষ্টা করেন কন্যা ফৌজিয়া মালেক নাতাশা। রাজপথ ছিল যার নিত্যসঙ্গী অনেকটা বাধ্য হয়ে তাকে এখন ঘরের মধ্যে বন্দী জীবন কাটাতে হচ্ছে। এ যেন জীবন নয়; নিদারুণ কষ্টে মৃত্যুর ক্ষণ গণনা মাত্র।

দু্‌ই পায়ে বহু স্প্লিন্টারের দাগ আর ক্ষতচিহ্ন।

দু্‌ই পায়ে বহু স্প্লিন্টারের দাগ আর ক্ষতচিহ্ন।

সেদিনের সমাবেশে আইভি রহমানের পাশেই ছিলেন দৌলাতুন নাহার। গ্রেনেডের স্প্লিন্টার বাম চোখে লাগার পরই তিনি আওয়ামী লীগ অফিসের সামনের ড্রেনে পড়ে যান। এ সময় আরেকটি আরেকটি স্প্লিন্টার তার ডান পায়ে গিয়ে লাগে। এরপর আর কিছু মনে নেই তার। ড্রেন থেকে তুলে কেউ একজন তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে লাশের সঙ্গে মর্গে ফেলে রাখা হয়েছিল তাঁকে। মর্গ থেকে খুঁজে বের করেন এক স্বজন। খবর পেয়ে আবদুর রাজ্জাক, আবদুল জলিল, সাবের হোসেন চৌধুরীসহ দলীয় নেতারা সেখানে তাকে দেখতে যান। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তারা তাকে পান্থপথের রেনাল হাসপাতালে ভর্তি করেন। তবে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় দলীয়ভাবে তাকে কলকাতার পেয়ারলেস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় মাসখানেক চিকিৎসার পর দেশে ফিরে আসেন। ওই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করায় নেত্রীর কাছে চিরকৃতজ্ঞ দৌলাতুন নাহার।

গ্রেনেড হামলার দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন অসংখ্য স্লিন্টার। হার্টের ব্লক নিয়েই ২০১৭ সালে এসেও অপারেশন করে পিঠ থেকে স্লিন্টার বের করা হয়েছে। ইউনাইটেড হসপাতালে এ খরচ বহন করতে হিমশিম খেতে হয়েছে পরিবারের সদস্যদের।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর ব্যক্তিগতভাবে তার খোঁজ-খবর নিয়েছেন শেখ হাসিনা। চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। তবে বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের পক্ষে তাকে দেশের বাইরে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর মতো অবস্থা নেই। তাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী যদি আর একটি বার উদ্যোগী হয়ে দৌলাতুন নাহারের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তাহলে হয়তো জীবনের বাকি দিনগুলোতে তার ব্যথা-যন্ত্রণা কিছুটা হলেও লাঘব হবে। হয়তো কিছুটা সুস্থ জীবন পাবেন এক সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করা এ আওয়ামী লীগ নেত্রী।

Share.

Leave A Reply