৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪|৩ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯|২২ নভেম্বর, ২০১৭|বুধবার, বিকাল ৪:৪২

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় যেভাবে বেঁচে যান শেখ হাসিনা

নিউজ ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম: ২১ আগস্ট, ২০০৪। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে শেখ হাসিনার সমাবেশ মঞ্চের তিন দিকে তিন ভাগ হয়ে অবস্থান নেন ১২ জন জঙ্গি। শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলনেতা জান্দাল মঞ্চের সামনে প্রথম গ্রেনেডটি ছোড়েন। ধারণা ছিল, বিস্ফোরণের পর মঞ্চের সামনের জায়গা ফাঁকা হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া জঙ্গি বুলবুল গিয়ে সরাসরি মঞ্চে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড ছুড়বেন। কিন্তু প্রথম গ্রেনেডটি বিস্ফোরণের পর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটা মানুষের ধাক্কায় পড়ে যান বুলবুল। উঠে আর গ্রেনেড ছোড়ার সুযোগ পাননি তিনি। এভাবেই প্রাণে বেঁচে যান মঞ্চে থাকা শেখ হাসিনা, সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও।

সিআইডির সাড়ে চার বছরের (২০০৭ থেকে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া পর্যন্ত) তদন্ত এবং বিভিন্ন সময়ে সিআইডির রিমান্ডে এবং আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামি মুফতি হান্নান, বুলবুল, জাহাঙ্গীর, বিপুলসহ বিভিন্ন জঙ্গির দেওয়া তথ্য থেকে হামলার এমন চিত্র পাওয়া যায়।

শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ওই ভয়াবহ আক্রমণে উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠী হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামির (হুজি-বি) ১২ সদস্য সরাসরি অংশ নেন।

মামলার অভিযোগপত্র, জঙ্গিদের জবানবন্দি ও তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাঠপর্যায়ে আক্রমণের নেতৃত্বে ছিলেন হুজির দুই কথিত কমান্ডার মুফতি আহসান উল্লাহ ওরফে কাজল (বাড়ি ফরিদপুর) ও মুফতি মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল (নড়াইল)। এ দুজন আগের দিন, অর্থাৎ ২০ আগস্ট ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এঁদের মধ্যে কাজল পরে ভারতে মারা গেছেন। আর জান্দাল কারাগারে আছেন।

২০০৫ সালের ১ অক্টোবর গ্রেপ্তারের পর মুফতি হান্নান টিএফআই (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলে মুফতি হান্নান যে জবানবন্দি দিয়েছেন তাতে বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২১ আগস্ট সকাল ১০টার মধ্যে হামলার জন্য নির্বাচিতরাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় হান্নানের আস্তানায় জড়ো হন। তাদের নিয়ে বৈঠক করেন মুফতি হান্নান, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে জাফর, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর বদর (ঢাকার দোহার), হাফেজ আবু তাহেরসহ আরও কয়েকজন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, তাঁরা একটি কক্ষে গোল হয়ে বসেন। মাওলানা আবু সাইদ ওরফে আবু জাফর ও মুফতি হান্নান আক্রমণে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের উদ্দেশে উদ্বুদ্ধকরণ বক্তব্য দেন। তাঁরা আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ইসলামের শত্রু আখ্যায়িত করেন। বক্তব্য শেষে হামলার নির্দেশনা দেন।

একপর্যায়ে আবু তাহের ও কাজল প্রস্তাব করেন, যাঁদের দাড়ি আছে তাঁদের হামলায় অংশ নেওয়া ঠিক হবে না। পরে আক্রমণের জন্য ১২ জনকে চূড়ান্ত করা হয়। তাঁদের ১৫টি আর্জেস গ্রেনেড দেওয়া হয়। প্রতি দলে চারজন করে তাঁদের তিনটি ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। জনতার ওপর আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল নেতা-কর্মীরা মঞ্চের দিকে গিয়ে শেখ হাসিনাকে বাঁচানোর চেষ্টা করার সুযোগ যেন না পান।

বাড্ডায় মুফতি হান্নানের আস্তানায় দুপুরের খাবার খেয়ে আক্রমণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যাঁর যাঁর মতো ঘটনাস্থলে রওনা হন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সবাই আসরের নামাজের আগে গোলাপ শাহ মাজার সংলগ্ন পার্কের কোনায় মসজিদে একত্র হন। সেখান থেকে সমাবেশমুখী আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিলের সঙ্গে মিশে ১২ জঙ্গি সমাবেশস্থলে গিয়ে হাজির হন।

বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ট্রাকের ওপর তৈরি সমাবেশ মঞ্চটি ছিল পশ্চিমমুখী। মঞ্চের সামনের দিকে দক্ষিণ পাশে পেট্রল পাম্পের মোড়ের কাছে অবস্থান নেয় জান্দাল, কাজল, বুলবুল ও লিটনের দলটি। সবুজ, জাহাঙ্গীর আলম, মাসুদ ও উজ্জ্বলের দ্বিতীয় দলটির অবস্থান ছিল মঞ্চের সামনের দিকে উত্তর পাশের ফুটপাত ঘেঁষে। আর তৃতীয় দলটির অবস্থান ছিল মঞ্চের পশ্চিম পাশে মোড়ের কাছে।

শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হতেই প্রথম গ্রেনেডটি ছোড়েন জান্দাল। এরপর জঙ্গিরা যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে গ্রেনেড ছুড়তে থাকেন। প্রথম গ্রেনেডের পর মঞ্চের সামনের জায়গা ফাঁকা হলে দ্বিতীয় গ্রেনেডটি মারার কথা ছিল বুলবুলের। কিন্তু মানুষের দিগ্‌বিদিক ছোটাছুটির মধ্যে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান বুলবুল। শেষ পর্যন্ত তিনি আর গ্রেনেড ছুড়তে পারেননি। পরে সেফটি পিন না খুলেই গ্রেনেড মাটিতে ফেলে পালিয়ে যান।

আসামি জাহাঙ্গীর আলম জবানবন্দিতে বলেছেন, ‘প্রথম গ্রেনেড হামলার পরপর তিনি মঞ্চের উত্তর পাশ থেকে সমবেত মানুষের ওপর একটি গ্রেনেড ছুড়ে মারেন। সঙ্গে সঙ্গে রক্তাক্ত মানুষের চিৎকার ও ব্যাপক হট্টগোল শুরু হলে তিনি ভড়কে যান। ফলে দ্বিতীয় গ্রেনেডটি না ছুড়ে তিনি জনতার সঙ্গে দৌড় দেন এবং গুলিস্তান হকার্স মার্কেটে গিয়ে সেখানকার টয়লেটের ঝুড়িতে বাকি গ্রেনেডটি ফেলে পালিয়ে যান। জাহাঙ্গীর সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, পালানোর পথ, কোথায় টয়লেট আছে—এসব আক্রমণের আগেই তাঁরা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

আসামি বুলবুল জবানবন্দিতে বলেন, তিনি জনতার সঙ্গে মিশে দৌড়ে গুলিস্তানের দিকে চলে যান। সেখান থেকে শহর এলাকার একটি বাসে চড়ে গাবতলী যান। গাবতলী থেকে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় নিজ বাড়িতে চলে যান ওই রাতেই।

আসামি আরিফ হাসান বলেছেন, তিনি দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছিলেন। একটি বিস্ফোরিত হয়েছে। তড়িঘড়ি করতে গিয়ে দ্বিতীয় গ্রেনেডটির সেফটি পিন না খুলেই নিক্ষেপ করেছিলেন। এরপর তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে দৌড়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন এবং নিউমার্কেটের কাছে গিয়ে মাওলানা তাজউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেন। তাজউদ্দিনের কাছ থেকে আট হাজার টাকা নিয়ে তিনি রাজশাহী চলে যান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি একটি ছাত্র মেসে গিয়ে আশ্রয় নেন আরিফ। তাজউদ্দিনই এই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন বলে জানান তিনি।

Share.

Leave A Reply