তবে কি ভাতের বদলে পোলাও খাব?

সঞ্জয় অধিকারী: ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটা কমবেশি আমাদের সবারই জানা। এই প্রবাদের একটা যৌক্তিক কারণও ছিল। আমাদের দেশে সেই প্রাচীনকাল থেকেই ভাত (ধান/চাল) ও মাছের প্রতুলতা ছিল। আর সে কারণেই হয়তো এ দুটোই বাঙালির প্রধান খাদ্যাভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই প্রবাদের ‘মান রক্ষা’ দায় হয়ে পড়েছে। কেননা, চালের দাম প্রতিনিয়ত যে হারে বেড়েই চলেছে, তাতে করে নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তেরও নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। প্রথম আলোর খবরে প্রকাশ, রাজধানীর বাজারে সরু চালের দাম কেজিপ্রতি ৬০ টাকার ওপরে উঠেছে, যা বছরের এ সময়ে সাধারণত ৫০ টাকার নিচে থাকে। এ ছাড়া মাঝারি ও মোটা চালের দামও বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা।

বন্যায় হাওরের ফসলহানি ও উৎপাদন কম হওয়ায় গত এপ্রিল থেকেই বাজারে চালের দাম বাড়তে থাকে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে ৫৫ শতাংশ আসে বোরো মৌসুমে। গত বোরো মৌসুমে হাওরে ফসলহানি ও বন্যায় উৎপাদন ২০ লাখ টন কম হয়েছে। তবে সেই ঘাটতি পুষিয়ে দিতে সরকারের তরফ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমদানি শুল্ক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা, বাকিতে ঋণপত্র খোলার সুযোগ দেওয়া এবং সরকারিভাবে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও লাগাম টানা যাচ্ছে না চালের দামে।

সরকারের একাধিক মন্ত্রী বারবার বলছেন, দেশে চালের কোনো ঘাটতি নেই। যথেষ্ট মজুত আছে। আরও আমদানি করা হচ্ছে। গুদামে বা বাজারে চালের সরবরাহেরও কমতি নেই। তাহলে কেন কমছে না চালের দাম?

Rice

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম চালের দাম বাড়ার জন্য ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমকে দায়ী করে বলেছেন, ‘চাল নিয়ে রাজনীতি চলছে, চাল নিয়ে সমস্ত দেশকে একটা বিভ্রাটের মধ্যে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে চাল নিয়ে চালবাজি হচ্ছে, চাল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।’ বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও বলেছেন, একদল অসাধু ব্যবসায়ী সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চালের বাজার অস্থিতিশীল করছেন। সরকারের দুজন মন্ত্রী যখন একই কথা বললেন, তখন নিশ্চয়ই তাঁদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে, কারা এই কারসাজির সঙ্গে জড়িত। তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? তবে কি সরষের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভূত?

চালের অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তবে কুষ্টিয়ায় একজন চালকল মালিককে দণ্ড দেওয়া ছাড়া আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি চোখে পড়েনি। কোনো এক অদৃশ্য শক্তির বলে বহাল তবিয়তেই রয়েছেন মজুতদার সুবিধাভোগীরা। আর ‘মূল্যবৃদ্ধির দুষ্টু চক্রে’ পিষ্ট হচ্ছে জনগণ।

ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম। ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং তার অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশে খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিল। তখন একজন ইংরেজ ভদ্রমহিলাকে তাঁর একজন বন্ধু বলেন, বাংলাদেশের মানুষ খুব কষ্টে আছে। তারা ভাত খেতে পাচ্ছে না। এ কথা শুনে ওই ভদ্রমহিলা জবাব দেন, ভাত না পেলে পোলাও খেলেই তো পারে।’ বর্তমানে সাধারণ চালের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে করে পোলাওয়ের চালের দামের কাছে যেতে হয়তো আর বেশি দেরি নেই। তবে কি আমরা সত্যিই ভাতের বদলে পোলাও খাব?

বিভাগ:কলাম
Share.

Leave A Reply