৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪|২ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯|২২ নভেম্বর, ২০১৭|বুধবার, রাত ১:৩৩

যে কারণে জনপ্রিয় হচ্ছে অবৈধ বিটকয়েন

বিজনেস ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম: বাংলাদেশে বিটকয়েন নিষিদ্ধ হলেও বাইরের অনেক প্রতিষ্ঠান এ ভার্চুয়াল মুদ্রায় পেমেন্ট নিয়ে থাকে। তাই অনলাইনে বিটকয়েন আয়ের সুযোগ খুঁজতে থাকেন ফ্রিল্যান্সার আবু আবদুল্লাহ। সুযোগটি পেয়েও যান। ২০১৭ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তিনি বিটকয়েনে আয় করেছেন ১৫০ ডলারের মতো। এটি দিয়ে এখন ডোমেইন ও হোস্টিং কেনার কথা ভাবছেন এ ফ্রিল্যান্সার।

ভার্চুয়াল এ মুদ্রা লেনদেনে পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ থাকায় অস্ত্র ও মাদক ছাড়াও অবৈধ নানা পণ্য কিনতে ব্যবহার হচ্ছে এটি। এমনকি যারা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার নজরদারির বাইরে থেকে লেনদেনে আগ্রহী, এমন অনেকেই বেছে নিয়েছেন বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগটি। বাংলাদেশেও ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ ভার্চুয়াল মুদ্রা। আর এর লেনদেনের সঙ্গে জড়িতদের বড় অংশই ফ্রিল্যান্সার।

আগ্রহী বেশকিছু ব্যক্তি বিটকয়েনের বৈধতা পেতে ২০১৪ সালে উদ্যোগও নেন। এর অংশ হিসেবে ওই সময় তারা বেশকিছু ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিষয়টি অবগত হওয়ার পর একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর একটি সতর্কতামূলক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিটকয়েন কোনো দেশের ইস্যুকৃত বৈধ মুদ্রা নয়। বিটকয়েন বা বিটকয়েনের মতো কিংবা অন্য কোনো কৃত্রিম মুদ্রায় লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাংলাদেশ সরকারের কোনো সংস্থা দ্বারা স্বীকৃত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনবহির্ভূত এসব লেনদেন বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিজ্ঞপ্তির পর দেশে বিটকয়েন চালুর উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, এর আগে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ ধরনের কৃত্রিম মুদ্রা লেনদেনের বিষয়ে সতর্ক থাকার বিষয়ে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এটি কোনো দেশের বৈধ মুদ্রা নয়। ফলে আইন অনুযায়ী এমন মুদ্রা লেনদেনও বৈধ নয়।

বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই বিভিন্ন গেটওয়ে পেমেন্ট প্রসেস হিসেবে ওয়েবসাইটে বিটকয়েন পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে এটি স্বল্প সময়ে জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। এর মাধ্যমে যেকোনো স্থানে অর্থ পরিশোধ, বিল প্রদান, বেতন-বোনাস দেয়া যায়। সেলফোন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা এটিএমে বিটকয়েন ট্রান্সফার করা সম্ভব। এছাড়া বিটকয়েন মার্কেটেও এটি বিক্রি করতে পারেন ব্যবহারকারী।

বিটকয়েনের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ব্যবহারকারীর পরিচয়ের নিরাপত্তা। কারণ বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের পরিচয় প্রকাশ হয় না। ডিজিটাল এ কারেন্সি তৈরি হয় এনক্রিপশন পদ্ধতির মাধ্যমে। বিটকয়েন তৈরির এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় মাইনিং। মূলত মাইনিংয়ের কাজটি করেন কম্পিউটার প্রোগ্রামাররা।

বিটকয়েন কোনো দেশের বৈধ বা আনুষ্ঠানিক মুদ্রা না হলেও ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে এটি চলছে। বিশেষত জুয়ার অর্থ পরিশোধ, মাদক ও অস্ত্র কেনাবেচা এবং অর্থ পাচারের কাজে বিটকয়েন সবচেয়ে জনপ্রিয়। অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন গেমের ক্ষেত্রে বিটকয়েন প্রচলিত। অনলাইন গেমিং বা অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে বিটকয়েন ব্যবহার হয়। দেশেও কিশোর-তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিটকয়েন। তবে দেশে এ ধরনের মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় তা ব্যবহার হচ্ছে বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনে। অনলাইনভিত্তিক গেমের জয়-পরাজয়ে বিটকয়েনের লেনদেন করছে তারা। এমনকি বিটকয়েন থেকে ডলার বা টাকায় রূপান্তরের জন্য বেশকিছু প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রামেও এমন বেশকিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশে বিটকয়েনের ব্যবহার ও লেনদেন নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ। তিনি বলেন, বিটকয়েনের মতো ডিজিটাল মুদ্রার প্রচলন রয়েছে বিভিন্ন দেশে। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের মুদ্রা বিনিময় বৈধ নয়।

দেশে অবৈধ হলেও বিটকয়েনের লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত তারেক জামান (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, বিটকয়েন ডলার কিংবা টাকায় রূপান্তর করা হচ্ছে। অনলাইনে যোগাযোগ করে যে কেউ তাদের কাছ থেকে বিটকয়েন বিনিময় করতে পারেন। এক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে কমিশন নেন তারা। আর বিক্রেতার কাছ থেকে নেয়া বিটকয়েন পরবর্তীতে অনলাইনেই বিদেশী মার্কেট প্লেসগুলোয় বিক্রি করা হয়।

দেশে বিটকয়েনে লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত এ ধরনের কয়েকটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়া অনলাইনভিত্তিক একাধিক সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানকে নজরদারির মধ্যে রেখেছে তারা।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মুখপাত্র ও অর্গানাইজ ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্যা নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, বিটকয়েনের ব্যবহার দেশে পুরোপুরিই অবৈধ। তবে বেশ কয়েকটি চক্র বিটকয়েনের ব্যবসা করছে। এরই মধ্যে এমন একটি চক্রের সন্ধানও পাওয়া গেছে। কিন্তু এ লেনদেন ভার্চুয়ালি হয়ে থাকে। ফলে তাদের শনাক্ত করাটা একটু কঠিন। তাছাড়া অস্ত্র, মাদক, এমনকি সন্ত্রাসী অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বিটকয়েনের ব্যবহার ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

বিটকয়েন হলো এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা, যা লেনদেন হয় ওপেন সোর্স ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রটোকলের মাধ্যমে। এটির লেনদেনের জন্য কোনো ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। সাতোশি নাকামোতো নাম দিয়ে অজ্ঞাতসংখ্যক ব্যক্তি ২০০৮ সালে এটি উদ্ভাবন করেন। বিটকয়েন লেনদেন হয় গ্রাহক থেকে গ্রাহকের (পিটুপি) ডিভাইসে। বিটকয়েনের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় অনলাইনে একটি উন্মুক্ত সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে অথবা কোনো ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। এটি তৈরি হয় অনলাইনেই, আর ব্যবহারও হয় অনলাইনেই।

বিটকয়েন অ্যাকাউন্ট তৈরিতে প্রথমে ব্যবহারকারীর একটি বিটকয়েন অ্যাড্রেস তৈরি করতে হয়। সাধারণত এ অ্যাড্রেস ৩৪ সংখ্যার হয়। নিরাপত্তার কারণেই এ দীর্ঘ সংখ্যা ব্যবহার করা হয়। এটিকে বিটকয়েন গেটওয়ে পেমেন্ট প্রসেস বলা হয়। যেখান থেকেই বিটকয়েন আয় করা হোক না কেন, তা এ অ্যাড্রেসে যুক্ত হবে। পরবর্তীতে ব্যবহারকারী তার সুবিধাজনক সময় ও কাজে এখান থেকে বিটকয়েন লেনদেন করতে পারেন।

বিটকয়েনের সংখ্যা নিয়মিত বাড়লেও তা একটি নির্দিষ্টসংখ্যক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২১৪০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে সর্বোচ্চ ২ কোটি ১০ লাখে। ফলে লেনদেনের হদিস রাখতে না চাওয়া কারবারিদের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনে বিটকয়েনের দাম ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে একটি বিটকয়েনের মূল্য ৫ হাজার ৭৩৫ ডলার (৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৫ টাকা, ৮১ টাকা ডলারের মূল্যমান ধরে)। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটির বিনিময় হার ছিল ১৮ দশমিক ২৪ ডলার। একই বছরের এপ্রিলে তা বেড়ে ১৫৫ দশমিক ৪২ ও নভেম্বরে ১ হাজার ১০৪ ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বিটকয়েনের মূল্য ১৮৯ ডলারে নেমে যায়। তবে এর পর থেকেই তা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। চলতি বছরের জুনে প্রতিটি বিটকয়েনের বিনিময় মূল্য ছিল ২ হাজার ৯৫৬ ডলার, সেপ্টেম্বরে তা ৪ হাজার ৯১১ ডলারে বেড়ে দাঁড়ায়। ২১ অক্টোবর এটি সর্বোচ্চ ৬ হাজার ১৯ ডলারে গিয়ে ঠেকে।

বিটকয়েনের মূল্য ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় অনেকেই এটিকে বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। এক্ষেত্রে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থও বিটকয়েনে বিনিয়োগ করছেন তাদের কেউ কেউ। সিটিও ফোরাম সভাপতি তপন কান্তি সরকার বলেন, সারা বিশ্বে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও এটি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বিটকয়েন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ দুটো দিকই রয়েছে। দেশে ই-কমার্স জনপ্রিয় করতে এ ধরনের মুদ্রা ব্যবস্থা ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি অবৈধ কাজেও এটি ব্যবহার হতে পারে।

জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় বিটকয়েনের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রা ব্যবহারের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে বিশ্বের অনেক দেশই। এটির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখারও উদ্যোগ নিয়েছে দেশগুলো। বিটকয়েনে লেনদেনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা। এক্ষেত্রে জালিয়াতি ও প্রতারণারও সুযোগ রয়েছে। কারণ বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেনের তথ্য খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির আগে ভার্চুয়াল মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে এসব দেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কার্টিসি: সুমন আফসার, বণিক বার্তা।

Share.

Leave A Reply