৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪|২৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯|১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭|বৃহস্পতিবার, রাত ১২:৪০

জেরুজালেম: রাজনীতির স্বীকৃতি

মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান: বাস্তব জীবনে মানুক আর নাই মানুক এখনো পৃথিবীতে বিশ্বাসীদের কাছে দিনশেষে ধর্ম সবচেয়ে বড় অনুভূতির জায়গা। একটা সমাজ ও রাষ্ট্রকে বুঝতে হলে আপনাকে এই জায়গাটা বুঝতে হবে। আপনি ধর্মে বিশ্বাস করেন বা না করেন, ধর্মের আবেগ আপনাকে স্পর্শ করুক বা নাই করুক যখন সমাজ নিয়ে আপনি মন্তব্য করবেন তখন আপনাকে সমাজের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানকে মাথায় রেখেই কথা বলতে হবে।

আমার মূল ফোকাসের বিষয় হচ্ছে, কিভাবে এই ধর্মীয় অনুভূতি সহিংসতায় রূপ নেয় বা ধর্মীয় মৌলবাদের জন্ম হয়। ব্যক্তি নিজ থেকেই ধর্মীয় অনুভূতির কারণে সহিংস হয় নাকি অন্য কোন কিছু তাকে সহিংসতায় ধাবিত করে বা সহিংস হিসেবে নির্মাণ করে দেয়! যদি অন্য কিছু এই অনুভূতিটাকে ব্যবহার করে সহিংস হিসেবে নির্মাণ করে তাহলে সেটি কি?

মানুষ কেন সহিংস হয়! সে তো জন্ম থেকেই সহিংসতা ধারণ করে বড় হয় না। মানুষ ধর্মের অনুভূতির মধ্যে আবর্তিত হয়ে সহিংস তখনই হয়; যখন সেখানে ক্ষমতার চর্চার বিষয়টি জড়িয়ে পড়ে। যখন সেখানে রাজনীতি বড় হয়ে উঠে। ক্ষমতা গ্রহণ এবং প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সুপিরিয়র, ইনপেরিয়রের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

আমাদের ‘সুশীল সমাজ’ (যদিও এসব সুশীল, কুশীল জাতপাতে আমি বিশ্বাস করি না) সবসময় ধর্মীয় মৌলবাদের জন্য ধর্মীয় অনুভূতিকে মূল কেন্দ্রে রেখে দোষী সাব্যস্ত করে নিজের জ্ঞান জাহির করেন। পশ্চিমের বুলি দিয়েই মুখে ফেনা তোলেন। এর মধ্য দিয়ে তারা পশ্চিমা আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে এসবে আমার এক আনাও আস্থা নেই। তারা শিকড়ে হাত দিতে চান না। কারণ সেখানে হাত দিলেই যে নিজের জামা কাপড় খসে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে।আপনিও যদি এসব সুশীল বক্তব্যে বিশ্বাস করে গদগদ করতে থাকেন তাহলে আমার এই লেখা আপনার জন্য নয়।

‘সুশীলরা’ রঙ্গিন চশমা দিয়ে ধর্মীয় মৌলবাদকে যেভাবে ধর্মের জায়গা থেকে দেখেন আমরা সেভাবে দেখি না। আমরা ধর্মীয় মৌলবাদকে দেখি ‘রাজনৈতিক মৌলবাদের’ সাব কম্পোনেন্ট (উপ-উপাদান) হিসেবে। যেটা আগাগোড়া পুরোটাই রাজনৈতিক মৌলবাদের হাতে তৈরি একটা পারমাণবিক অস্ত্র। সেখানে অনুভূতিটাকে সামনে রাখা হয় একটা লেবাসের ট্যাগ দেওয়ার জন্য। এই ধর্মীয় মৌলবাদ একটা রাজনৈতিক নির্মাণ। যেটা দিয়ে খুব সহজে আপনাকে ধরা যাবে, খাওয়া যাবে, ধ্বংস করা যাবে, নারী-শিশু হত্যা করা যাবে, জ্বালানো-পোড়ানো যাবে, মানবাধিকারের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে নরকে পাঠানো যাবে বৈধভাবে।

আল কায়েদা বানালো কারা? সেই আল কায়েদা দিয়ে কাদের ধ্বংস করা হলো? আইএস বানালো কারা? সেই আইএস’কে ব্যবহার করে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো?

লাখ লাখ ইহুদিদের হত্যা করলো কারা? কারা তাদের আশ্রয় দিলো? ইরাক ধ্বংস করলো কারা? ইরাকিদের কি মানবাধিকার নেই? সিরিয়ার নারী-শিশুদের কি মানবাধিকার নেই? সৌদি-ইরান মতানৈক্য কাদের স্বার্থে? মিসরে সেনা অভ্যুত্থান ঘটালো কারা? কারা সেই অভ্যুত্থানে সমর্থন দিলো? সৌদি রাজপরিবারে বিদ্রোহ কি নিয়ে? সৌদি আমেরিকা ও ইজরাইলের দালালি করে কাদের স্বার্থে? ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিতে আপত্তি কাদের? কাশ্মীরের মানুষ রাস্তায় মার খায় কেন? এসব প্রশ্ন আপনাকে বুঝতে হবে। এসবের প্রেক্ষাপট আপনাকে বিবেচনায় আনতে হবে।

একটা মানুষ কখন সহিংস হয়? কেন হয়? কে তাকে সহিংস হতে বাধ্য করে? কে তার এই পরিচয় নির্মাণ করছে তা আপনাকে দেখতে হবে।

আপনি কারো ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেবেন। বোমা মেরে, গুলি করে নিরপরাধ মানুষের শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবেন। শিশুর রক্তে মাকে গোসল করাবেন। মৃত মানুষটাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধর্ষণ করবেন! এতোকিছুর পর আবার মানবাধিকারের গল্পও শুনাবেন! তা কি করে হয়! আবার দিনশেষে আপনিই ঠিক করে দেবেন আমি কে? কি আমার পরিচয়?

এসব প্রশ্নের উত্তর সুশীলদের ধর্মের চশমা দিয়ে দেখলে যে লাউ সেই কদুই পাবেন। আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয় কিন্তু ধর্ম দ্বারা পরিচালিত হয় না। রাষ্ট্র দিনশেষে তার রাজনৈতিক চোখ দিয়েই সব দেখে, সব বুঝে, সব খেলা খেলে। এখানে রিলেশনই সর্বেসর্বা।

জেরুজালেম তো শুধু মুসলমানদের পবিত্র জায়গা না। এটা একইসঙ্গে খ্রিস্টান ও ইহুদিদেরও পবিত্র স্থান। তাহলে বাইবেলে হাত রেখে শপথ নেওয়া ট্রাম্প এত কোটি কোটি মানুষের আবেগ, যুক্তির বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক প্রায় সব শক্তির বিরোধিতার তোয়াক্কা না করে কেন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিল? যারা বিরোধিতা করছেন, তারা কেন বিরোধিতা করছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি আপনি না বুঝেন তাইলে আইএস, আল কায়েদাকে আপনার ধর্মীয় মৌলবাদের অংশই মনে হবে।ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনেও আপনি ধর্মীয় মৌলবাদের গন্ধ পাবেন।

অনেকেই বলেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ খুব আসন্ন। আমি তো খুব মনেপ্রাণে চাই সেই যুদ্ধটা পারলে কালকেই শুরু হোক। আগের চাইতে আরো ভয়ঙ্করভাবে হোক। বোমার আঘাত থেকে যেন এক টুকরো মাটিও বাদ না যায়। তারপর যদি বেঁচে থাকি তাহলে অন্তত এ সমস্ত পশ্চিমা মানবাধিকারের দ্বারা ধর্ষিত হইতে হইতে মরতে হবে না। আমি কি করবো, কি করবো না; সেই সিদ্ধান্ত আরেকজনের কাছ থেকে নিতে হবে না। আমি সহিষ্ণু নাকি মৌলবাদী; সেই সার্টিফিকেট আরেকজনের কাছ থেকে পেতে হবে না। আমি কে, কি আমার পরিচয় এসব আরেকজন নির্মাণ করে দেবে না।

আজ আমেরিকার স্বীকৃতি প্রত্যক্ষ করে যারা আশ্চর্য হয়েছেন আমি তাদের দেখে আশ্চর্য হয়েছি। আমার কাছে এতোদিন স্বীকৃতি না দেওয়াটাই বরং আশ্চর্যজনক ছিল। আপনি তো এই স্বীকৃতি দেওয়া, না দেওয়াকে ধর্মের জায়গা থেকে দেখেছেন। সেজন্য আশ্চর্য হয়েছেন। যদি রাজনীতির জায়গা থেকে দেখতেন তাহলে দুইয়ে দুইয়ে চার ঠিকই মিলে যেত। এটাই হচ্ছে অনুভূতির সঙ্গে রাজনীতির পার্থক্য।

মূল বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের ‘ধর্মীয় মৌলবাদের’ যে আফিম পশ্চিমারা গেলাচ্ছে তাকে বুঝতে হবে ‘রাজনৈতিক মৌলবাদের’ মধ্য দিয়ে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই প্রথমে রাজনৈতিক মৌলবাদের শিকড় বুঝতে হবে। এই শিকড়ের উৎপত্তি কোথায়? কারা এই শিকড়ের প্রভু? তাদের উদ্দেশ্য কী? এসব বিষয় বুঝতে হবে। বিদ্যমান এই ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। এই রাজনৈতিক মৌলবাদকে নিজের শ্রম, ঘাম, রক্ত, কালিসহ সর্বশক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। এই রাজনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে হবে। নতুবা যেই লাউ সেই কদুই রবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Share.

Leave A Reply