৬ আশ্বিন, ১৪২৫|১০ মুহাররম, ১৪৪০|২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮|শুক্রবার, দুপুর ১:৪৫

১৪ ডিসেম্বর: বুদ্ধিজীবীদের একাল-সেকাল

মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান: এই দেশের জন্ম হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। তবে এর আগেই এই দেশের ওপর হত্যাচেষ্টা চালানো হয় একই বছরের ১০-১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মধ্য দিয়ে। যাদের হাত ধরে আমাদের সামনে তাকানোর কথা; তাদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন আমরা শুধু জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরই হারাইনি। একইসঙ্গে দাফন করা হয়েছে মেধা,বিবেকবোধ, বুদ্ধিসম্পূর্ণ একটা জাতিকে। জন্ম হয়েছে চাটুকার, বিশ্বাসঘাতক, অকালকুষ্মাণ্ড এক জাতির।

যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে জানে না, সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখে না। যারা দাসত্বের শৃঙ্খলে বিকিয়ে দিয়েছে নিজেদের মেধা, মন, মনুষ্যত্বকে। যাদের দলমত নির্বিশেষে একটা সোনার বাংলা গড়ে তোলার হিম্মত নেই। যারা ড. সিজার, সাংবাদিক উৎপল দাস, অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারদের নিরাপত্তা দিতে পারে না।

৭১-এর যে বুদ্ধিজীবীরা হারিয়ে গেছেন তারা আর ফিরে আসেনি এই দেশে। এখন আর আমাদের দেশে সে অর্থে বুদ্ধিজীবী নেই। আছেন বুদ্ধিকে জীবিকা হিসেবে নিয়েছেন। তারা এটি বিক্রি করেন রাজনীতিবিদদের কাছে।

স্বাধীন দেশে শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, আইনজীবীসহ মেধাবীদের গুম-খুনের শুরুটা হয়েছিল জহির রায়হানকে দিয়ে ১৯৭২ সালের ৩০ই জানুয়ারি। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দিন যত গেছে সংখ্যা আর সংশয় তত বেড়েছে।

ইত্তেফাক ৩০ এপ্রিল ২০১৪-তে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত ১২ বছরে ১০ হাজার ১৬১ জন অপহরণ ও নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে ৩০০ জনের লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে দুই হাজার ৫০০ জন। সাত হাজার নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তিন হাজার অপহরণকারী ধরা পড়েছে।

আইজিপি বলেছেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই গুম, খুন ছিল। এটা বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়।

এই দেশে এখন অন্যায় জিনিসটা ন্যায় হয়ে গেছে। এসবে এখন আর কেউ অবাক হয় না। সবাই ধরেই নিয়েছে এসবই তো হওয়ার কথা। এতে কোনও দোষ নেই, অপরাধ নেই, ভুল নেই।

রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে বিচারবহির্ভূত গুম, খুনের যে ধারা বিএনপি-জামায়াত প্রতিষ্ঠা করেছিল তার ভয়ঙ্কর রুপ আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি। প্রশাসনের একচ্ছত্র আধিপত্য, দুর্নীতি আর কালো টাকার রোষানলে শুধু সাধারণ মানুষ বলি হচ্ছেন তা নয়; ক্ষমতাসীনরাও এ থেকে নিস্তার পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও দলীয় কোন্দলের শিকার হয়ে সরকারদলীয় সমর্থকরাও ক্রসফায়ার, গুম-খুনের বলি হচ্ছেন।

প্রতিবারই প্রশাসন একই গল্প মিডিয়ার সামনে নির্লজ্জভাবে বলে যাচ্ছে। যতগুলো মানুষকে ক্রসফায়ার, গুম-খুন করা হচ্ছে তাদের মধ্যে অধিকাংশের পরিবারের অভিযোগ, ডিবি পুলিশ, র‍্যাব পরিচয়ে কাউকে ১৫ দিন, কাউকে এক মাস, কাউকে দুই মাস আগে বাড়ি থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। তারা থানায় গিয়ে দিনের পর দিন ভিখারির মতো ধরণা দিয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদেরকে বলার মত উল্লেখযোগ্য কোন সহযোগিতা করেনি।

কেউ যদি অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে তার জন্য আইন আছে। তাকে গ্রেফতার করে যতদিন প্রয়োজন নিজেদের হেফাজতে রেখে তথ্য সংগ্রহ করুন। তারপর আদালতে সোপর্দ করুন। তাকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ দিন। অপরাধী হলে তা প্রমাণ করে যথাযথ সাজা দিন। কিন্তু কোনও প্রমাণ ছাড়া বিচারবহির্ভূতভাবে মানুষকে ক্রসফায়ারে দেওয়া কিংবা গুম-খুনের অধিকার জনগণ রাষ্ট্রকে দেয়নি।

রাষ্ট্রযন্ত্র যদি এর সাথে জড়িত না থাকে তাহলে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে এসব অপরাধে জড়িতদের খুঁজে বের করা। আপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এসব এখন এদেশে অলীক স্বপ্ন।

ক্রসফায়ার, গুম, খুনের পর পরিবার হেনস্থা হওয়ার ভয়ে স্বজনের লাশ পর্যন্ত গ্রহণ করতে যায় না। এভাবে করে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এই সংস্কৃতি যদি চলতে থাকে, রাষ্ট্রের প্রতি যদি মানুষের বিশ্বাস না থাকে, সরকার যদি জনগণের নিরাপত্তা দিতে না পারে তাহলে মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অসৎ উপায় অবলম্বনের প্রতি ঝুঁকে পড়বে।

এসব নিয়ে আমাদের শিক্ষাবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিকসহ নামে বেনামের বুদ্ধিজীবীদের বলার মতো কোনও সাড়াশব্দ আছে বলে আমার জানা নেই। তাদের কলমের কালি এসব নিয়ে খরচ হয় না। তাদের কণ্ঠস্বর থেকে এসব নিয়ে শব্দ বের হয় না। তোষামোদ, চাটুকারিতা করেই জীবনের সিংহভাগ সময় তারা কাটিয়ে দেন। এদেশে যারা বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত তাদের সিংহভাগকে দিয়ে দেশের ১০ পয়সার উপকার হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

দেশে এখন ২৫ মার্চ, ১৪ ডিসেম্বর, ১৬ ডিসেম্বর পালিত হয় বেশ আড়ম্বরের সঙ্গে। হৈ হুল্লোড় করে কাঙ্গালিভোজের মধ্য দিয়ে। সেই টাকাও আবার নিজেদের পকেটের নয়। জনগণের পকেট থেকে জোর করে নেওয়া। এমন দেশে কোন মুখে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস নিয়ে আমরা গর্ব করি! কোন মুখে বুদ্ধিজীবী চত্বরে ফুলের মালা নিয়ে হাসতে হাসতে ছবি তুলি! কোন মুখে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস নিয়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে আলোচনা করি! এসবের উত্তর আমার জানা নেই। আমার কাছে মনে হয়, শহীদদের আত্মারা আমাদের এসব লোকদেখানো দৃশ্য দেখে লজ্জায় মুখ লুকায়। তারা হয়তো বিদ্রূপ করছে আমাদের নিয়ে। ভর্ৎসনা করছে এদেশের বুদ্ধিজীবীদের।

লেখক: শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিভাগ:কলাম
Share.

Leave A Reply