প্রশ্নফাঁস যখন গলার ফাঁস

মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান: আমাদের শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ সাহেবকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। তিনি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য, প্রগতির জন্য, বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের জন্য যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন তা বাংলাদেশ তো বটেই সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ইতোপূর্বে এতো সুন্দর ও সুনিপুণভাবে কোনো জাতি তার মেরুদণ্ড ভাঙ্গতে পারেনি। শুনেছি শিক্ষা ক্ষেত্রে এই অসামান্য অবদান এবং সামাজিক পরিবর্তনে ইতিবাচক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গত ১ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ‘ওয়ার্ল্ড এডুকেশনাল কংগ্রেস অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করেছেন তিনি। আশা করছি, তার এই জয়যাত্রা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

এবার কিছু তিক্ত সত্য কথা বলি। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নুরুল ইসলাম নাহিদকে এককভাবে দোষারোপ করে সবাই যেভাবে আনন্দের ঢেঁকুর তুলছেন তাতে খুব গর্বের কিছু আছে বলে আমার অন্তত মনে হয় না। এমন নয় যে, নুরুল ইসলাম নাহিদ সাহেব ইচ্ছে করেই প্রতিদিন পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্ন ফাঁস করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আমাদের বুঝতে হবে, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো বিষয়টি একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হয়। সেই প্রক্রিয়াতে অনেকগুলো মানুষ সম্পৃক্ত। এই সম্পৃক্ত মানুষদের মধ্য থেকেই কেউ না কেউ প্রশ্ন ফাঁস করে দিচ্ছে। নাহিদ সাহেব পদত্যাগ করলেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে না।

আমি তিনটি বিষয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। এক, প্রশ্নপত্র কেন ফাঁস হচ্ছে। দুই, এর প্রভাব কিভাবে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের গ্রাস করছে। তিন, আমাদের করণীয় কোথায়।

প্রথমেই আসি কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে? যারা ফাঁস করছে তাদের লাভ টা কোথায়? এক্ষেত্রে মোটা দাগে দুটো বিষয়কে আমরা এখানে দেখতে পারি। প্রথমত, রাজনৈতিকভাবে সরকারকে জনগণের সামনে বিব্রত করা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিকভাবে বিশাল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। আমাদের মত অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে “ক্ষমতা” হচ্ছে সবচেয়ে চমকপ্রদ বস্তু। ক্ষমতার জন্য আমরা সব করতে পারি। নিজের ঘরে আগুন দিয়ে প্রতিবেশীকে মামলায় ফাঁসানোর ইতিহাস আমাদের সমাজে খুব বেশি বিরল নয়। শিক্ষা হচ্ছে একটি জাতির মৌলিক চাহিদা। আপনি যখন শিক্ষার মত একটি মৌলিক চাহিদাকে পঙ্গু করে দিবেন তখন তার প্রভাব খুব সহজেই সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে প্রতীয়মান হবে। যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করছে তারা পুঁচকে চোর এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এরা সংঘবদ্ধ একটা গোষ্ঠী, যারা অত্যন্ত ধুরন্ধর, শক্তিশালী এবং সক্রিয়।

আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন, সরকার অপরাধীদের কেন ধরতে পারছে না? অপরাধীদের ধরতে না পারাটা কি সরকারের ব্যর্থতা নয়? হুম, অবশ্যই সরকারের ব্যর্থতা। আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, বাঙ্গালির লজ্জা শরম পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বিচিত্র এক বস্তু। সত্য স্বীকার করতে আমাদের লজ্জা হলেও মিথ্যার কাব্য রচনা করতে আমাদের একটুও লজ্জা হয় না। প্রতিবারই প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর শিক্ষামন্ত্রী সহ সংশ্লিষ্ট সবাই যেভাবে নির্লজ্জ মিথ্যাচার করেন তা দেখে সম্ভবত স্বয়ং শয়তানও বিবৃত হন। যা দেখে যেকোন মানুষ সরকারের ক্ষমতা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন।

দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে টাকায় নাকি বাঘের দুধও পাওয়া যায়। প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি যারাই করুক না কেন তারা যে সরকার সংশ্লিষ্ট একটি শক্তির ছত্রছায়ায় বিশাল অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ের স্বার্থে সম্পৃক্ত তাতে কোন সন্দেহ নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মত আত্মঘাতী একটি বিষয়কে বুঝতে আমি ম্যাচ ফিক্সিংয়ের উদাহরণ দিয়ে থাকি। এটাকে ঘরের শত্রু বিভূষণও বলতে পারেন।

এবার আসি প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রভাব নিয়ে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এর চাইতে বড় সংকটময় মুহূর্ত ইতিপূর্বে কখনো গিয়েছে বলে আমার মনে হয় না। শিক্ষকেরা একসময় নৈতিকতা শিক্ষা দিতেন আমাদের। আর এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস এমন এক মহামারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যে, যেই শিক্ষক বলবেন প্রশ্নপত্র ফাঁস দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর সেই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিকট বাংলা সিনেমার খলনায়ক হিসেবে সাব্যস্ত হবেন। একসময় বিভিন্ন কমেডি গ্রুপে আমরা দেখতাম, আইফোনের জন্য কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন তরুণ তরুণীরা। হাস্যকর হলেও এটাই সত্যি যে, অবস্থা এতটাই বেগতিক যে কয়দিন পর আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রশ্নপত্র পাওয়ার জন্য কিডনি বিক্রি করে দিতে রাজি হয়ে যাবেন।

দুটো সত্য ঘটনা বলি, তাহলেই আশা করি আপনারা বুঝতে পারবেন আমরা কোথায় আছি। গত ঈদে এক বাবা তার মেয়েকে দুটো জামা কেনার জন্য টাকা দিয়েছিলেন। মেয়ে জামা কিনেছেন একটি, বাকি একটি জামার টাকা রেখে দিয়েছেন প্রশ্ন কেনার জন্য। বুঝতে পারছেন অবস্থা। আরটিভি অনলাইনে দেখলাম, একজন শিক্ষক বলছেন, রাত ২টায় এক অভিভাবক উনাকে ফোন দিয়ে প্রশ্ন পাওয়ার কথা বলেন। তিনি বিরক্তি প্রকাশ করলে ওই অভিভাবক কিছুটা বিব্রতকর আচরণ করেন এবং পরেরদিন পরীক্ষায় দেখা যায় অভিভাবক যেই প্রশ্নটি পেয়েছেন সেটাই পরীক্ষায় এসেছে। অন্য শিক্ষার্থীরা তা জানার পর শিক্ষককেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন যে, শিক্ষক কেন সেই প্রশ্নটি অন্যদের দিলেন না। নিশ্চই তিনি চান যে, শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট ভালো না হোক।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এখন আবার এ+ না পেলে পাড়া প্রতিবেশীর নিকট মুখ দেখানো যায় না। “আমি এ+ পেয়েছি” তা ইংরেজি করতে পারুক আর না পারুক তাতে কোনো অসুবিধা না থাকলেও এ+ না পেলে সমস্যা আছে। তাই টাকা দিয়ে হোক, চুরি করে হোক কিংবা ঢাকাতি করে হোক, যেভাবেই হোক না কেন সন্তানকে এ+ পাওয়াতেই হবে। জেএসসির একজন শিক্ষার্থী যখন প্রশ্ন কেনার জন্য বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে তখন সেই সন্তান কিংবা বাবা, কে কাকে কি বলবেন? কে কার প্রশ্নের উত্তর দিবেন? বাবা সন্তানের নাকি সন্তান বাবার?

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম দুইটি পরীক্ষার প্রশ্নই ফাঁস হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষা বাতিলের হুমকি ধমকি দিচ্ছেন, কিন্তু তা খুব একটা কাজে আসছে বলে মনে হয় না। বরং বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই প্রশ্ন বিতরণ করা হচ্ছে। এবার দেখলাম, ৫ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। এভাবে আসলে সমস্যার সমাধান হবে না।

অভিভাবক, শিক্ষার্থীরা ভয়ে থাকেন সব সময়, প্রশ্ন কি আসলেই ফাঁস হবে? ফাঁস হলে সেই পরীক্ষা কি সত্যি সত্যি বাতিল করা হবে? বাতিল হলে কয়দিন হবে? এত দুশ্চিন্তা নিয়ে আসলে আর যাই হোক পড়াশুনা করা যায় না।

বাচ্চা বাচ্চা শিক্ষার্থীরাও এখন বুঝে প্রশ্নফাঁস হয়। দ্বিতীয় শ্রেণীর কচি-কাঁচা শিক্ষার্থী যখন বাবা মাকে বলে, আমার বন্ধু বলেছে, ৫০০ টাকা দিলে প্রশ্ন দিবে, তখন কি দিয়ে আপনি তাকে বুঝ দিবেন? কি বলে তাকে বুঝাবেন যে, বাবা এসব ভালো কাজ নয়, ভালো মানুষেরা এসব করে না। এভাবে চলতে থাকলে সত্যি সত্যি আমরা মেরুদণ্ডহীন একটা অকালকুষ্মাণ্ড জাতিতে পরিণত হবো।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কিভাবে এই ভয়ংকর বিষবৃক্ষ থেকে মুক্তি পাবো। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে। প্রথমত, সরকারকে তার জায়গায় কার্যকর শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, বিভিন্ন স্থানে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ভর্তি জালিয়াতির সাথে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়িত। এক্ষেত্রে সরকারকে জিরো টলারেন্সে নামতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় না কিংবা ফাঁসের কোন সুযোগ নেই এ জাতীয় বক্তব্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে শাস্তির মুখোমুখি নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে শিক্ষা কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলে শুধুমাত্র আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা কিন্তু নয়। এর ফল আমাদের সবাইকে ভোগ করতে হবে। বাকি সব কিছুর মত শিক্ষাকেও বাণিজ্যিকীকরণের যেই খেলা আমরা খেলছি তা দিনশেষে আমাদেরকেই মরণকামড় দিবে। অন্তত এই একটা বিষয়ে আমরা যেন দলমত নির্বিশেষে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করি।

তৃতীয়ত, শুধুমাত্র সরকার কিংবা প্রশ্নপত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সদিচ্ছা থাকলেই হবে না। অভিভাবকদের ভূমিকাও এক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কিভাবে আপনার সন্তানকে গড়ে তুলছেন কিংবা কি ধরণের সমাজ তাদের উপহার দিচ্ছেন, তার উপর নির্ভর করবে আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ। তাই সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বৃহত্তর স্বার্থের জন্য সন্তানের অন্যায় আবদারকে প্রশ্রয় দিবেন না।

চতুর্থত, এক্ষেত্রে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের ভূমিকাও পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। একসময় শিক্ষকতা পেশা ছিল অধিকতর সম্মানিত ও মর্যাদাকর পেশা। শিক্ষকরা ছিলেন সমাজের আলোকবর্তিকা। বর্তমানে শিক্ষকতা পেশা হয়ে গেছে, স্বার্থান্ধ, দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও খুব সহজে অর্থ আদায়ের অন্যতম হাতিয়ার। নিজেদের বিবেক বুদ্ধি সব নিমিষেই ভুলে গিয়ে লোভে পা দিচ্ছেন তাঁরা। মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখন আর শিক্ষকতা পেশায় আসেন না। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে ভালো কিছু আসবে বলে আমার মনে হয় না।

তাৎক্ষণিক করণীয় হিসেবে পরামর্শ হচ্ছে, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত যে প্রক্রিয়া তা সরাসরি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে সম্পন্ন করা। এখন পর্যন্ত আমরা এই একটি জায়গায় নিজেদের বিশ্বাসকে সোপর্দ করতে পারি। তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য আমাদের সমাজ কাঠামোর যে সামগ্রিক দৈন্যদশা তাতে আঘাত করতে হবে। নতুবা আগামী প্রজন্ম এই জাতির জন্য গলার ফাঁস হয়ে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বিভাগ:কলাম
Share.

Leave A Reply