মেসের মেয়েটি খারাপ যে কারণে

নাবিলা আনজুম: আমার ফ্ল্যাটের ঠিক ওপরেই একদল ব্যাচেলর মেয়েদের বসবাস। সেই সাধারণ কোটার মেয়েদের মধ্যে বেশি সাধারণ একটা মেয়ে প্রায়ই আমার চোখে পড়ে। মেয়েটা শ্যামা, লম্বা, রোগা। তারপরও সব মিলিয়ে বেশ সুন্দরী। কারণ তার সামনের ডান দিকের একটা দাঁত উঁচু।

এই মেয়েটার মধ্যে কেমন একটা না পাত্তা দেওয়া টাইপ ভাব আছে। যেমন ধরুন লিফট থেকে বের হতে গিয়ে আপনি তার সঙ্গে সামনাসামনি একটু ধাক্কা খেলেন। কিন্তু তার মুখ দেখে মনে হবে ধাক্কা তো দূরের কথা তার সামনে যে কেউ আছে সে যেনো সেটাই জানে না। সে সুন্দর কিটকাট খেতে খেতে আপনার ওপর দিয়ে না পাত্তা ভঙ্গিতে থেমে যাওয়া গান আবার গাইতে গাইতে বের হতে যাবে। এমনকি লিফটের মধ্যে সে যেভাবে তার প্রতিচ্ছবি দেখে চুল ঠিক করে আর হাত পা নাড়ে তাতে আমার মনে হয় আমি বোধ হয় লিফটে নেই বা সে লিফটকানা (রাতকানার খালাতো বোন)।

কিছুদিন আগে দেখলাম সে গেটের বাইরে কুকুরগুলোকে রুটি দিচ্ছে। আমার ছেলে নাহিয়ানকে দেখে বাদামি কুকুরটা বারাবের মতো দৌড়ে এলো। নাহিয়ান হাতের পলিথিনে ভরা খাবারটা তার সামনে রাখলো। অমনি মেয়েটা খুব নির্বিকার মুখ করে পলিথিনটা ওখান থেকে নিয়ে গিয়ে অন্য কুকুরগুলোর মধ্যে এমনভাবে রাখলো যেন খাবারটা তারই বাসা থেকে আনা হইছে এবং আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না।

এরপর সে যেভাবে আমার দিকে বিন্দুমাত্র দৃষ্টি বিসর্জন না দিয়ে নাহিয়ানকে কোলে মাথায় নিয়ে লাফালাফি করলো তাতে হঠাৎ করে আমার মনে হইল আমি কি এখানে আছি নাকি নেই? নাহিয়ান কি আমার মত তারও কিছু হয় নাকি ?

এর আগে ফাল্গুনের প্রথম দিন গলির মুখে তার সঙ্গে দেখা। সে মিছমিছে কালো শাড়ির সঙ্গে কেডস পরা। আমি সত্যিই জানতাম না আমি ছাড়াও এমন কেউ আছে যে শাড়ির সঙ্গে এতো সাচ্ছ্যন্দে কেডস পরতে পারে। সে রিক্সায় উঠতে উঠতে রিকশাওয়ালাকে ঝাড়ি দিয়ে বলছিল, ‘ওই আপনার ছেলেপুলে নাই? এই বয়সে এত রোদ্দুরে রিক্সা চালাইলে মাথাটার তো তেরটা বাইজা যাবে খালু।’ এতো মায়ার ঝাড়ি বোধহয় এই এক মেয়েরাই দিতে পারে! ভেবে আমি একা একাই হাসছিলাম।

যাই হোক গতকাল রাতে একটু কাজে নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম ক্ষনিকের জন্য। উল্টো দিকে একটু দূরে গেটের সামনে ম্যানেজার আর দাড়োয়ান দাঁড়ানো। মেয়েটা লিফট রেখেই সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। দাড়েয়ান ম্যাডাম বলে তাকে সালাম ও দিল। অবাক হলাম মেয়েটা চলে যাওয়ার পর ওনাদের কথা শুনে।

তাদের কথার সারমর্ম ছিল মেয়েটা যারপর নাই বাজে,নোংরা, খারাপ, এমন মেয়ে পরের ঘরে টিকবে কিভাবে এবং তারা মেয়েটার এই ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছিল যে সে তার জামাইর হাতে সকাল বিকাল দু’বেলা মার খাচ্ছে। কেন? বলছি।

কথাটা কানে যাওয়ার পর মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়া মুখ পকেটে রেখে এগিয়ে গেলাম ওনাদের সামনে। জানতে চাইলাম মেয়েটা যে এত খারাপ তারা বুঝল কিভাবে? এবং একটু ঘুড়িয়ে প্রশ্ন করাতে সেই উত্তরগুলোই পেলাম যা আমার সহজ আন্দাজ ছিল।

মেয়েটা খারাপ, কারণ সে ভার্সিটিতে পড়ে, সে টুসটাস তাদের টিপস দেয় না, ডিম দুধ আনায় না তাই তারা বকসিস পায় না, বাড়িয়ালার ছেলের চেপে দেয়া তাদের ইন্টারনেট কানেকশন না নিয়ে আগের টাই রেখে দিছে, তাদের সাজেসটেড বুয়া রাখে নাই, যাবতীয় যে কোন বিলের রিসিড চায় যা নিয়ে তার রুমমেটদের কোন মাথা ব্যাথ্যা নাই, সে ফোনে বিদেশী ভাষায় কথা বলে ইত্যাদি ইত্যাদি।

শুধুমাত্র এই কারণেই আমিসহ অ্যাপার্টমেন্টের অন্য সব মেয়েদের কাজ শেষে সন্ধ্যা বা রাতে বাড়ি ফেরা বা শাড়ির সঙ্গে কেডস বা ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরা তাদের চোখে না পড়ে শুধু তারটাই পড়ে। এটাই প্রতিদিন, প্রতিক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া চিরায়ত, প্রবাহমান, সাধারণ ঘটনা।

সত্যিকার অর্থে চরিত্র খারাপ থাকলে কেউ মেয়েদের চরিত্রহীন বলে না, উল্টো তাকে হুজুর হুজুর করে তার সুযোগ নিতে চায়।

বিশ্বাস করুন চরিত্রহীন তখনই একটা মেয়ে কে বলা হয় যখন তার সঙ্গে কোনো দিক থেকে পারা যায় না। তাকে আয়ত্ত বা অধীনস্ত করা যায় না, খোঁটা দেয়ার জন্য কোনো ত্রুটি পাওয়া যায় না এমনকি তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস বা যোগ্যতা হয় না। একটা মেয়ে ঠিক তখনই চরিত্রহীনার তকমা পায়।

শুধু এই অশিক্ষিত ম্যানেজার বা দারোয়ানই না, মেরুদন্ডহীন পুরুষ নামের শিং লোম ছাড়া পশু ক্যাটাগরির প্রাণীগুলোর কাছে মেয়েদের চরিত্রের দিকে ছুড়ে মারা এক একটা তীর এক একটা ব্রম্মাস্ত্র- যা তাদের কাছে সহজলভ্য এবং সাধারণ।

ঠিক এই কারণে যখন কেউ আমাকে খারাপ বলে তখন আমার বেশ লাগে। মনে হয়, নাহ্, সব ই তাহলে ঠিকঠাক আছে, ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু যখন কেউ আমার প্রশংসা করে তখন আমি আমার চরিত্র নিয়ে বেশ সংশয়ে পরে যাই। ভাবি, কি ব্যাপার, চরিত্রের আমার কোথাও কি নাট বল্টু একটু ঢিলে হয়ে গেলো কিনা!

নোট: লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত ছবিটি প্রতীকী।

লেখক: কবি, নারী উদ্যোক্তা।

Share.

Leave A Reply