প্রতিরোধ

জান্নাতুন নুর দিশা: বাংলাদেশে এসেছি আজ ১৬ দিন হচ্ছে। যেদিন এসেছি সেদিন থেকেই দেখছি আকাশে ঝকঝকে রোদ। আজও তেমনটাই। সকালের চা-টা খেতে খেতে পত্রিকা পড়ছি, ছাতুর মা এসে বললো, “অজন্তা আফা, ছাতুরে নিয়া আইছি।”

ছাতুর মাকে ঠিক করে দিয়েছে চাচী। বাংলাদেশে এ রকম পার্টটাইম গেরস্থালীর কাজ করা মহিলাদের বলে ছুটা বুয়া। ছাতুর মা আমার বাসায় ছুটা বুয়া। একা বাসা নিয়ে থাকছি তাই রান্নাবান্না আর ঘরদোর পরিষ্কার করার জন্য ওকে রাখা।

আমি বাংলাদেশে এসেছি টোকাইদের নিয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করতে। প্রতিবেদন করে সেটা সুইজারল্যান্ড হেড অফিসে জমা দিয়েই জাপান ফিরে যাবো। আমরা পুরো পরিবার জাপানেই স্যাটেলড।

টোকাই নিয়ে কাজ করতে এসে গত ১৬ দিনে আদৌ কোনো কাজই হয়নি। প্রথমে এসে চাচার বাসায় উঠা। চাচীকে নিয়ে নতুন বাসা ঠিক করা, জিনিষপত্র কেনা আর এই ছাতুর মাকে পেতে পেতেই চলে গেছে ১০ দিন। বাকি ছয়দিন ঢাকার রাস্তায় টোকাই খুঁজে খুঁজে ছবি তোলা হয়েছে কিছু। ওদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে পাত্তাই দেয়নি আমাকে। বিদেশিদের মতো গায়ে সাদা চামড়া, মাথায় সোনালি চুল থাকলে অবশ্য সুবিধে হতো। এরা আগ্রহ নিয়ে কথা বলতো আমার সঙ্গে। কিন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ায় আর পরিষ্কার বাংলায় কথা বলি বলে এরা আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হয়নি। বরং ওদের কাজের সময় আমার কথা বলার পীড়াপীড়ি ওদের কাছে উটকো ঝামেলা মনে হয়েছে। বেশ হতাশ লাগছিলো। প্রতিবেদন করতে হলে টোকাইদের সঙ্গে মিশে যেতে হবে। কী করে কী করবো ভাবছিলাম তখনই কাল রাতে জানতে পারলাম, ছাতুর মার ছেলে ছাতু ঢাকা শহরে টোকাইয়ের কাজই করে।

চা খেতে খেতে ছাতুর সঙ্গে কথা বলছি।

“তোমার নাম ছাতু?”

“জে না, সাদ্দাম। তয় সবাই ছাতু বইলা ডাকে।”

“আচ্ছা, তুমি কী কাজ কর?”

“টোকাইয়ের কাম। জিনিষ কুড়াই। রাতে জব্বার মুন্সীরে জমা দিয়া টাকা নিই।”

“জব্বার মুন্সী কে?”

“যে এইগুলান জমা নিয়া আমগোরে টাকা দেয়।”

“সে এসব কী করে?”

“জানি না।”

“তুমি তাকে চিনেছ কিভাবে?”

“খসরু নিয়া গেছিলো তার কাছে।”

“খসরু কে?

“আমার দোস্ত। তয় আমার চেয়ে তিন বছরের বড়। এক বস্তিতে থাকি। সেই এই কাজ শিখাইছে আমারে।”

“আচ্ছা। তুমি সকালে কিছু খেয়েছ ছাতু?”

“জে না, আম্মায় বলছে এইখানে আপনি দাওয়াত দিছেন”

“হুম, কী খাবে এখন বল?”

“ভাত খামু।”

ডাইনিংয়ে আমি ফ্রুট জুস আর পাউরুটি মাখন খাচ্ছি। ছাতু আমার সামনের চেয়ারে বসে ভুনা খিচুড়ি খাচ্ছে মুরগীর মাংস দিয়ে। ছাতুর মা ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের চোখেই তৃপ্তির আভা।

আমি ছাতুকে নিয়ে রিকশা চড়ে তার কর্মস্থলে যাচ্ছি! গন্তব্য নীলক্ষেত। সেখানে এক ডাস্টবিনের পাশে তার সঙ্গীরা অপেক্ষা করছে। ছাতু জানালো তারা মোট ছয়জন জন একসঙ্গে এই কাজ করে। দিনশেষে সবাই জব্বার মুন্সীকে দিনের প্রাপ্ত আবর্জনা দিয়ে আসে।

ওরা পাঁচজন গোল হয়ে মিটিংয়ে বসেছে। ছয়জনের একজন আসেনি আজ। যে আসেনি তার নাম খসরু। খসরু ওদের অঘোষিত লিডার। সাহসী হওয়ায় এবং বয়সেও ওদের চেয়ে একটু বড় হওয়ায় খসরু জব্বার মুন্সীর সঙ্গে দামাদামি করে বেশি টাকা আনতে পারতো। ওরা কেউ ঝামেলায় পড়লে খসরু ওদের সাহায্য করতো। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ খসরু আর আসছে না। সে ঘরেই বসে আছে। তারা খসরুকে ডাকতে গেছে প্রতিদিন। কিন্তু সে তাদের বলেছে, সে আর এসব করবে না।

খসরুর এই রহস্যময় না আসা নিয়েই ওদের মিটিং। ওরা বসে আছে ছেঁড়া চটের বস্তার উপর। আমি কয়েক হাত দূরে একটা বড় পাইপের উপর বসে আছি। ছাতু ওদের আমার কাছে নিয়ে এলো। পরিচয় করিয়ে দিলো, আজম, রশীদ, হিরো আর রতনের সঙ্গে। ওরা সবাই সমবয়সী। বয়স সাত বা আট। এই বয়সে ওদের স্কুলে থাকবার কথা। কিন্তু ওরা আবর্জনার ডাস্টবিনের পাশে।

সারাদিন ওদের সঙ্গে ঘুরে সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে ফিরলাম ঘরে। অনেক কিছুই জানলাম ওদের জীবন নিয়ে। বর্ষা এলে কাজের মন্দা বাজার, লোকের খারাপ আচরণ, অপ্রতুল জীবিকা, মানবেতর জীবন। প্রতিবেদনের কাজ শুরু করবো। খসরুর ব্যাপারে কৌতূহল বাড়ছে আমার। কারণ ওদের কাছ থেকে জানলাম, সে ছিল রীতিমত প্রফেশনাল টোকাই! ওদের সবাইকে সেই এই কাজে এনেছে। হঠাৎ তার কাজ ছেড়ে দেওয়াটা কেমন রহস্যময়!

তাছাড়া তার নাকি বেশ পরিবর্তনও এসেছে মাত্র দুই সপ্তাহেই। সে এই দুই সপ্তাহ প্রতিদিন ভালো বাজার করে ফিরেছে, নতুন জামা কাপড় কিনেছে নিজের ও তার মায়ের জন্য, কিনেছে একটা মোবাইলও! কত হয়েছে ছেলেটার বয়স, ১০/১২! এই বয়সে হাতে মোবাইল, হঠাৎ টাকার উৎস সে পেলো কই! ছেলেটা কোনো অপরাধে জড়ায়নি তো!

আমার এসবে জড়ানো ঠিক হবে কিনা ভাবছি। তিন মাসের জন্য এসেছি বাংলাদেশে। তাও প্রথমবারের মতো। পরিবারের সবাই জাপানে। মেয়ে মানুষ হয়ে এসব ঝামেলায় যাওয়া এ দেশের প্রেক্ষাপটে ভালো সিদ্ধান্ত হবে কিনা এসব সাতপাঁচ ভাবছিলাম। এমন সময় চাচী কল দিলো। চাচীকে সব বলতেই রেগে ফায়ার!

“অজন্তা তুমি দেশে নতুন এসেছো, এসব টোকাই ফোকাই নিয়ে প্রতিবেদন বানাচ্ছো বানাও, কোনো ঝামেলায় জড়াবে না প্লিজ।”

“চাচী, ডোন্ট ওরি। আমি সাবধানী। ”

আজ বিকেলে আসলাম সাতুদের বস্তিতে। খসরুর খোঁজে। খসরু ঘরে নেই। তার মা হালিমা আছে। হালিমা বেশ খুশি খুশি চেহারা নিয়ে বসে আছে। তার সঙ্গে কথা বললাম। সে স্বামী পরিত্যাক্তা। একটাই ছেলে তার। সেও ছাতুর মার মতো ছুটা বুয়ার কাজ করে। ছেলে খসরুর হঠাৎ অর্থ প্রাপ্তিতে হালিমা বেশ আমুদেপনায় আছে। তার কাছে জানতে চাইলাম ছেলে হঠাৎ টাকা কই পাচ্ছে।

সে জানে না। মনে হলো না যে, সে জানতেও চায়।

বস্তির জীবন ভিন্ন জীবন। এখানে একই পরিবারেও কেউ কারো জীবন জীবিকা নিয়ে মাথা ঘামায় না। খেয়ে, না খেয়ে থাকা জীবনে হঠাৎ পাওয়া অর্থ এখানে আনন্দই আনে। সন্দেহ, ভয়, শঙ্কা এসব আনে না।

খসরু ফিরলো সাতটায়। ছাতু আর খসরুকে নিয়ে আমি গেলাম মাটন বিরিয়ানি খেতে। মাটন বিরিয়ানি আর ফিরনি দিয়ে জম্পেশ খাওয়াদাওয়া করে ওদের নিলাম শিশু পার্কে। তারপর দুই জনের হাতে ৫০০ করে টাকা দিলাম।

খসরু এখন আমার ভক্ত। আমি যাই বলবো তাই করবে এমন লেভেলের ভক্ত। এবার জানতে কথা পাড়লাম তার সঙ্গে।

“খসরু, টোকাইয়ের কাজ ছাড়লে যে?”

“আফা, নতুন কাম পাইছি।”

“কী কাজ?”

“ঔষধ সাপ্লাই।”

“কিসের ঔষধ। ”

“এলাকার রাজন ভাই এই কাম দিছে। প্রত্যেকদিন দুই জনের কাছে দুই প্যাকেট ঔষধ দিয়া আসি। বিনিময়ে আমারে ২০০ টাকা দেয় দৈনিক। একটা মোবাইলও দিছে। তয় কইছে কাউরে না কইতে। আফা আপনে কাউরে কইয়েন না।”

“তুমি কাল ঔষধ দেওয়ার আগে আমাকে একটু দেখাবে?”

“আচ্ছা আফা।”

পরদিন সকালে আমি আর খসরু বের হলাম। একটা সরু মরা গলির শেষ মাথায় রাজন নামের ১৭/১৮ বছরের একটা ছেলে খসরুর হাতে দুটো প্যাকেট দিলো। আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখলাম।

রাজন চলে যেতেই আমি খসরুর থেকে প্যাকেটটা নিলাম। মাদকদ্রব্য প্যাকেটে। খসরুকে বললাল, আমার কথামতো কাজ করলে ২০০ টাকা না, আরো বেশি কিছু পাবে। তাকে বোঝালাম, এসব জিনিস অবৈধ। ধরা পড়লে জেলহাজত। সে ভয়ে কাঁপছে।

খসরুকে নিয়ে পুলিশের কাছে গেলাম। তার সাহায্য নিয়ে পুলিশ রাজনদের চক্রকে ধরলো। তারা হাজতে গেলো।

খসরু, ছাতুদের নিয়ে আমি আরো তিন মাস প্রতিবেদনের কাজ করলাম। যে এনজিওর হয়ে এসেছিলাম তারা ওদের পুনর্বাসন ও লেখাপড়ার ব্যবস্থা করলো।

আমি আজ ফিরে যাচ্ছি। আমাকে এয়ারপোর্টে এগিয়ে দিতে এসেছে ওরা ছয়জন। এই ছেলেগুলো মানবেতর জীবনযাপন করতো, হয়তো এরা প্রত্যেকেই ভবিষ্যতে জড়িয়ে পড়তো ভয়ানক অপরাধ জগতে। আমি ওদের বাঁচাতে পেরেছি। সেই আত্মতৃপ্তি নিয়ে ফিরছি। আবার একটা আক্ষেপ আর শঙ্কাও আছে। আমাদের সহায়তায় যে রাজনদের ধরেছে পুলিশ, তাদের জীবনেও তো থাকতে পারে অপরাধী হয়ে উঠার কোনো করুণ কাহিনী। কে বানিয়েছে ওদের অপরাধী? সে পর্যন্ত কি যেতে পারি আমরা? পারি না। সবাই মিলে চাইলে হয়তো পারতো। সবাই কি আর চায়? যে যার গা বাঁচায়। আমি তো ভালো আছি ভেবে হাত গুটায়। আবার আমাদের সন্তানরাই একদিন হয়ে উঠে মাদকাসক্ত! এটাই প্রকৃতির প্রতিশোধ।

আবার আসবো বাংলাদেশে। এই কথা দিলাম ছাতু, সাদ্দামদের। ওদের প্রত্যেকের চোখে পানি। আমার চোখেও। আমি ফিরবো আবার। দেশের জন্য কিছু করতে হলে দেশেই থাকা চাই।

দ্য ঢাকা রিপোর্ট-এ যে কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রেস রিলিজ বা নিউজ পাঠাতে যোগাযোগ করুন নিচের ই-মেইলে: thedhakareport@gmail.com

খুব সহজে যোগাযোগ করতে পারেন আমাদের ফেসবুকে: https://www.facebook.com/TheDhakaReport05

Share.

Leave A Reply