আমাদের মা

জান্নাতুন নুর দিশা: অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে গল্পগুচ্ছ পড়ছিলাম। ক্লান্তিতে চোখ বুঁজে আসছিলো। আজকাল বন্ধুদের খুব মিস করি। আগের মতো দেখা হয় না ওদের সঙ্গে। দেখা করার একটা প্ল্যান বানাবো ভাবছিলাম।

দু’কাপ চা হাতে মা এসে বসলেন পাশের চেয়ারে। আমি চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মায়ের দিকে তাকালাম। আমার মায়ের ঘন কালো কুন্তলরাশিতে হালকা পাকা ধরেছে। হঠাৎ আমার মনে হলো, এই যে ভদ্রমহিলা তার ঘনকালো চুলের যৌবন থেকে এই কাঁচাপাকা চুলের প্রৌঢ়া হয়েছেন দিনে দিনে, এই বিস্তর সময়ে আমি তো কোনোদিন উনার কোনো বন্ধু দেখলাম না। আমি তো আজীবন দেখলাম, মা সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি সংসার নিয়ে পড়ে থাকেন। তার সবটাজুড়ে এই সংসার।

“মা!”

“হুম বল, কিছু বলবি?”

“স্কুল লাইফে তোমার কোনো বান্ধবী ছিলো না?”

মায়ের চোখে আমি হঠাৎ নস্টালজিয়া (স্মৃতিকাতরতা) দেখলাম! চুপ করে কী যেন ভাবছেন। হয়তো স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন।

“মা!”

“হুম”

“বলো না, বান্ধবী ছিল না?”

“ছিল তো।”

“কী নাম ছিল তার?”

“রাজলক্ষ্মী চৌধুরী। ক্লাস টেন পর্যন্ত আমরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম।”

“একসঙ্গে স্কুলে যেতে তোমরা?”

“হ্যাঁ, আমাদের মুসলিম পাড়ার পরেই ছিলো হিন্দু পাড়া। সেখান থেকে রাজলক্ষ্মীকে নিয়ে একসঙ্গে এক মাইল হেঁটে প্রতিদিন স্কুল যেতাম। রাজলক্ষ্মী যা ভালো গান গাইতো! খুব সুন্দরী ছিল। ও খুব ভালো নাড়ু বানাতো। ওদের পূজো এলে আমার জন্য নাড়ু বানিয়ে আনতো। আর আমি ওকে উপহার দিতাম নিজের বানানো হাতপাখা। এসএসসি’র পর ওর বিয়ে হয়ে গেলো নামী এক উকিলের সঙ্গে। আমিও কলেজে ভর্তি হতে শহরে চলে এলাম।”

এক নিঃশ্বাসে পুরো স্মৃতিচারণ করে মা থামলেন। উনার চোখেমুখে ভীষণ ভালো লাগার ছাপ। বন্ধুর স্মৃতি কী অদ্ভুত! এতো বছর পরও ভালো লাগা দেয়!

আমিও কল্পনা করছিলাম আমার প্রৌঢ়া মায়ের সেই দুরন্ত কিশোরী রূপ। যখন রাজলক্ষ্মী নামের কোনো কিশোরী তার বান্ধবী ছিলো, আমাদের মতো ঠিক আমাদের মতো খুনসুটিতে, দুষ্টুমিতে, গল্পে মেতে থাকতো তারা।

“মা, সে এখন কোথায়?”

“জানি না। ওর বিয়ের পর ও তো শহরে চলে আসলো।”

“তুমিও তো শহরেই ছিলে। যোগাযোগ রাখতে না?”

“বিয়ে হয়ে গেলে কী আর মেয়েদের দেখা হয় বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে!”

আমি খানিক চুপ করে রইলাম। মায়ের হঠাৎ মনে পড়লো চুলোয় ভাত চড়িয়েছেন। দ্রুত হেঁটে রান্নাঘরে চলে গেলেন।

আমার কানে, শুধু কানে নয়, আমার সমস্ত চেতনায় একটা কথা বেজে যাচ্ছিল, “বিয়ে হয়ে গেলে কী আর মেয়েদের দেখা হয় বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে!”

আমি আর মা একদিন শপিংয়ে গেলাম। শাড়ি দেখছিলাম। কোথা থেকে এক মহিলা মাকে এসে জড়িয়ে ধরলেন। মা খানিক তাকালেন। ভদ্রমহিলা বললেন, “রিনি, তুই আমাকে চিনিস নাই? আমি তাহুরা।”

মা হঠাৎ ভীষণ খুশি হয়ে উঠলেন। আবার জড়িয়ে ধরলেন উনাকে। দুজন রাজ্যের আলাপ করলেন। কার বাসা কোথায়, কার বউ কী করে, ছেলেমেয়েরা কী করে? এসব কতশত গল্প! আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাহুরা আন্টি মায়ের কলেজ লাইফের ফ্রেন্ড। দুজন একসঙ্গে গ্রাজুয়েশন করেছেন।

“মা, কলেজ লাইফের ফ্রেন্ডের কোনো খোঁজই রাখোনি তুমি? এত বছর পর দেখা? চিনতেই তো পারলে না তুমি।”

“আরে, বিয়ের পর আর খোঁজ রাখা হয়? সংসারেই তো সবটা সময় চলে যেতো। অন্য কিছুর সময় পেতাম? বিয়ের পর মেয়েদের সংসারটাই একমাত্র বন্ধুরে মা, বুঝবি বিয়ের পর!”

মা শপিংয়ে মনোযোগ দিলেন। আমি আর মনোযোগ দিতে পারলাম না! আমার শুধু কানে বাজছিলো মায়ের কথাটা, “বিয়ের পর মেয়েদের সংসারটাই একমাত্র বন্ধুরে মা, বুঝবি বিয়ের পর!”

আমি আর আমার এক আপু! খুব ঘুরতাম দুজন। রিকশা ভ্রমণ করতাম দুজন, একটা রিকশা একঘণ্টার জন্য ভাড়া করে রিকশাওয়ালাকে বলতাম, ভাই যেদিকে মন চায় যান! বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে দুজন টঙে চা খেতাম। মজার ছিলো সময়গুলো।

আপুটার বিয়ে হয়ে গেলো। তারপর দুই একবার ঘুরেছি। এরপর একটু একটু করে আপু সংসারে মনোযোগী হয়ে গেলো। আমি আর আমরা হয়ে গেলাম দূরের কেউ।

এটাই আমাদের মায়েদের, আমাদের আপুদের এবং আমাদের জীবন। আমাদের বাবাদের বন্ধুদের আমরা চিনি। আমাদের মায়েদের আমরা কখনো বন্ধু দেখিনি। একটা মেয়ে বিয়ের পর শুধুই তার সংসারের হয়ে যায়। সে ছেড়ে আসে একটা পরিবার, একরাশ বন্ধুত্ব, একটা দুরন্ত কৈশোর, একটা সোনালী অতীত। সব ফেলে এসে সে শুধু তার সংসারটাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচে।

মেয়েদের হাজারটা দোষ খুঁজে বের করবার আগে একবার মায়ের মুখের দিকে তাকাবেন। যিনি আপনার ও আপনাদের মনের সব কথাগুলো, চাহিদাগুলো কিভাবে কিভাবে বুঝে ফেলেন! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষটা কত নিঃসঙ্গ হয়ে যান ভেতরে, কখনো অনুভব করেছেন! আপনার বাবা, আপনি, আপনার ভাই-বোনেরা যখন হাঁটে-বাজারে, স্কুল-কলেজে, অফিসে আড্ডায় মাতেন, আপনার মা তখন সংসারে ডুবে থাকেন। আপনি কখনো গল্প করেছেন প্রাণ খুলে তার সঙ্গে? না করে থাকলে আজ থেকে করবেন।

মেয়েদের দোষগুলো যেমন বিশাল চোখে দেখেন, মেয়েদের ত্যাগগুলোও বড় করে দেখুন। প্রতিটি মেয়েই দিনশেষে কোনো না কোনো সংসারে কারো না কারো সেই নিঃসঙ্গতা নিয়েও নিজেকে সুখী ভেবে বেঁচে থাকা সহজ সরল মা।

Share.

Leave A Reply