ইফতারি

জিন্নিয়া সুলতানা: মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে নেহা। বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে এটাই নেহার প্রথম রমজান মাস। মা-বাবা বড় করে ইফতারি না পাঠালে শ্বশুর বাড়িতে নানা রকম বাজে কথা শুনতে হবে।

আত্মীয় স্বজন যেই আসছে বাসায় শাশুড়ি মাকে বারবার জিজ্ঞেস করছে, এখনো বউয়ের বাবার বাড়ি থেকে ইফতারি আসে নাই? কমলের মা তো ছেলের বিয়ে দিয়ে ঠকে গেলো।

আড়াল থেকে কথা গুলি যখন নেহার কানে যায় খুব কষ্ট হয় তার, এ কেমন প্রথা? যেখানে মানুষের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা না করে উপরে বুজা চাপিয়ে দেয়া হয়!

এখন তার বাবা কিভাবে এত টাকা খরচ করে ইফতারি পাঠাবেন, যেখানে দৈনন্দিন খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হয়!

বাবার ছোট একটা বেসরকারি চাকরি থেকে সংসারে সব কিছু করতে হয়, কমলের পরিবার কেন সব জেনেও এত অমানবিক হতে পারে?

নেহা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে মায়ের নাম্বারে কল দিলো,

-হ্যালো মা, কেমন আছো?

বাবার শরীরটা কি ভালো আছে? ঔষধ খেতে যেন একদম অনিয়ম না করে, রোজার মধ্যে শরীর খারাপ নিয়ে অফিসে যেতে কষ্ট হবে।

– হ্যাঁ, নেহা।

আমরা ভালো আছি। তোমরা সবাই কেমন আছো?

তোর শাশুড়ি কেমন আছে?

– ভালো আছেন মা,

বাবা কি বেতন তুলতে পেরেছেন?

– না রে মা, তবে আমাদের মনে আছে। তোর বাড়িতে ইফতার দিতে হবে। বেতনটা তুলেই তোর বাবা সব ব্যাবস্থা করে ফেলবেন।

– মা,

নেহার কণ্ঠে যেন স্পষ্ট অসহায়ত্ব।

– আজকে সাত রমজান চলছে, এখনো আমাদের রমজানের জন্যে বাজার করা হয় নাই। তোর বাবাকে বলেছি বাজার করতে হবে না, ঘরে যা আছে তা দিয়েই মাস কাটিয়ে দিতে পারবো কোনো মতে। মাসের টাকা দিয়ে যেন তোকে ভালো করে ইফতারি পাঠায়। তুই চিন্তা করিস না মা। ১০ রমজানের মধ্যে যদি বেতন না পায় তবে ধার করে যেন ব্যবস্থা করে। সবার আগে তোর সুখটা বড়।

– আচ্ছা মা, ভালো থাকো। কল কেটে দিয়ে নেহা কাদতে লাগলো। মায়ের কথা গুলি কানে বাজছে বার বার।

মাসের বাজার করা হয় নাই।

ছোট দুটো বোন, না জানি কি দিয়ে সেহরি খাচ্ছে। অথচ কমল ও মায়ের সাথে তাল মিলিয়ে দুই তিন বার বলেই ফেলেছে, ইফতারি যখন দিতেই হবে তাহলে এত দেরি করে দিচ্ছে কেন? নতুন বউয়ের ইফতারি কি এত দেরিতে আসে?

নেহা শুধু মুখ তুলে তাকিয়েছে তার কথায়। কোনো কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পায়নি।

আজকে এগারো রমজান, নেহার বাবার বাড়ি থেকে ইফতারি এসেছে। নেহার ছোট বোন মাহা ইফতারি নিয়ে এসেছে। নেহা হঠাৎ শুনতে পেলো পেছনের দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে। দরজা খুলতেই দেখলো চার পাঁচ বছরের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।

কে তুমি? – নেহা অবাক হয়ে জানতে চাইলো।

– আপা আমি পাশের বস্তিতে থাকি, আপনাগো ঘরে ইফতারি আইছে শুনে আমার দাদা কইলো একটু ইফতারি নিয়ে যাইতে।

তিন দিন ধরে রিকশা চালাইতে যাইতে পারে না। গরমে অসুস্থ হয়ে গেছে। ঘরে ইফতারের কিছু নাই।

আচ্ছা, তুমি দাঁড়াও। আমি নিয়ে আসি। এ কথা বলে নেহা ঘরে গেলো। টেবিলের উপর সব কিছু সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এখনো আত্মীয় স্বজন কাউকে কিছু পাঠানো হয় নাই।

নেহা ভাবলো কয়েক্ টুকরো জিলাপী ছেলেটাকে দিয়ে দেবে। কয়েক্ টুকরো জিলাপী কাগজে মুড়ে নিয়ে গেল দরজার কাছে,

যেই ছেলেটার হাতে দিতে যাবে ওমনি ঘরের ভেতর থেকে শব্দ এলো, এই কি করছো? কি করছো?

নেহা পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখলো তার শাশুড়ি মা এগিয়ে আসছেন তার দিকে।

– নেহা, এখনো কাউকে কিছু দেওয়া হয় নাই। তোমার এই ভিখিরিটাকে এসব দেওয়ার দরকার কি? এমনিতেই তো পরিমাণে যা ইফতারি দিয়েছে তোমার বাবা মা, সবাইকে পাঠাতে পারবো কিনা কে জানে।

নেহা অবাক চোখে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবলো, এই কয়েক টুকরো জিলাপী বাচ্চাটাকে দিলেই তোমাদের ভাগে কম পড়ে যাবে? কিন্তু মুখে কিছুই বললো না।

সামনে পা বাড়াতেই দেখলো মাহা দরজার ওপাশে ছলছল নয়নে দাঁড়িয়ে আছে। রাত দুইটা বাজে।

রমিজ উদ্দিন তাহাজ্জুদ নামায আদায় করে উঠেছেন। হঠাৎ মনে পড়ল, মেয়ে নেহাকে একটা কল দেওয়ার দরকার। ইফতারি ঠিক মত হয়েছে কিনা খোঁজ নেওয়া হয়নি।

– হ্যালো নেহা মা?

– বাবা তুমি এত রাতে! সব কিছু ঠিক আছে তো?

অবাক হয়ে নেহা জানতে চাইলো।

– হ্যাঁ রে মা, সব ঠিক আছে। হঠাৎ তোর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হলো। ইফতারি সব কিছু ঠিক মতো হয়েছে তো রে মা? সবাই খেয়েছে তো!

তুই খেয়েছিস?

নেহা গুঙ্গিয়ে উঠল। আমি জানি বাবা, তুমি ধার করে টাকা এনে এসব করেছো। তোমাদের ঘরে বাজার করা হয় নাই, আমার গলা দিয়ে কি এই খাবার নামবে? তাও যদি এতসবের পরও ওরা সন্তুষ্ট হতো।

মাহার কথা শুনে রমিজ উদ্দিন চুপ হয়ে গেলেন। তার গলাও ধরে এসেছে। তাই ফোনটা কেটে দিয়ে আবার জায়নামাজে বসে পড়লেন। হাত দুটি উপরে তুলে বললেন, হে আল্লাহ, যাকে তুমি ক্ষমতা দাও না, তার ঘরে কেন এমন ফুলের মত কন্যা সন্তান মেহমান করে পাঠাও?

Share.

Leave A Reply