শ্বশুরবাড়ির ইফতারি সামাজিক বন্ধন নয়, সামাজিকতার নামে জুলুম

লাইফস্টাইল ডেস্ক, দ্য ঢাকা রিপোর্ট ডটকম: রোজাদারকে ইফতার করানো খুবই সাওয়াবের কাজ। তবে আমাদের দেশে অনেক জায়গায় শ্বশুর বাড়ির ইফতারির নামে প্রবণতা চলে আসছে তা এক ধরনের জুলুমের শামিল। আর জুলুম আল্লাহ তাআলার দরবারে ভয়াবহ অপরাধ।

যুগ যুগ ধরে ‘শ্বশুরবাড়ির ইফতারি’ নামের এক পরিভাষার বলি হয়ে আসছে স্ত্রী বা কনের পরিবার। ভুক্তভোগী পরিবারই জানে, এই কুসংস্কারের বলি হয়ে তারা কতটা জর্জরিত। জন্মের পর থেকে একটা মেয়ে সম্পূর্ণভাবে তার পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। বিয়ের আগ পর্যন্ত তার যাবতীয় খরচ পরিবারই বহন করে। কোনো প্রতিদান ছাড়াই একজন বাবা তার মেয়েকে পাত্রস্থ করেন। সেই বিয়েতে মেয়ের বাবাকে/অভিভাবক কে জামাই বাড়ির কত রকম আবদার নীরবে সহ্য করে মেটাতে হয়।

বিয়ের সময় ছেলে পক্ষকে ধুমধাম করে খাওয়াতে হবে, ভালো ফার্নিচার দিতে হবে। ফার্নিচার বলতে রান্নাঘরের থালাবাসন থেকে শুরু করে সোফা, ফ্রিজ, আলমারি, পালং, চেয়ার-টেবিল, ড্রেসিং টেবিল, বেড আরও অনেক কিছু। এক কথায়, একটা ঘর সাজানোর জন্য যা যা লাগে সেই সব কিছু যেন ছেলের বিয়েতেই শ্বশুর বাড়ি থেকে উসুল করতে চায়। আর এটি আমরা বিন্দুমাত্র লজ্জিত হয়ে চাই না, বরং মনে করি এটা আমাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। আচ্ছা এতো দিন কি ছেলে পক্ষ বস্তিতে বা রাস্তায় জীবন যাপন করতো? আর তাই বিয়ে করে শশুরের কাঁধে চড়ে সভ্য জীবনে যাত্রা শুরু করতে চায়?

সাধ্য অনুযায়ী বরপক্ষের আবদার মিটিয়েই বিয়ে হয়। তাহলে কি বিয়ে হয়ে গেলেই মেয়ে পক্ষ স্বস্তির নিঃশাস নিতে পারছে?

বিয়ের প্রাথমিক ধাপ পার হওয়ার পর মেয়েদের ও তাদের পরিবারের ওপর মৌসুমভিত্তিক জুলুম চাপিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে রেখেছে আমাদের সমাজ। একজন বাবার বিভিন্ন উপঢৌকনের ওপর নির্ভর করবে তার মেয়ের সুখে থাকা কিংবা না থাকা। মেয়ের সুখের জন্য অভিভাবকরা দিনের পর দিন এসব জুলুম নীরবে সহ্য করে যান।

আমরা আধুনিক আর সভ্যতার জয়গান করছি। তবে মেয়ের পরিবারের প্রতি এই জুলুম কেন? রমজান মাস, দুই ঈদ আর ফলের মৌসুমে মেয়ের অভিভাবকের চিন্তা বাড়তেই থাকে। কিভাবে শ্বশুরবাড়িতে ইফতারি, ফল, ঈদের উপহার পাঠানো হবে? কেননা, এসব মনমতো না হলে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কথা শুনতে হবে।

এক রমজানেই একাধিক দফায় ইফতারি আসা চাই। তা-ও আবার যেমন তেমন ইফতারি না। পুরো পাড়ায় যেন আওয়াজ উঠে সেভাবে আনতে হবে। অনেকের আবার উদাহরণ, অমুকের ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘরভর্তি ইফতারি এসেছে। পুরো গ্রাম বিলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি ঠিকমতো আত্নীয়দেরই দিতে পারিনি। লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছি না! অথচ ইসলাম কাউকে সাধ্যাতীত কিছু চাপিয়ে দেয়নি।

এই শ্বশুরবাড়ির ইফতারি কয়টা পরিবার মনের আনন্দে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে থাকে? যাদের সামর্থ্য আছে; তারা স্বেচ্ছায় পাঠাতে পারেন। এটা দোষণীয় নয়। কিন্তু সেটাকে রেওয়াজে পরিণত করে সাধারণভাবে সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া গুরুতর অপরাধ।

আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে, আপনার বাড়িতে ইফতার পাঠানোর জন্য কেউ তার কর্মস্থলে দুর্নীতির আশ্রয় নিক। এই অপরাধে কিন্তু আপনিও অপরাধী।

শ্বশুরবাড়ির ইফতারির ঝড়টা সবচেয়ে বেশি যায় মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির ওপর দিয়ে। শ্বশুর বাড়ির লোকজন যখন ইফতারি বিতরণে ব্যস্ত, সেই সময়ে হয়তো দেনা পরিশোধের কথা ভেবে বিনিন্দ্র রাত যাপন করছেন মেয়ের মা-বাবা। সেই চিন্তা শেষ হতে না হতেই শুরু হয় ফলের মৌসুম। কী নির্মমতা! কী ভয়াবহতা!

আপনি একটা মেয়েকে বিয়ে করেছেন? নাকি আপনার ১৪ গোষ্ঠীর ভোজনবিলাসের দায়িত্ব মেয়ের অভিভাবকের ওপর ন্যস্ত করেছেন?

যে কোনো উপহার সামগ্রী পাঠালে সামাজিক সম্পর্ক বাড়ে। পারস্পারিক মায়া মমতা বাড়ে। কিন্তু এক পক্ষ সারা জীবন দিতেই থাকবে। আরেক পক্ষ সারা জীবন ভোগ করে যাবে! এতে সম্পর্কগুলোর উষ্ণতা বাড়ছে না, অন্তরালে সেগুলো বরফখণ্ডে রূপ নিচ্ছে।

স্ত্রীর বাপের বাড়ি থেকে আসা হরেক রকমের ইফতার সামগ্রী হয়তো আপনার টেবিলে সাজানো। কিন্তু এর পেছনে হয়তো লুকিয়ে রয়েছে একজন মুসলিমের চোখের পানি। মধ্যরাতে জায়নামাজে তাহাজ্জুদের সালাতে যে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার কথা ছিল, সেটা হয়তো গড়িয়ে পড়ছে আপনার বাড়িতে বাড়তি খাবার পাঠানোর চিন্তায়।

আসুন, এই রমজানে একদিনের ইফতারির আনন্দের জন্য আরেক মুসলিম ভাইয়ের ওপর যেন জুলুম করে না ফেলি। যেন তার মর্মবেদনার কারণ হয়ে না দাঁড়াই। সুখে থাকুন আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত নিয়ামত আপনার স্ত্রীকে নিয়ে। সংসারে শান্তি দেওয়ার মালিক আল্লাহ। কারো পাঠানো খাবার বা উপহার আপনার হৃদয়কে প্রশান্ত করবে না; যতক্ষণ আল্লাহ না চান। আর তিনি চাইলে মানুষের কোনো উপহার ছাড়াই আপনাকে হৃদয়কে শীতল রাখতে পারেন।

Share.

Leave A Reply