মৃত্যু

জান্নাতুন নুর দিশা: বিছানা ঘিরে বেশ ছোটখাটো একটা জটলা। বিছানায় শায়িত জাহানারা। এই বিছানায় তিনি গত একটা বছর শুয়েই আছেন। আজ তিনি মৃত্যুশয্যায়।

মায়ের অন্তিম সময় বুঝতে পেরে জাহানারার তিন কন্যা ও তাদের পরিবার চলে এসেছেন। তিন পুত্র ও তাদের পরিবার এই বাড়িতেই থাকেন। পুরো পরিবার জাহানারাকে ঘিরে আছে।

জাহানারার বড় কন্যা মায়ের মাথার কাছে বসে আছেন, মেজো কন্যা জায়নামাজে, আদরের ছোট কন্যা বারবার কেঁদে উঠছে মায়ের জন্য।

মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে নার্স, এই নার্স গত একটা বছর শয্যাশায়ী জাহানারার শুশ্রূষা করছে। পুরো পরিবারের কাউকেই তাই জাহানারার শুশ্রূষা নিয়ে বেগ পেতে হয় নি।

এই পরিবারটি ধনী পরিবার। জাহানারার স্বামী ছিলেন বনেদি মানুষ। তিনি ব্যবসা করে এতই উন্নতি করে গিয়েছেন যে তার দুই পুরুষ বসে খেলে ফুরোবে না। জাহানারার তিন পুত্রও পিতার ব্যবসার হাল ভালোভাবেই ধরেছে। পুরাদস্তুর ব্যবসায়ী পরিবার।

জাহানারা জাঁদরেল মহিলা বেশ। তিনি আজীবন এই পরিবারে কর্তৃত্ব করে এসেছেন। যেদিন তিনি বউ হয়ে এসেছিলেন সেদিন থেকেই তিনি কর্তৃত্ব করে এসেছেন তার শাশুড়ি, জা সবাইকে ছাপিয়েই। তারপর বার্ধক্যে এসেও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করেছেন ঘরের বউদের। পারিবারিক জীবনে ভীষণ সফল মহিলা জাহানারা।

আর সবার সাথে জাহানারাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়ির ছোট বউ আদৃতা। আদৃতা এ বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে এক বছর আগে। শাশুড়িকে সে দেখেছে এই শয্যাতে শায়িত। আদৃতা তার দুই জা থেকে শুনেছে শাশুড়ি তাদের কখনোই স্বাধীনভাবে কিছু করতে দেয় নি। সংসারে নিজেদের সব সময় মনে হয়েছে পরাশ্রিত। আদৃতা যদিও শাশুড়ির সেই জাঁদরেল রূপ তেমন অনুভব করে নি, তারপরও একদমই যে দেখেনি তা নয়। এই শয্যা থেকেই তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছেন এই সংসার। তার হুকুমের বাইরে কখনোই কিছু হয় নি সংসারে।

জাহানারার ভালোবাসা স্বর্ণের প্রতি। তিনি তার দুই আলমারি ভরে স্বর্ণের গহনাই রেখেছেন কেবল। পুরো শরীরে তিনি জড়িয়ে রাখেন গহনা। এই শয্যাতেও তিনি পরে রেখেছেন ভারী গহনা। সুন্দর দুধে আলতা রঙে গহনাগুলো ফুলের মত ফুটে থাকে। জাহানারাকে লাগে রাণীর মত।

রাজসিক রমণী আজ মৃত্যুশয্যায়। আসরের মধ্যমণি। সকলে ঘিরে আছে তাকে। তাকে শেষ বিদায় জানাবে বলে ভালোবাসা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জাহানারার বড় ভালো লাগছে। তার বিদায়টাও এত সুন্দর হবে ভাবতেই খুব গর্বিত বোধ করছে জাহানারা।

আদৃতার বড্ড মায়া লাগছে তার শাশুড়ির জন্য। এই মহিলাটিকে তার মা মা লাগে, শাশুড়ি নয়। হয়তো তার প্রতি শাশুড়ির নিয়ন্ত্রণ কম ছিলো বলেই, অথবা হয়তো শাশুড়ির জাঁদরেল রূপ তেমন দেখেনি বলেই অথবা হয়তো আদৃতা মেয়েটি অনেক বেশি উদার বলেই অন্য দুই পুত্রবধূর মত শাশুড়ির মৃত্যু হতে যাচ্ছে ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছে না আদৃতা। তার খুব কষ্ট হচ্ছে।

জাহানারার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। সে তলিয়ে যাচ্ছে গভীর ঘুমে। প্রচণ্ড প্রশান্তির ঘুম। এমন ঘুম নিয়েও জাহানারার অহংকার হচ্ছে। তার মৃত্যুযন্ত্রণা হচ্ছে না। আহ! মৃত্যু এত শান্তির!

জাহানারার পালস পাচ্ছেন না ডাক্তার। পুরো পরিবার কান্নায় ভেঙে পড়েছে। বড় কন্যা মায়ের কপালে মাথা রেখে ঢুকরে কাঁদছে। বড় পুত্রও ধরে আছে মায়ের হাত।ভারী মুহূর্তগুলো একটু একটু করে যাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত কেটে যেতেই কান্নার প্রচণ্ড শব্দ খুব অল্প অল্প করে স্মিত হচ্ছে। ছেলেরা লাশের দাফন নিয়ে ভাবছে। দাফনের প্রসঙ্গ থেকে একটু একটু করে জায়গাজমির প্রসঙ্গও আসছে। এরা তিনভাই এখন আলাদা হবে। মায়ের কানে বাজবে বলে যেসব প্রসঙ্গ ঘরে আলোচনা করতো না সেসব প্রসঙ্গ মায়ের পাশেই বসে করছে এখন।
জাহানারার বড় কন্যা মায়ের মাথা থেকে স্বর্ণের টিকলি খুলে নিচ্ছে। দুই পুত্রবধূ আর বাকি দুই কন্যাও ধীরে এগিয়ে এলো। এক এক করে গহনা খুলে নেয়া হচ্ছে জাহানারার শরীর থেকে। যে আলমারি দুটোতে সব গহনা রাখা সেগুলোর চাবি বালিশের নিচে, চাবিগুলো আপাতত কে রাখবে তা নিয়ে মেয়ে আর বউদের হালকা মনোমালিন্য চলছে।

আদৃতা শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে। তার চোখে পানি আসে নি। সে খুশী। তার শাশুড়ি জানতে পারে নি ভীষণ স্বার্থপর পরিবেশ তাকে ঘিরে ছিলো। তিনি খুশী মনে চলে গেছেন। আদৃতাও তাই খুশী।

জাহানারার ঘুম হালকা ভাঙছে। তিনি অস্পষ্ট শুনতে পারছেন তার মেয়েরা আর পুত্রবধূরা চাবি নিয়ে কথা বলছে, এত উঁচুগলায় এরা কখনো কথা বলে নি।

“আপা, আমি তো বাড়ির বড় বউ। চাবী আমার কাছেই থাক আপাতত। দাফনের পর ভাগ করবেন আর কি স্বর্ণ।”
“আমার মায়ের আলমারি, আমি বড় মেয়ে। চাবি আমিই রাখবো।”
“আলমারি তো দুটো, দুটোর চাবী আমরা দুবোন রাখি আপা।”
“আমি ছোট বোন বলে কি অধিকার নেই?”
“বাহ, আপনারা পরের বাড়ির বউ। এই সংসার আমাদের। চাবি আমি আর বড় ভাবী রাখবো।”

জাহানারা অবাক বিস্ময়ে শুনছেন। তার শরীরে কোনো গয়না নেই। সব খুলে নিয়েছে এরা।
তার তিন ছেলে ফিসফিসিয়ে বাটোয়ারা নিয়ে কথা বলছে। জাহানারা শুনছেন। ব্যবসা তারা আলাদা করে ফেলবে ঘরও।

ডাক্তার আবার পালস পেয়েছেন জাহানারার। তিনি এখনো বেঁচে আছেন। ডাক্তার বিস্ময় আর আশা চোখে তাকিয়ে আছে। পুরো পরিবার দ্বিধা আর অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জাহানারা চোখ খুলে বললেন, “আমার বালা কই? আমার স্বামীর পরিয়ে দেয়া বালা। খুলেছ কেনো?”
ভয়ে ভয়ে জাহানারার গায়ে গহনা পরিয়ে দিচ্ছে বড় বউ। গহনাগুলো বড্ড ভারী লাগছে জাহানারার। এত ভারী তো কখনো লাগে নি!

জাহানারার চোখে স্পষ্ট যন্ত্রণা দেখতে পারছে আদৃতা। আদৃতার খুব কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্টটুকু মৃত্যুশয্যায় কেন পেতে হলো এই মহিলাটিকে। হয়তো অহংকার ভালো নয় বলেই।

জাহানারার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা। তার বুক ভেঙে যাচ্ছে, গুড়িয়ে যাচ্ছে সমস্ত অহংকার। তার বুক ভারী হয়ে উঠেছে। বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে! মৃত্যুযন্ত্রণা!

এইমাত্র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে জাহানারা। কেউ সশব্দে কাঁদছে না। কেবল চিৎকার করে কাঁদছে আদৃতা!

Share.

Leave A Reply