ছুটি

মারদিয়া মমতাজ: আজ সন্ধ্যায় একটা আত্না হয়ে গেছি। পরকালের দুর্লঙ্ঘ জগতে থেকে ছুটি নিয়েছি। ইনফ্রারেড স্ক্যানে উত্তপ্ত জায়গাটা, তবু নামার জায়গা হিসেবে সেটাকেই বেছে নিয়েছি। ধোঁয়াতে ভাতের ঘ্রাণ, ছাদের মেঝেতে ছোট্ট ছোট্ট বাতাসের ঘূর্ণি। একটু বসেছি চেয়ারে। চেয়ারগুলো আজ সাজানো। মনে হয় বাচ্চারা এসেছিলো বিকেলে।ছাদের দরোজাটা খোলা, হালকা ধাক্কায় খুলে পা রাখলাম আমার গোলাপী রান্নাঘরে। কি আশ্চর্য, ‘আমার’ মনে হয় এখনো!

চুলায় ভাত, আগের মতো ছোট্ট পাতিলে। বাচ্চাদের শুধু। উনি তাহলে ভাত খায় না এখনো রাতে। পা টিপে এগোচ্ছি, হঠাত মনে হল এর দরকার নেই। বড়দের, বাচ্চাদের বেডরুমের বিছানা টানটান, শুধু ছেলের খেলনা উঁকি দিচ্ছে বালিশের তলা থেকে। ছেলেটা, আর বড় হবে না। পড়ার ঘরেই আলো কেবল। আমার উজ্জ্বল আলো পছন্দ। হ্যাঁ, দুটাই জ্বলছে লাইট। বাচ্চাদের পিঠ দেখছি কেবল, পড়ছে। মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে ওদের বাবা। তার কোলের কাছে আরেকটা বাচ্চা। মা’টাও বসে ছিলো হয়ত, ‘ইস রে এ এহ, ভাত’ বলে ছুট লাগাচ্ছে এখন। ভাতের পাতিলে একটু পুটপুট শব্দ উঠেছে।

আমি লাজুক অতিথির মতো দরজায় উঁকি দিয়ে চোখ ভরে দেখলাম পরিবারটাকে। বাচ্চাদের মুখ দেখার সাহস নাই, শুধু অবয়বেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।

‘খাদিযাহ, খুবাইব, খেতে বসো’ শব্দে চমকে তাকিয়েছি। মায়াভরা চেহারা ওদের মায়ের। মেঝেতে লুটোপুটি বাচ্চার সাথে বেশ মিল। ইচ্ছে হল, জড়িয়ে আদর দিয়ে যাই। ঘরে আমার রেখে যাওয়া ছাপ একটুও বদলায়নি। কি বিচিত্র মানুষের মন। ছেড়ে যাওয়া জায়গায় নিজের রেখে যাওয়া ছাপ দেখতেও কি সুখ!

আমার পায়ে সিনডারেলার কাঁচের জুতোয় বেঁধে আনা সময়। ফিরতে হবে। সবগুলো ইচ্ছে বাকসো কানায় কানায় ভরে নিয়ে ফেরত যাই এখন। না, আর পিছু ফিরে দেখিনি। প্রতিদিন আমার কুঁড়েঘরে ফুল হয়ে আসে, আমার সন্তানের সিজদাহ, দু’য়া। এই কালে, আফসোস বা হিংসা নেই। শুধুই অবিরাম অপেক্ষা, দু’য়ার, ভালোবাসার। কাউকে বলা একটুখানি সান্তনা, কারুর জন্য করা একটুকরো কাজ, শিখিয়ে যাওয়া একটু আধটু ভালো কাজের পরম্পরায় ঘরের দাওয়া ভরার অপেক্ষা। ভালো থেকো, সন্ধ্যেবেলা!

Share.

Leave A Reply