৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫|১২ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০|২২ নভেম্বর, ২০১৮|বৃহস্পতিবার, রাত ১২:৩১

কালো ছেলেটা

জান্নাতুন নুর দিশা: মিলি সকালে কল দিয়ে বললো আমার সাথে তার ভীষণ জরুরী কথা আছে। কণ্ঠ শুনে মনে হচ্ছিলো কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে খুব। আমি অবাক হয়েছি। মিলিকে কখনোই দুশ্চিন্তা করতে দেখা যায় না সচরাচর। আজ কী হলো!

মিলি আমার বান্ধবী। দেখতে ছোটখাটো কিউট একটা মেয়ে। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা পরে। চেহারায় ভীষণ মায়া। খুবই আধুনিকা আর ফ্যাশনসচেতন। ওর বাবা অধ্যাপক, মা আইনজীবী। উচ্চশিক্ষিত বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে।

মিলি ভীষণ রকমের সৌন্দর্য পূজারি। সুন্দর দৃষ্টিনন্দন সব জিনিসে ভরপুর ওর ঘরদোর। ওর ব্যবহার্য জিনিসপত্র সব তাকিয়ে থাকবার মত সুন্দর। ক্লাসের সব সুন্দর ছেলেমেয়েদের সাথে সে বন্ধুত্ব করে বেছে বেছে। ক্যাম্পাসের সবচেয়ে সুদর্শন প্রভাষকের উপর চুপিচুপি ক্রাশ খায়।

যারা একটু সাদাসিধেভাবে চলাফেরা করে, দেখতে একটু কম সুন্দর বা চালচলনে সাহেবিয়ানা কম তাদের অপদস্থ করতে ভীষণ ভালোবাসে মিলি! ক্লাসের একটু কম ঔজ্জ্বল্য যাদের, তাদের মিলি পাত্তাই দেয় না। একটু নার্ভাস গ্রাম থেকে নতুন আসা কম সুন্দর জুনিয়রদের মিলি প্রায় র‍্যাগ দেয়।

মিলির এই ভীষণ বর্ণবাদী আচরণের কারণে আমি ওকে একটু এড়িয়েই চলি। মেয়েটা এমনিতে আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আমার সাথে তার বিনয়েরও অভাব নেই। কিন্তু তার এই বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি মনে করার মানসিকতা আমাকে যারপরনাই বিরক্ত করতো।

মিলিকে অনেকবার বুঝিয়েছি। বাহ্যিক সৌন্দর্য বা স্মার্টনেস কোনো অর্জন নয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সে হেসেই উড়াতো।

যাই হোক, মিলি কল দেবার দু’ঘন্টার মধ্যেই আমার বাসায় হাজির। উদভ্রান্তের মত দৌড়ে এসেছে সম্ভবত। ওকে রুমে এনে বসালাম। বললাম, “কী হয়েছে রে মিলি?”

“আরে বলিস না, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। বাবা মা দুজনেরই ছেলেকে মহা পছন্দ!”

“এ তো ভালো সংবাদ। ছেলে কেমন?”

“ছেলে অনেক শিক্ষিত। এমফিল করে এসেছে বিলেত থেকে। একটা সরকারে গবেষণাগারে কী যেন দায়িত্বে আছে।”

“বাহ! তাহলে তো একট বিয়ের দাওয়াত পাচ্ছি দ্রুত? কত্ত মজা হবে!”

“তুই আছিস মজা নিয়ে! এ বিয়ে আমি করতে চাই না! ছেলে ভীষণ কালো! কেমন আনস্মার্ট ধরনের। মাথার চুল চলে যাচ্ছে। এরকম ক্ষ্যাত টাইপ ছেলে বিয়ে করবো না।”

মেজাজটা খারাপ হল যথেষ্ট। অবজ্ঞার সুরেই বললাম, “মিলি, ছেলে তোর চেয়ে অনেক শিক্ষিত আর উপযুক্ত। উনি দেখতে কেমন তা নিশ্চয়ই ওনার কোয়ালিফিকেশন নয়?”

মিলি অত্যন্ত অসহায় দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। “কোথায় আমি ভাবতাম আমার বর হবে সিদ্ধার্থ মালহোত্রার মতো, আর আমার বাবায় ধরে আনলো তামিল ভিলেন!”

মিলির কথা শুনে আমি হেসেই ফেললাম। আমার হাসি দেখে সে রেগে আগুন। “আমার জীবন মরণ প্রশ্ন আর তুই হাসছিস?”

আমার আরো হাসি পেলো। “ছেলেটি যদি ভালো হয়, তুই সুখীই হবি। চেহারা কোনো ব্যাপার না। এসব ফ্যান্টাসির জগত থেকে বের হয়ে আয়। বাস্তব জীবনে আমাদের চারপাশে কেউই সিদ্ধার্থ বা ক্যাটরিনা না। বিয়ে করে ফেল!”

মিলি ফিরে গেলো। এর কিছুদিন পর সেই ছেলের সাথেই ওর বিয়ে হয়ে গেলো।

অন্য শহরে বেড়াতে যাওয়ায় মিলির বিয়েতে যাওয়া হয় নি। ওর বিয়ের প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। আজ ওর সাথে দেখা হল অন্য এক বান্ধবীর বাসায়। জিজ্ঞেস করলাম, “মিলি, কেমন যাচ্ছে বিবাহিত জীবন?”

“যাচ্ছে এক রকম।”

“ভাইয়া কেমন?”

“খুবই ক্ষ্যাত!”

“আশ্চর্য! ক্ষ্যাত মানে?”

“ক্ষ্যাত মানে ক্ষ্যাত। অসহ্য লাগে। জানিস কেমন ক্ষ্যাত? বিয়ের রাতে এসেই কেমন গ্রাম্য ক্ষ্যাতের মত বকবক শুরু করলো।”

“বিয়ের রাতে বউয়ের সাথে প্রেমালাপ করবে না তো বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে আলাপ করবে?”

“হিন্দি সিরিয়ালের নায়কদের দেখিস না? কেমন স্মার্ট আউটলুক নিয়ে ঘরে ঢোকে?”

আমি তখন কোনোমতে হাসি চাপলাম। বললাম, “মিলি, আমাদের আজকালকার জেনারেশনের এই সমস্যা। সবকিছুকে ফিল্মি স্টাইলে পেতে চাই। বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরে থাকি।”

“দর্শনের প্রফেসরের মত লেকচার দিবি না, অনন্যা।”

“ওকে দেবো না। তা ভাইয়া তোর কেয়ার করে না।”

“ওভারকেয়ার করে। তার কেয়ারের জ্বালায় আমি অতিষ্ঠ। সারাক্ষণ পিছে পিছে ঘুরঘুর করবে। যেখানে যাবো একটু পর এসে হাজির হবে।”

সত্যি সত্যি মিলির বর একটু পরেই এসে হাজির হলো। ভদ্রলোক আর দশজন সাধারণ মানুষের মতই খুব সিম্পলি চলাফেরা করেন। মিলির পছন্দসই লেফাফাদোরস্ত ঠাঁটবাটে চলেন না। তবে তার সাথে কথা বলে বুঝলাম খুবই ভালো মনের মানুষ, মিলিকে খুব ভালোবাসেন, কেয়ার করেন।

ভদ্রলোক দেখতে তেমন সুন্দর নন, শ্যাম বর্ণ, চেহারায় মাধুর্য কম। কিন্তু নিখাদ হৃদয়ের একজন মানুষ। মিলির এত অবজ্ঞা আর অপমান তিনি গায়েই মাখেন না।

স্রষ্টা পৃথিবীতে মিলির মত কেয়ারলেস মানুষগুলোর জন্যই বোধ হয় এমন কেয়ারিং পার্টনার পাঠান। ব্যালেন্স করেন।

মিলির বরের জন্য মায়াই লাগলো। বেচারা আসলেই ভীষণ ভালো একজন মানুষ, অথচ স্ত্রী তাকে পছন্দই করছে না।

সেখানে আমাদের সামনেই মিলি যে ব্যবহার করছিলো তার বরের সাথে তা অকল্পনীয় রকমের মন্দ।

আজ মিলির বর হাসানের সাথে দেখা হলো রাস্তায়। পাসপোর্ট করতে এসেছিলেন। আমাকে লাঞ্চ করালেন। জানলাম মিলি আর তার প্রায় পাঁচ মাস হল সেপারেশন চলছে। আগামী পরশুদিন তাদের বিবাহ বার্ষিকী। হাসানের বড্ড ইচ্ছে করছে মিলিকে নিয়ে উদযাপন করতে। কিন্তু মিলি নাকি তাকে চায় না। মিলি চায় ডিভোর্স।

হাসান থেকেই জানলাম, মিলির এক নতুন বন্ধু হয়েছে। তিনি অনুমান করছেন মিলি ছেলেটিকে ভালোবাসছে। হাসান তাই মিলির পথের কাঁটা হতে চান না। আমেরিকা চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

হাসানের মেঘে আঁধার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনটা কেমত বিষণ্ণ হয়ে গেলো।

আজ মিলি আর হাসানের বিবাহবার্ষিকী। একবার হাসানের জন্য শেষ চেষ্টা করবো বলে মিলিকে কল দিলাম।

“হ্যালো মিলি”

“হ্যাঁ, অনন্যা! কেমন আছিস রে?”

“এই তো ভালো। তুই?”

“আমি তো বিন্দাস আছি। আমি আবার বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি রে। আরমানের কথা মনে আছে? আমাদের ডিপার্টমেন্টের সেই ডেসিং সিনিয়র, দেখতে ইন্ডিয়ান হিরোর মত, ডিপার্টমেন্টে সবার ক্রাশ ছিলো। মনে আছে তোর?”

ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, “মনে আছে!”

“ওকেই বিয়ে করছি। খুব দ্রুতই। আজ আমি আর আরমান ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে যাবো।”

“মিলি! আজ কিন্তু তোর বিবাহ বার্ষিকী!”

“তোর এসব ফালতু ব্যাপারও মনে থাকে আজিব! অনন্যা এসব আমার জীবনে অতীত।”

“মিলি, তুই অনেক বড় ভুল করছিস! জীবনটা ছেলেখেলা না যে এক্সপিরিমেন্ট করবি।”

“দেখ অনন্যা, এটা আমার লাইফ, আমার ডিসিশন আমাকে নিতে দে। বাজে বকিস না।”

“ডিনার কোথায় আজ?”

মিলি এমন এক এলাকার নাম বললো কেমন খটকা লাগলো।

“মিলি, আরমান ছেলেটার রেকর্ড কিন্তু ভালো না।”

“ওহ এত অসাধারণ ছেলে আমার বিএফ বলে তোর ঈর্ষা হচ্ছে? তাই ওর নামে বাজে বকছিস?”

মেজাজ বড্ড খারাপ হচ্ছিলো। ফোন রেখে দিলাম। আরমান ছেলেটাকে সম্পর্কে অনেক কথাই জানা ছিলো। কেমন কু ডাকছিলো মন। হাসানকে কল দিয়ে সব জানালাম।

সন্ধ্যা সাতটা এখন। মিলির থেকে পাওয়া এড্রেসে পৌঁছালাম। রাস্তাটা ভীষণ ফাঁকা। সিএনজি নিয়ে বসে আছে। হাসান আসবে কিনা জানি না।

দেখলাম মিলি রিকশায় চড়ে এসে রাস্তার অপর পাশে দাঁড়িয়েছে। একটু পর একটা সিএনজি থেকে তিনজন ছেলে নামলো। একজন আরমান। টালমাটাল হাঁটা দেখে বুঝলাম মদ্যপ। মিলির কাছে এগিয়ে গেলো। আরমান আর মিলি কথা বলছে। রাস্তার এপাশ থেকে ওদের কথোপকথন শোনা যাচ্ছে না। একটু পর দেখলাম মিলি উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলছে। আরমান মিলির হাত চেপে ধরে টেনে পাশের বিল্ডিংয়ে তোলার চেষ্টা করছে। ধ্বস্তাধস্তি দেখে আমি সিএনজি থেকে নেমে এগিয়ে গেলাম।

গিয়ে যা বুঝলাম পাশের বিল্ডিংটা আরমানেরই বাসা। মিলিকে জোর করে তুলে নিয়ে যেতে চাইছে। বাধা দিলাম। ধাক্কাধাক্কিতে মিলি মাটিতে পড়ে গেলো, ওর কপাল খানিকটা ফেটে রক্ত ঝরছে। আমিও হাতে খানিকটা আঘাত পেয়েছি। আমার পক্ষে বাধা দিয়ে আটকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছিলো না। হঠাৎ দেখলাম হাসান সাথে আরেকজন লোক নিয়ে এসেছে। হাসান আর সেই ভদ্রলোকের সাথে আরমানরা আর পেরে উঠলো না। আরমানরা সিএনজিতে উঠে পালালো।

ভদ্রলোক হাসানের কাজিন। তাড়া থাকায় তিনি তৎক্ষণাৎ বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। এখন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আমি, মিলি আর হাসান। হাসান আমাকে বললো,

“আপনারা আহত, চলুন আশেপাশে কোথাও ডিসপেনসারি আছে নাকি দেখি।”

হাসান হাঁটা শুরু করবে এমন সময়টায় মিলি হাসানের হাত চেপে ধরলো। মিলির কাতর চোখের দিকে হাসান একবার কেবল ফিরে তাকালো।

হেঁটে চলে যেতে যেতে হাসান বললো, “অনন্যা, মিলিকে কোনো ডিসপেনসারিতে নিয়ে যান কষ্ট করে, আপনারা আহত দুজনেই। আমার বড্ড তাড়া আছে!”

আমি বুঝতে পারছিলাম হাসানের গলা ধরে আসছে। আমি দাঁড় করিয়ে রাখা সিএনজিতে উঠে যেতে যেতে দেখলাম হাসান হনহন করে হেঁটে চলে যাচ্ছে, পেছন পেছন মিলি দৌড়াচ্ছে। মিলি কাঁদছে, অনুরোধ করছে একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে তার কথা শোনবার জন্য।

আমি খুব করে চাই হাসান আর পেছনে ফিরে যেন না তাকায়। ফিরে তাকালে সে আবার ডুবে যাবে অনন্ত মায়ায়, নিজের হৃদয়ের পবিত্র শুদ্ধতম ভালোবাসায়। যেই ভালোবাসা মিলি ডিজার্ভ করে না।

আমি ফিরে এলাম, কী হলো জানার অপেক্ষা না করেই।

কিছু ব্যাপার মানুষের একান্তই নিজেদের, তা আমাদের না জানলেও চলে। হয়তো হাসান ফিরে তাকাবে আবার মিলির দিকে, হয়তো আর না!

Share.

Leave A Reply