পরিণতি

জিন্নিয়া সুলতানা: মেয়েটি কতদিন থেকে এরকম করছে? ডাক্তারের এমন প্রশ্নে সুপ্তি চুপ করে রইলো। আসলে ঠিক কতদিন থেকে বিন্তি এ রকম করছে সে নিজেই কিছু বুঝতে পারেনি। ডাক্তার আশা অবাক হয়ে বললেন, আপনি জানেন না ঠিক কতদিন থেকে আপনার মেয়ের এ অবস্থা?

-না ম্যাডাম, আমি আসলে বুঝতে পারি নাই, যখন বিন্তি দরজা বন্ধ করে দিতো তখন আমি ভাবতাম সে হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে।

সুপ্তির এমন উত্তরে ডাক্তার অনেকটা রেগে গেলেন।

-আপনারা আজকালকার মা বাবারা সন্তানের ক্ষেত্রে কি করে এতটা কেয়ারলেস হতে পারেন?

আপনার এগারো বছরের মেয়ে যে কিনা একা থাকলে ভয় পেয়ে চিৎকার করতো সে হঠাৎ করেই একা দরজা বন্ধ করে লক্ষী মেয়ের মতো শুয়ে থাকতো, আপনার কাছে ব্যপারটা একবারও কি অস্বাভাবিক কিছু মনে হয় নি?

বিন্তি এর কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না।

শুধু টিপ টিপ করে চোখের জল ফেলছে।

– যাই হোক, আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা।

বাট সরি টু সে, আপনার মেয়ের অবস্থা তেমন একটা ভালো নয়।

রাতের পর রাত সে ড্রাগ নিয়েছে, নিঃশব্দে সে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছে।

এতটুকু একটা মেয়ে কেন এটা করলো?

এসময় যার কিনা বাবা মায়ের কোলে ঘুমানোর কথা ছিল!

সুপ্তি অপরাধী চোখে তাকালো ডাক্তার আশার দিকে, সেই আট নয় বছর আগের দিন গুলি যেন তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

সময় ১২ টা পেরিয়ে গেছে তবু শুভ্রর বাসায় ফেরার নাম নেই।

সুপ্তি দুই বছরের মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে খাবার টেবিলেই বসে আছে। হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ হলো।

দরজা খুলতেই শুভ্র কোনো কথা না বলে চলে গেল ভেতরে।

সুপ্তি রাগ সামাল দিতে না পেরে বলেই ফেললো,

আজও কি তোমার অফিসে পার্টি ছিল?

বসের বউ বুঝি খুব খাতির যত্ন করে এসব ছাইপাশ খাইয়ে দিয়েছেন?

গ্লাস ভাঙ্গার আওয়াজ শুনে বিন্তি ঘুম থেকে কেদে উঠল।

আজও শুভ্র সুপ্তির গায়ে আঘাত করে খাবার টেবিলের উপরে ফেলে দিয়েছে।

এটা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

সারা দিন একা একা ছোট একটা মেয়েকে নিয়ে কাটিয়ে দিলেও রাতের বেলা সুপ্তির এত রাত পর্যন্ত একা বসে কাটিয়ে দিতে খারাপ লাগে।

তখন কোনো কথা বললেই শুভ্র বাজে ভাবে গালিগালাজ করে অথবা গায়ে হাত তুলে।

বিন্তি এখন পাঁচে পা দিলো, সুপ্তি ভাবছে সে একটা চাকরী জয়েন করবে।

যদি শুভ্রের উপর সংসার খরচের চাপ একটু কম পড়ে হয়ত বাসায় এসে আর অশান্তি করবে না।

একটা স্কুলে ইন্টারভিউ দিতে চাকরীটা হয়ে গেলো।

বিন্তির স্কুল মর্নিং শিফটে হওয়াতে স্কুল ছুটির পর তাকে কাজের মেয়ে নুরীর কাছে রেখে সুপ্তি তার স্কুলে যেত।

নিজের সমস্যার কথা উল্লেখ করে সে স্কুলে ডে শিফটে কাজ করতো।

চাকরী আর সন্তানের দেখাশুনা ঠিক মত হলেও শুভ্রর সাথে সুপ্তির সম্পর্কটা দিনে দিনে আরো খারাপ অবস্থায় চলে গেল।

দুইদিন তিনদিন পর পর শুভ্র বাড়ি ফেরে, তাও বাসায় ফেরার পর থেকেই শুরু হয় দুজনের মধ্যে চরম ঝগড়া।

শুভ্র বাড়ি ফেরার আগ পর্যন্ত বিন্তি অনেক হাঁসি মুখে থাকে।

কিন্তু বাবা ফেরার পর তার চোখে মুখে কেমন যেন একটা ভয় দেখা দেয়।

এই সময়টা যেন একটা ট্রমার মধ্যে দিয়ে কাটায় সে।

বাবা বাসায় ফেরা মানেই বাবা মায়ের মধ্যে অশান্তি শুরু।

এক অদ্ভুত যন্ত্রণা হয় তার।

কিন্তু ভয়ে মুখ ফুটে সে কিছু বলতে পারে না।

তার ইচ্ছে হয় অন্য সবার মত বাবা মা কে একসাথে হাসিখুশি থাকতে দেখতে।

কিন্তু আজও সে বাবা মাকে নিয়ে একসাথে কোথাও ঘুরতে যায় নি।

মা কে এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে মা কোনো উত্তর না দিয়ে ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখেন।

সুপ্তি বিন্তিকে একা রেখে স্কুলে যাওয়ার পর বাকি সময়টা বিন্তিকে কাজের মেয়ের সাথেই কাটাতে হতো।

এক সময় সুপ্তি খেয়াল করলো কাজের মেয়ে নুরির সাথে বিন্তির ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।

এটা দেখে সুপ্তি আরেকটু নিশ্চিন্ত হলো।

অন্তত মেয়েটার একাকীত্ব দূর করতে পারবে নুরি।

এরপর থেকে বিন্তিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি খুশি দেখাতো।

তাই সুপ্তি নিজের এত কষ্টের মধ্যে এই শান্তনা পেতো যে, যাই হোক মেয়েটা তো ভালো আছে।

হঠাৎ করেই একদিন বিন্তি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। বেশ কিছু দিন থেকে শুভ্র বাসায় আসে না, তাই সুপ্তি একাই তাকে নিয়ে মেডিকেল আসতে হলো।

কি এত ভাবছেন?

যা হবার তা হয়েই গেছে, বাচ্চার বাবা কোথায়? – ডাক্তার আশার কথা শুনে সুপ্তি ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো।

বাচ্চার বাবা বাসায় নেই, তাই আমি একাই নিয়ে এসেছি। – অপরাধী চোখে সুপ্তি উত্তর দিলো।

ঠিক আছে, উনাকে খবর দিন। আপনাদের দুজনকে এক সাথে পেলে আমার সুবিধে হবে। কিছু ব্যাপার আলোচনা করার আছে। – একটানা কথাগুলি বলে ডাক্তার চলে গেলেন।

সুপ্তি মেডিকেল থেকে বাসায় এসেছে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে হবে। কিন্তু ঘরে ঢুকেই দেখলো নুরি বিন্তির রুমে কি যেন খুঁজছে। তাই সামনে না গিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো কি করছে মেয়েটা।

নুরি বিন্তির অসুস্থ হয়ে যাওয়া দেখেই বুঝতে পেরেছে ড্রাগ নেয়ার ফল এটা। কিন্তু কেউ কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই ড্রাগগুলি সরিয়ে ফেলতে হবে সবার আগে এই কথাটাই মাথায় এসেছে নুরির। তাই সে পুরো রুমে খুঁজা খুঁজি করছে বিন্তি ড্রাগ কোথায় রেখেছে সেটা খুঁজে বের করতে।

পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে পেয়ে গেল একটা পুঁটলি। নুরি এটা হাতে নিয়ে খুলে দেখে বললো – হ্যাঁ, এটাই তো দিয়েছিলাম কাল বিন্তিকে। কিন্তু এটা রয়ে গেল কিভাবে?

নুরি ড্রাগের পুঁটলি কাপড়ে গুজে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যেতেই দেখলো সুপ্তি সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে যেন তার গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো- খালা আপনি?

রাগে সুপ্তির চোখে মুখে আগুন ঝরছে।

নুরি! তাহলে তুই? কত দিন থেকে এমন চলছে?

সুপ্তির এমন প্রশ্নে নুরি ভয় পেয়ে সব খুলে বলতে লাগলো।

আপনি যখন স্কুলে যেতেন তখন বিন্তি খুব কান্নাকাটি করতো।

আপনার সাথে তার বাবার ব্যাবহারে সে খুব কষ্ট পেতো কিন্তু খুলে কাউকে কিছু বলতো না।

আপনিও যখন তাকে একা রেখে বাইরে কাজে চলে যেতেন তখন সে আরো ভেঙ্গে পড়তো।

একদিন আমি তাকে এটা দিয়ে বলি, এটা প্রতিদিন খেলে তার আর এমন কষ্ট হবে না।

অন্য সবার মতোই সেও ভালো থাকবে।

প্রথম প্রথম সে নিতে চাইতো না। কিন্তু আস্তে আস্তে অভ্যাস করে ফেলে, এরপর থেকে সেই প্রতিদিন আমার কাছ থেকে চেয়ে নিত।

এর পরেই আপনি তাকে অনেক হাসিখুশি দেখতেন।

আমি ভেবেছিলাম এভাবে যদি মেয়েটার কষ্ট কম হয়, তাই এমন একটা কাজ করেছি।

খালা আমায় মাফ করে দেন। আমি না বুঝে বিন্তির এত বড় একটা ক্ষতি করে ফেলেছি।

বেশ কিছুদিন পর শুভ্র আজ মোবাইল ফোন অন করেছে।

মোবাইল হাতে নিতেই সুপ্তির নাম্বার স্ক্রিনে ভেসে উঠলো।

মোবাইল অন করতেই কল দিয়ে বসেছে – শুভ্র বিড়বিড় করতে লাগলো।

খুব বিরক্ত হয়ে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সুপ্তির কান্না ভেজা কণ্ঠ ভেসে এলো।

সুপ্তির কল কেটে দিয়ে শুভ্র সরাসরি মেডিকেল চলে এসেছে।

কেবিনের দরজা খুলে তাকাতেই দেখলো বিন্তি খুব শান্তভাবে বেডে ঘুমাচ্ছে, সাদা ধবধবে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা বিন্তিকে জড়িয়ে ধরে পাথরের মতো বসে আছে তার মা সুপ্তি।

Share.

Leave A Reply