৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫|৬ রবিউস-সানি, ১৪৪০|১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮|শুক্রবার, সন্ধ্যা ৭:১৭

বাক স্বাধীনতা নিয়ে আমাদের ভাবনা কতটুকু?

বাকি বিল্লাহ শিবলী: বাক স্বাধীনতার তথা মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে প্রতিটি জাতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। যে সমাজে বাক-স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়া হয় সে সমাজ তুলনামূলকভাবে সভ্য এবং উন্নত। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের এই বাক-স্বাধীনতা বা চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারে তোয়াক্কা নেই বা মেনে চলার প্রচলন নেই।

না মানার প্রধান এবং সম্ভবত একমাত্র কারণ এ বিষয়ে সুশিক্ষা বা যথাযথ শিক্ষার অভাব।

বাক-স্বাধীনতা মানে চিন্তার স্বাধীনতা বা চিন্তা প্রকাশের স্বাধীনতা।  বেশিরভাগ মানুষই চিন্তা করতে পারে না বা চিন্তা করতে শেখেনি। চিন্তাকে নিরুত্সাহিত করা হয়। ফলে তারা জানে না চিন্তা আসলে কী বা চিন্তার আদৌ কোনো সীমা আছে কি না বা থাকা উচিত কি না। মানুষ সৃষ্টিশীল জীব। চিন্তা তাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। চিন্তা করতে পারে বলেই সে সৃষ্টি করতে পারে, উদ্ভাবনের জন্য মরিয়া হয়। কিন্তু অন্য প্রাণী চিন্তা করার ক্ষমতা নেই তাই তারা সৃষ্টিও করতে পারে না। সৃষ্টি করার জন্য, পরিবর্তনের জন্য চিন্তা করা দরকার—অবাধ চিন্তা। চিন্তা কোনো সিদ্ধান্ত নয় যে, তা ভুল হবে না। চিন্তা ভুল বা সঠিক হতে পারে। কিন্তু তা কারো স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে না। ফলে চিন্তা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। চিন্তা বাধাগ্রস্ত হলে সমাজ ও সভ্যতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

মত কোনো প্রমাণিত সত্য নয়। সত্য প্রমাণের জন্য, সত্য নির্ণয়ের জন্য, ভালোমন্দের পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য, সত্যকে জানার জন্যই মত প্রকাশ করা হয়।

মত মানে হচ্ছে ব্যক্তি যা মনে করেন বা তিনি যেভাবে চিন্তা করেন। ফলে সত্য-অসত্য উভয়ই সেখানে থাকতে পারে। ব্যক্তি তার ভাবনা প্রকাশ করবেন। তিনি যা ভাবেন ঠিক তা-ই প্রকাশ করবেন। মতামতে যুক্তি বা সত্যতা থাকলে মানুষ তা গ্রহণ করবে, নয়তো প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু তার বক্তব্য বা মতামতকে বাধাগ্রস্ত করার কোনো মানে নেই। মতামত মানে সত্য, শুদ্ধ হবে তা কিন্তু ন। মতামত মিথ্যেও হতেই পারে। মানুষ তা বিবেচনা করবে যুক্তি ও বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে। বিবেচনা করবার জন্যই মত প্রকাশ।  তাই মত বা চিন্তার অবাধ প্রবাহ দরকার । নদীর পানিতে স্রোত থাকে বলে নদীর পানি সুন্দর। নদীতে স্রোত থাকলে তাতে কখনো আবর্জনাও ভেসে আসতে পারে। আবার স্রোতেই সে আবর্জনা ভেসে যায়, বিলীন হয়ে যায়।

এই মত প্রকাশের জন্য চিন্তাকে তাই অধিক গুরুত্ব দেয়া জরুরী। চিন্তা ছাড়া হুট করে করে কোন বিষয়ে মন্তব্য করা মানে মত স্বাধীনতা নয়। যে বিষয়ে মত প্রকাশ করতে চাওয়া হয় সে বিষয়ে চিন্তা থাকা অনেক বেশী জরুরী। চিন্তা একটি জ্ঞান অর্জন প্রক্রিয়া। জ্ঞানের কোনো সীমা নেই। তাই চিন্তা ও মত প্রকাশেরও কোনো সীমা নেই। জ্ঞান অর্জন মানে নীতিকথা নয়। জ্ঞান অর্জন মানে ভালো ও মন্দের তফাত নির্ণয়। ভালোমন্দ উভয় কথাই প্রকাশ করা দরকার বা প্রকাশ করার অধিকার থাকা দরকার।

তাহলেই মানুষ ভালো কিছু অর্জনে সমর্থ হবে।মনে রাখা দরকার যে, অনুভূতিকে অনাহত রেখে জ্ঞান অর্জনের কোনো উপায় নেই। নতুন কিছু শিখতে গেলেই অনুভূতি আহত হয়। অনুভূতি আহত হওয়া মানে জ্ঞান অর্জন করা বা জ্ঞান অর্জন করার পদ্ধতি।  যে বিষয়টা সে সত্য বলে জানতো হঠাৎ সে জ্ঞান অর্জন তথা বিশ্লেষণ করে জানতে পারে বিষয়টি সত্য নয়। একসময় সে অবাক হয়, ঐ বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকে এবং তারপর একসময় মেনে নেয়। এভাবেই শেখে মানুষ। শিক্ষার এই প্রক্রিয়া, জ্ঞান অর্জনের এই নিয়ম। অনুভূতি আহত হয় বলেই আমরা শিখতে পারি।

বাস্তবিকভাবে, জগতের কোনোকিছুই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন তোলা যায়—সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম সবকিছু। সবকিছুরই ঊর্ধ্বে মানুষ। মানুষের জন্যই সবকিছু। আর মানুষের কল্যাণের জন্যই সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন করা দরকার—যে কোনো প্রশ্ন। সভ্য সমাজে তাই যে কোনো কিছু নিয়ে যে কোনো প্রশ্ন করার অধিকার থাকে বা থাকার কথা। প্রশ্ন থেকেই জ্ঞানের প্রকাশ আরো সহজ ও সুন্দর হয়। তাইতো, সভ্য সমাজে বাক-স্বাধীনতার কোনো সীমা নেই।

বাকি বিল্লাহ শিবলী, ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক।

বিভাগ:কলাম
Share.

Leave A Reply