৯ ফাল্গুন, ১৪২৫|১৫ জমাদিউস-সানি, ১৪৪০|২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯|বৃহস্পতিবার, দুপুর ১:২৮

তাবলিগ জামাত ও রাজনৈতিক মেরুকরণ

আবদুর রহমান সাজ্জাদ: ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্য সামনে রেখে ভারতের প্রখ্যাত মুবাল্লিগ মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াস কান্ধলভী রহঃ দিল্লিতে ১৯২০ সালে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই ধর্মীয় সংগঠনটি ছয় উসুলের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে এবং বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচারে অনস্বীকার্য অবদান রাখছে।

দীর্ঘ এক শতকে এই সংগঠনের নীতিমালা কিংবা পরিচালনায় কখনো মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়নি কিন্তু যার প্রথম ব্যত্যয় ঘটে ২০১৪ সালে এবং দৃশ্যমান হয় ২০১৭ সালের ১৪ ই নভেম্বর কাকরাইল মসজিদে দুপক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়ানোর মাধ্যমে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে তাবলিগ জামাতের মত এমন একটি (স্বাভাবিকভাবে দৃশ্যমান) অরাজনৈতিক, অলাভজনক, ধর্মীয় সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে মতানৈক্য বা সংঘর্ষের মত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কেন ঘটবে? তার মানে কি তাবলিগ তার মূল আদর্শ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে? না এর মাঝে দ্বীন প্রচারের নামে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটছে? না অন্য কিছু?

সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান তাবলিগ জামাতের এমন সংঘাত/মতানৈক্যের জন্য ০৩ টি পক্ষের ই ব্যক্তিগত অভিপ্রায় কাজ করছে বলে মনে হয়। তিনটি পক্ষ হচ্ছে:

০১. মাওলানা সা’দ পক্ষ

০২. মাওলানা জোবায়ের বা হেফাজত পক্ষ

০৩. সরকার পক্ষ

০১. সা’দ পক্ষের অভিপ্রায়ঃ

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় আমির হয়েছেন ০৬ জন যারা প্রত্যেকেই মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াস কান্ধলভী রহঃ (তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আমির) এর পরিবারের সদস্য। তাবলিগ জামাতের বর্তমান কেন্দ্রীয় আমির মাওলানা সা’দ কান্ধলভী রহঃ যিনি নিজেও ইলিয়াস কান্ধলভী রহঃ এর নাতি।

সা’দ কান্ধলভী রহঃ এর অভিপ্রায় হচ্ছে অতীতের ন্যায় তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় আমির মনোনীত হবে কান্ধলভী পরিবার থেকে এবং এ ধারা বংশানুক্রমে অব্যাহত থাকবে কিন্তু সা’দ রহঃ এর এই মতের সাথে একমত হতে পারেন নি “পাকিস্তান তাবলিগ জামাত” এর আমির সহ বিভিন্ন দেশের তাবলিগ নেতৃবৃন্দ, তাদের মতে কোন নির্দিষ্ট পরিবার বা দেশ থেকে আমির নির্বাচিত হবে না বরং তাবলিগ পরিচালিত হবে মজলিশে শূরার মাধ্যমে।

আলোচনার মাধ্যমে এ মতানৈক্যের অবসান না ঘটিয়ে সা’দ কান্ধলভী রহঃ তার অবস্থান কে আরো মজবুত করার লক্ষে বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন, সা’দ রহঃ এর কর্মকাণ্ডে মনে হয় তিনি চান বাংলাদেশে কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাবলিগ জামাতের প্রধান মিলনমেলা “বিশ্ব ইজতেমা” কে বাংলাদেশ থেকে তার জন্মস্থান ভারতে নিয়ে যেতে এবং তাবলিগ জামাত পরিচালনায় কান্ধলভী পরিবারের একক কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে।

এক কথায় মাওঃ সা’দ চাচ্ছেন বিশ্ব তাবলিগ জামাত এককভাবে পরিচালনা করতে এবং তাবলিগ জামাতে কান্ধলভী পরিবারের একক আধিপত্য বজায় রাখতে।

০২. মাওঃ জোবায়ের বা হেফাজত পক্ষের অভিপ্রায়

বাংলাদেশে যারা তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম পরিচালনা করেন তাদের অধিকাংশ ই হচ্ছেন বিভিন্ন কাওমি মাদ্রাসার আলেম আর কাওমি মাদ্রাসার আলেমদের সমন্বয়ে গঠিত সংগঠন হচ্ছে “হেফাজতে ইসলাম”।

হেফাজতে ইসলামের আলেমগণ চাচ্ছেন তাদের মতাদর্শ সম্পন্ন আলেমগণের সমন্বয়ে মজলিশে শূরা গঠন করে তার মাধ্যমে বাংলাদেশের তাবলিগ জামাত কে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং নিজেদেরকে একটি শক্তিশালী সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে আত্ম-প্রকাশ করতে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যদি হেফাজত নেতারা তাবলিগ জামাতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে পারেন তাহলে তারা নিকট ভবিষ্যতে একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটাবেন এবং কাওমি মাদ্রাসার সকল শিক্ষার্থী ও তাবলিগের সাথে সম্পৃক্ত গ্রাম মহল্লার খেটে খাওয়া অরাজনৈতিক মানুষগুলোকে নিজেদের কর্মী বলে চালিয়ে দিবেন।

যেহেতু বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক দল/গোষ্ঠী গুলোর চাহিদা প্রবল সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে ভোটের পূর্বমুহূর্তে হেফাজত নেতারা যে কোন বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সাথে জোট বেঁধে ক্ষমতার আংশিক স্বাদ ভোগের চেষ্টা করবে।

এক কথায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হাসিল তথা ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণেই হেফাজত নেতারা এই দ্বন্দ্ব কে জিইয়ে রাখছে।

০৩. সরকার তথা আওয়ামী লীগের অভিপ্রায়ঃ

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মতবাদ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ যা হেফাজতে ইসলামের মতবাদের সম্পূর্ণ উল্টো, তাই আদর্শিক বৈপরীত্যের কারণে আওয়ামী লীগ মনে করে ভোটের মাঠে তারা হেফাজতের খুববেশি সমর্থন পাবেনা বরং অধিকাংশ সমর্থন পাবে বিরোধী দলগুলো, কাজেই হেফাজতের মধ্যে যদি ডিভাইড অ্যান্ড রোল থিওরি এপ্লাই করা যায় তাহলে সাপ মরবে লাঠিও ভাঙ্গবে না।

সেই চিন্তা থেকে আওয়ামী লীগ মাওঃ সা’দ ইস্যুতে উভয় পক্ষকে উত্তেজিত করে তাবলিগের মাঝে ভাঙ্গণ সৃষ্টি করছে এবং উভয় পক্ষকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

আওয়ামী লীগ কখনোই চায়না তাবলিগের অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য দূর হয়ে তারা একটি ঐক্যবদ্ধ এন্টি-আওয়ামী জোটে পরিণত হোক, সে জন্যই তারা সা’দ পন্থী ও জোবায়ের পন্থী উভয়কে গোপনে সহযোগিতা করে এবং উভয় দলের অনুসারীদেরকে কু-পরামর্শ দিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছি টঙ্গীতে যখন তাবলিগের উভয় পক্ষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে তখন সেখানে পর্যাপ্ত পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্তেও তারা রাস্তার একপাশে নিষ্ক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, এছাড়াও মারামারির সময় শার্ট-প্যান্ট-হেলমেট পরে কয়েকজন কে লাঠি হাতে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, প্রশ্ন জাগে সেদিন পুলিশ কেন নিষ্ক্রিয় ছিল? টুপি-পাঞ্জাবি পরা কাওমি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে হেলমেট পরিহিত এরা কারা? সংঘর্ষের সময় এদের কাজ কি সেখানে?

ঘটনার দু-পিঠ বিশ্লেষণ করে এমনটা বোধগম্য হচ্ছে যে, নিছক নিজেদের স্বার্থের কারণে আজ আওয়ামী লীগ তাবলিগ জামাতের এ দ্বন্দ্ব নিরসন না করে বরং আরো উস্কে দিচ্ছে, আপসোস আজ ক্ষমতার স্বার্থে আওয়ামী লীগ ধর্মীয় বিষয়েও নোংরা রাজনীতির খেলা খেলছে।

আবদুর রহমান সাজ্জাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিভাগ:কলাম
Share.

১ Comment

Leave A Reply