৯ ফাল্গুন, ১৪২৫|১৫ জমাদিউস-সানি, ১৪৪০|২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯|বৃহস্পতিবার, দুপুর ২:১০

আজকের অরিত্রী ও আমার মেয়েবেলা!

সাদিয়া বিনতে শাহজাহান: প্রতিদিন আশেপাশে কতো ঘটনায় তো ঘটছে। তবে সম্প্রতি ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনা যেনো আমাদের ভীষনভাবে আলোড়িত করেছে। পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার কারণে তাকে স্কুল থেকে টিসি দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তার মা-বাবাকে স্কুলে ডেকে নিয়ে সবার সম্মুখে চরম অপমান করা হয়েছে । তবুও ক্ষমা মেলেনি। তাইতো অরিত্রী বাসায় ফিরে নিজের ঘরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। হঠাৎ এমন জলজ্যান্ত মেয়েটার এভাবে মরে যাওয়ার পেছনের কারণ খোঁজার জন্য কি খুব বেশি অনুসন্ধানের দরকার আছে?

এ সময়ের অরিত্রীদের মতো একসময় আমিও ছিলাম। স্কুলের ডানপিটে ছাত্রী হিসেবে সুনাম ছিলো বেশ।

স্কুল পালিয়েছি, বাবার পকেট থেকে টাকা মেরে স্কুল ব্যাগে আম্মুর শাড়ি গহনা ভর্তি করে স্টুডিওতে গিয়ে আমি আর আমার দুই প্রাণের সখী জোহরা আর রুমি ক্লিক ক্লিক করে বিভিন্ন পোজ আর ভঙ্গীতে ছবি খিচিয়েছি। স্কুল শেষে হৈ হৈ রৈ রৈ করেছি।

বিরক্তিরকর ক্লাস গুলোতে পেছনের বেঞ্চে বসে জমিয়ে আড্ডা দিয়েছি। এতোকিছুর মাঝে স্কুলে আমাদের পছন্দের আর আকর্ষনের জায়গা ছিলো প্রিয় শায়লা শিরিন ম্যাম। ম্যামকে আমরা শায়লা মা বলেও ডাকি। আপনারা ই ভেবে নেন কতটুকু আপন হলে, নিজের হলে স্কুলের ম্যাম মা হয়ে যায়। মমতাময়ী মা।

স্কুলের ঐ সময়টাতে মেয়েরা কিছুটা খামখেয়ালি হয়। ভুল করতে শেখে কারণ বয়সটাই এমন। এসময় একজন বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা একজন গাইডের প্রয়োজনীয় কেবল ঐ বয়েসী মেয়েরাই জানে। এমন অনেক প্রশ্ন থাকে যা মাকে বলা যায় না আবার সহপাঠীরা ও এসব প্রশ্নের উত্তর জানেনা। তখন প্রয়োজন হয় একজন সিনিয়ার বন্ধুর।

আমার সৌভাগ্য, আমি মায়ের আদলে এবং বন্ধুর আদলে  স্কুলের ম্যামকে পেয়েছি। স্কুলের সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামের আয়োজনে ম্যাম আমাকে নিজের হাতে সাজিয়ে দিতেন। সাজসজ্জায় কমতি হলে নিজের গলার হার খুলে আমায় পড়িয়ে দিতেন। কখনো স্কুলের খাতায় নম্বর কম পেলে সাহস জুগিয়ে বলতেন, “কম পেয়েছো বলেই সামনের বার আরো ভালো নম্বর পাওয়ার সুযোগ আছে তোমার!”

মনটা তখন সাহস পেতো। তাই তো! সামনে তো ভালো করার সুযোগ বেড়ে গেলো। আপনাদের প্রশ্ন জাগতে পারে তিনি কি কেবল আদরই করতেন? একবারেই শাসন করতে না? অবশ্যই করতেন। ম্যাম আমাদের গার্লস গাইডের ইনস্ট্রাক্টর ছিলেন। কি যে ভয় পেতাম ম্যামকে। সবকিছুই পারফেক্ট হওয়া চাই।

মা রা তো এমনই। কথায় আছে না,   “আদর করা তারই সাজে, শাসন করে যে!” স্কুল শেষে কলেজ তারপর বিশ্ববিদ্যালয় তারপর বিয়ে।

এখন তো দেশ ছেড়ে সাত সমুদ্দির তেরো নদীর এপারে থাকি। স্বামী সংসার পড়াশোনা কতো ব্যস্ততা!

তারপর আরো কতোকিছু এলোগেলো ম্যামের সাথে আমার সম্পর্কটা এখনো কতোটা সবুজ, তা কি আর  বলবো। শায়লা ম্যাম  কখনো টিচার, কখনো মা, কখনো বন্ধু হয়ে পাশে ছিলেন এখনো আছেন।

শুধু আমার না, স্কুলের সিনিয়ার আপুদের থেকে শুরু আমাদের পর পর্যন্ত যারাই ম্যাম কে পেয়েছে, ম্যাম সবাইকে মায়ের মতো স্নেহ দিয়েই গড়েছেন।আমি এমন মহান একজনের কাছে থেকে স্কুল জীবন শেষ করেছি।আমার সৌভাগ্য আমি অরিত্রীর বয়সি সময়টাতে বন্ধুর মতোন একজন শিক্ষিকার স্পর্ষ পেয়েছি।

আজ,অরিত্রী কেবল একজন অরিত্রী নয়, প্রতিদিন হাজার হাজার অরিত্রীর জন্ম হচ্ছে। টিসি দেয়া কোন সমাধান নয়। এটা আরো একটি ভুল কে উৎসাহিত করে। বরং বুঝিয়ে পথ দেখানোটাই আসল। ভুলগুলোকে বাতলে দিয়ে আলোর পথে আনাটাই একজন শিক্ষিকার কাজ।অরিত্রী শায়লা ম্যামের মতো ম্যাম পায়নি।পেলে হয়তো আজ সে জানতো আত্মহত্যা কোন সমাধান নয়।নকল করার মাঝে কোন সার্থকতা নেই। জীবন মানেই সাতরঙংয়ের প্রজাপতি, যতো ধরতে এগোবে ততই তুমি মুগ্ধ হবে।

আফসোস অরিত্রীকে জীবনের সৌন্দর্য শেখানোর জন্য শায়লা ম্যামের মতো শিক্ষিকার সাথে তার দেখা হয়নি। এ কঠিন সময়ে জাতির শায়লা ম্যামদের মতোন একজন শিক্ষিকার তথা মানুষ গড়ার কারিগরের বড়োই অভাব। যে বন্ধু হয়ে ভুল সময়ের ভুল গুলো বাতলে দেবে।

আজকের শিক্ষানীতির বিভিন্ন ঠিক বেঠিক নিয়ে আমরা কতো আলোচনা করি। অথচ শিক্ষার্থীরা কোন পরিবেশে পাঠদান নিচ্ছে তা ভাবিনা। কেন স্কুলে যাওয়ার নামে তারা ভয় পায়, দূরে দূরে থাকে, এসব কথা কখনো ভাবিনা। ভাবিনা বলেই আজকে আমাদের কন্যাদের অরিত্রী হতে হয়। আমরা কেবল তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথাটাই বলি। হাত ধরে এগিয়ে গিয়ে ঐ পথটা কখনো খেয়াল করে দেখিনা, পথটা কতোটা মসৃণ তাদের জন্য। জগতের সকল অরিত্রীরা ভালো থাকুক, আর কাউকেই যেনো আজকের অরিত্রীর মতো অকালে ঝরে যেতে না হয়।

সাদিয়া বিনতে শাহজাহান, ফ্রান্স প্রবাসী লেখিকা।

বিভাগ:কলাম
Share.

Leave A Reply