বাসের পাল্লাপাল্লিতে প্রাণ গেল বিইউপি ছাত্রের

২০ বছর বয়সী আবরারের এমন করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না কেউ। এই ঘটনাকে নিতান্ত দুর্ঘটনা বলে মানতে নারাজ সবাই। বরং নির্মম এই মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করছেন তারা। এমন এক সময়ে পরিবহন নৈরাজ্যের শিকার হলেন আবরার; যখন রাজধানীর সড়কে চলছে ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহ। গতকাল মঙ্গলবার ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহের তৃতীয় দিনে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে দুই বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে বেঘোরে প্রাণ হারান আবরার। নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত বছর দেশব্যাপী যে উত্তাল আন্দোলন হয়েছে, সেই কর্মসূচির সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আরও একবার প্রমাণ হলো- রাজধানীর রাজপথে পরিবহন সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য কমেনি আজও।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নর্দ্দা এলাকার প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের রাস্তা পার হওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েন আবরার। রাস্তার উল্টো পাশে ছিল আবরারের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস। জেব্রা ক্রসিং পার হয়ে সেই বাসের কাছে যাচ্ছিলেন তিনি। ঠিক তখন ওই রাস্তায় দুটি বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে সুপ্রভাত পরিবহনের একটির ধাক্কায় ছিটকে পড়েন আবরার। এরপর সেই বাসটি তাকে চাপা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার নিথর দেহ টেনেও নিয়ে যায় খানিকটা। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় আবরারের।

আবরার ছিলেন বিইউপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আরিফ আহমেদ চৌধুরী, গৃহিণী মা ফরিদা ফাতেমী ও একমাত্র ছোট ভাই আবিদ আহমেদ চৌধুরীকে নিয়ে থাকতেন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসায়।

গতকালের নির্মম দুর্ঘটনা সহপাঠী আর পথচারীদের সামনেই ঘটেছে। এরপর ফুঁসে ওঠেন তারা। বারিধারায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মূল গেট থেকে শুরু করে প্রগতি সরণি অবরোধ করে দিনভর চলে বিক্ষোভ। এতে আবরারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আইইউবিসহ আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। তাদের সঙ্গে ‘সড়কে হত্যা’র প্রতিবাদে শামিল হন অভিভাবক থেকে শুরু করে স্থানীয় লোকজনও। রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার আট মাসের মাথায় সড়কে আবারও স্লোগান উঠল- ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস।’ গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে পুলিশ, শিক্ষক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনুরোধে অবরোধ তুলে নেন তারা। তবে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আজ বুধবার সকাল ৮টা থেকে তারা আবারও রাস্তায় নামবেন। আজ সারাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বর্জনের ডাক দেন তারা।

যেভাবে আবরারকে চাপা দিল বাস :স্বজন ও সহপাঠীরা জানান, প্রতিদিনই আবরার যমুনা ফিউচার পার্কের উল্টো পাশের সড়কে অপেক্ষমাণ বিইউপির ক্যাম্পাস বাসে উঠে ক্লাসে যান। গতকাল সকাল সোয়া ৭টায় তিনি বাসে উঠতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মূল গেটের সামনে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। সাড়ে ৭টায় তার বাস ছেড়ে যাওয়ার কথা। তিনি রাস্তাটুকু প্রায় পার হয়ে গিয়েছিলেন। এর মধ্যেই দুই বাসের প্রতিযোগিতায় নিষ্ঠুর ঘটনাটি ঘটে।

ঘটনাস্থলের পাশেই একটি বহুতল ভবনের নিরাপত্তাকর্মী সাহেব আলী বলছিলেন, ওই ছাত্র নিয়ম মেনেই রাস্তা পার হচ্ছিল। সড়কে তেমন গাড়িও ছিল না। হঠাৎ করেই দুটি বাস প্রতিযোগিতা করে চলে এলো। শুরুর দিকে ওই ছেলেটি দুই বাসের মাঝে পড়ে যায়। এরপরই তাকে ধাক্কা দেওয়া হয়। বাসটি আবরারকে খানিকটা টেনেও নিয়ে যায়। ঘটনার সময় আরেকজন সহপাঠী আবরারের সঙ্গে ছিলেন। তিনি ক্যাম্পাসে খবর দেন।

গুলশান থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক জানান, আহত আবরারকে উদ্ধার করে পুলিশের গাড়িতেই কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তার আগেই তিনি মারা যান। অভিযুক্ত বাসটির চালক সিরাজুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে। ওই ঘটনায় মামলা দায়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সে পাল্লাপাল্লির কথা স্বীকারও করেছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে সড়ক অবরোধ :আবরারের মৃত্যুর ঘটনা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিইউপি ক্যাম্পাসে। সহপাঠীরা সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মূল গেটের সামনে এসে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের সঙ্গে আশপাশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগ দেন। এতে দিনভর রামপুরা থেকে শুরু করে কুড়িল-বাড্ডা ও প্রগতি সরণির দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। তবে শিক্ষার্থীদের এই নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে অনেকে সহমর্মিতাও জানান।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সুপ্রভাত পরিবহনসহ বিভিন্ন পরিবহনের অন্তত ১৮টি বাস আটক করেন। তারা বাসগুলোতে ভাংচুরও চালান। দুপুরের দিকে একটি বাসে আগুন জ্বলতেও দেখা যায়। তবে শিক্ষার্থীরাই সেই আগুন নিভিয়ে ফেলেন।

শিক্ষার্থীরা দুর্ঘটনাস্থলে প্রতীকী আবরার সেজে শুয়ে থাকেন। অনেক শিক্ষার্থী ‘জেব্রা ক্রসিংয়ে ভাই মরে/প্রশাসন কী করে’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’, ‘আর কতো প্রাণ নিলে/সড়ক হবে নিরাপদ’ এবং ‘নিজের সিরিয়ালের অপেক্ষা করুন’সহ নানা প্ল্যাকার্ড বহন করে প্রতিবাদ করতে থাকেন।

বিইউপির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র নাজমুল ইসলাম, সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র রুবেল মিয়া দিনভর দুর্ঘটনাস্থলে প্ল্যাকার্ড নিয়ে শুয়ে ছিলেন। শিক্ষার্থীরা আন্দোলন থেকে আট দফা দাবিও জানান। ইকরামুল ইসলাম নামে এক ছাত্র জানান, তারা শুধু সড়কে মরছেন আর আশ্বাস পাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে। এই তামাশা বন্ধের জন্য তারা সড়কে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নেমেছেন। কোনো ভাংচুর বা জ্বালাও-পোড়াওয়ে তারা জড়িত নন। বিইউপি শিক্ষার্থী মায়েশা নূর বলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন গত বছরের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। এই আন্দোলনে গত বছরের মতো কোনো হামলা ও রক্তাক্ত চেহারা দেখতে চাই না। আমরা পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে নিরাপত্তা চাই। আন্দোলনের সময় আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’

ঘটনাস্থলে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) শেখ নাজমুল আলম জানান, তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বন্ধ করতে আসেননি। যাতে কেউ শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করতে না পারে, আন্দোলনে ঢুকে কেউ যাতে নাশকতা করতে না পারে- সে বিষয়ে নজর রাখছেন।

শিক্ষার্থীদের ৮ দফা দাবি : আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা পরিবহন সেক্টরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, প্রতি মাসে বাসচালকের লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেক করাসহ ৮ দফা দাবি জানিয়েছেন। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে- আটক চালক ও সম্পৃক্ত সবাইকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে; ফিটনেসবিহীন বাস ও লাইসেন্সবিহীন চালককে দ্রুত সময়ে অপসারণ করতে হবে; ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সব স্থানে আন্ডারপাস, স্পিড ব্রেকার এবং ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ; চলমান আইনের পরিবর্তন করে সড়ক হত্যার সঙ্গে জড়িত সবাইকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় নেওয়া; দায়িত্ব অবহেলাকারী প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশকে স্থায়ী অপসারণ করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চলাচল বন্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে বাসস্টপেজ এবং যাত্রী ছাউনি করার যথাযথ ব্যবস্থা, ছাত্রদের হাফ পাস (অর্ধেক ভাড়া) অথবা আলাদা বাস সার্ভিস চালু করারও দাবি জানিয়েছেন।

ঘটনাস্থলে মেয়র :সড়কে ছাত্র মৃত্যুর ঘটনার খবরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক মন্তব্য করে বলেন, রাজধানী ঢাকার কোনো রুটেই সুপ্রভাত বাস চলবে না। ওই পরিবহনের লাইসেন্স বাতিলের জন্যও তিনি কথা বলেছেন।

নিহত আবরার আহমেদ চৌধুরীর নামে দুর্ঘটনাস্থলে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মেয়র বলেন, আগামী দুই কিংবা সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে ওই জায়গায় আবরার চৌধুরীর নামে ফুট ওভারব্রিজ হবে। শিক্ষার্থীদের অন্যান্য দাবি নিয়ে আলোচনা করে তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন মেয়র। আতিকুল বলেন, চালকের বিচার করতেই হবে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার সর্বোচ্চ বিচার হবে। ওই সময় মেয়র শিক্ষার্থীদের সড়কের অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানালেও তাতে সাড়া দেননি তারা। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ থাকায় বসুন্ধরা ও আশপাশ এলাকায় যানজট ছড়িয়ে পড়ে।

বাসের নিবন্ধন বাতিল :ছাত্র নিহতের ঘটনায় সুপ্রভাত পরিবহনের বাসের নিবন্ধন সাময়িকভাবে বাতিল করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, যে বাসটি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী সেটির মালিক গোপাল সরকার। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে সুপ্রভাত বাসের রুট যারা পরিচালনা করে তাদের ডেকে বলেছি- মেয়রের নির্দেশ অনুযায়ী ওই পরিবহনের গাড়ি রাস্তায় চলবে না। সুপ্রভাত পরিবহনের একশ’ বাস রয়েছে।

জানাজা ও দাফন সম্পন্ন :বিইউপি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, গতকাল বাদ জোহর বিইউপি ক্যাম্পাসে আবরার আহমেদ চৌধুরীর জানাজা সম্পন্ন হয়। পরে তার মরদেহ বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। জানাজায় ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম, বিইউপির উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী, উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. এম আবুল কাশেম মজুমদারসহ বিইউপির শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

Share.

Leave A Reply